নীতেশ বর্মন, শিলিগুড়ি: ভোট বড় বালাই। রাজবংশী জনজাতির (Rajbanshi Vote and Panchanan Barma) মানুষের মন পেতে তাই মনীষীর শরণে দুই ফুলের নেতারা। ১৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চানন বর্মার জন্মদিন পালন করতে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে বিজেপি (BJP)। দলীয় তরফে প্রতিটি মণ্ডলে মণ্ডলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে তপশিলি জনজাতি অধ্যুষিত বিধানসভাগুলোতে। বৃহস্পতিবার দলের সাংসদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন রাজ্য নেতৃত্ব স্থানীয়রা।
’২১ এর বিধানসভায় ভালো ফল হলেও ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোট ও তারপর একাধিক উপনির্বাচনে খারাপ ফলাফলে দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। অনেক রাজবংশী নেতা দলের থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন। জেলায় জেলায় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কোন্দল। পাশাপাশি দলেরই রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায়ের বেসুরো গেয়ে ওঠা, এসআইআর ভোগান্তি সহ নানা ইস্যুতে রাজবংশী ভোটব্যাংক নিয়ে আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না নেতারা।
প্রশ্ন উঠছে, তবে কি রাজবংশী ভোটব্যাংক নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বিজেপি? নাকি তপশিলি সংরক্ষিত আসনে জেতা বিধায়কদের পাঁচ বছরের পারফরমেন্স নিয়ে জনতার ক্ষোভ আঁচ করতে পেরেই আবগে উসকে দিতে চাইছে তারা? তৃণমূল কংগ্রেসও এই কর্মসূচিকে ‘ভোটের আগে লোকদেখানো’ বলে কটাক্ষ করছে।
উত্তরজুড়ে মহাসমারোহে মনীষীর জন্মদিন পালনের মূল দায়িত্বে রয়েছেন জলপাইগুড়ির বিজেপি সাংসদ জয়ন্ত রায়। তিনি অবশ্য ওপরের সমস্ত সম্ভাবনা নস্যাৎ করে বলেছেন, ‘পঞ্চাননকে কেবল উত্তরবঙ্গের মনীষী করে রাখা হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অঞ্চলের মানুষের কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। জন্মদিন উপলক্ষ্যে গোটা রাজ্যে আমরা তাঁর বাণী ছড়িয়ে দিতে চাই।’
জয়ন্তর দাবি শুনে তাচ্ছিল্যের সুর খলিসামারি পঞ্চানন মেমোরিয়াল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্টের সম্পাদক তথা তৃণমূলের কোচবিহার জেলা কমিটির চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মনের গলায়। তঁার বক্তব্য, ‘বিজেপির কোনও নেতা কখনও রাজবংশীদের অধিকার নিয়ে বলার জন্য ছিলেন না। বিধানসভা ভোটের আগে লোকদেখানো প্রীতি দেখাতে ব্যস্ত ওরা। আমরা প্রতিবছরের মতোই দিনটি পালন করব।’
বিজেপির মতো দলগতভাবে নির্দিষ্ট নির্দেশ না থাকলেও তৃণমূলও (TMC) নির্বাচনের আগে রাজবংশী আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছে। উত্তরবঙ্গজুড়ে মনীষীর জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে তারা। রাজবংশী স্কুল থেকে পঞ্চানন বর্মার নামে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিকে সামনে রেখে প্রচার চালানো হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ জানালেন, যে যেখানে পারবেন, মাল্যদান সহ নানা অনুষ্ঠান করবেন। ভোটের আগে নতুন করে হচ্ছে, এমন নয়। দলীয় নির্দেশ কিছু নেই।
শুধুমাত্র জন্মদিনে নিজেদের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখছে না পদ্ম শিবির। কেন্দ্র কতটা রাজবংশী-প্রেমী, তা বোঝাতে বিগত কয়েকবছরে রাজবংশী জনজাতির কতজন মানুষকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, সে নিয়েও জোরদার প্রচার চালানো হবে। প্রচারে থাকবে, কীভাবে এই মানুষদের অভাব-অভিযোগ লোকসভায় ও বিধানসভায় তুলে ধরেছেন দলের সাংসদ, বিধায়করা।
উত্তরবঙ্গের ৫৪টি বিধানসভা আসনের ১৭টি তপশিলিদের জন্য সংরক্ষিত। তপশিলি অধ্যুষিত আরও ২১টি আসন রয়েছে। এগুলোতে রাজবংশী ভোট ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ। শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এখানকার ৩০টি আসন জিতেছিল। বর্তমানে দলে থাকা ২৫ জন বিধায়কের মধ্যে তপশিলি ৯ জন। এবার শুধুমাত্র রাজবংশী জনজাতির ভোটের ওপর ভরসা করে মোট ৩৮টি আসনকে টার্গেট করছে তারা।
এর ফলেই কি মনীষীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তঁাদের মন পাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে? যদিও মাটিগাড়া নকশালবাড়ির বিজেপি বিধায়ক আনন্দময় বর্মনের যুক্তি, ‘ভোটের কোনও অঙ্ক নেই এখানে। কেন্দ্র ছাড়া কোনও সরকার রাজবংশীদের গুরুত্ব দেয়নি। তৃণমূল দিনের পর দিন বঞ্চিত করছে।’

