অনসূয়া চৌধুরী, জলপাইগুড়ি: দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর এমন হতে হবে যেন মিষ্টির গায়ে আঠার মতো লেগে থাকে৷ মিষ্টির নাম রসমালাই। সেখানে যদি মালাই না থাকে তবে আর কীসের সেই বিশেষ মিষ্টি! বলতে বলতে ষাটোর্ধ্ব মৃণালকান্তি রায়, গোবিন্দ রায়রা স্মৃতিসাগরে ডুব দেন। জলপাইগুড়ি শহরের (Jalpaiguri) স্টেশন রোডের ‘রামদার মিষ্টির দোকান’ এই রসমালাইকে ঘিরেই শহরবাসীর রসনাসিক্ত হৃদয়ে এক অনন্য আবেগের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে, প্রধান ডাকঘর মোড়ে যখন রাধারমণ ঘোষ তাঁর স্বপ্নের বুনন শুরু করেছিলেন, তখন হয়তো ভাবেননি যে তাঁর হাতের সেই সাধারণ রসমালাই একদিন শহরের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। বর্তমানে দোকানের পোশাকি নাম ‘নিউ আনন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ হলেও তা কেবল খাতায়-কলমেই। গোবিন্দরা যেভাবে গোড়ার দিন থেকে রসমালাই বানিয়ে আসছেন তাতে এই দোকানের পোশাকি নাম মনে রাখতে কারও বয়েই গিয়েছে! বরং রামদার মিষ্টির দোকান নামটাও যদি মনে না থাকে তবে রসমালাইয়ের দোকান বললেই কেল্লা ফতে।
গোড়ার দিকে দোকানটি কাঠের ছিল। সেখানে ভাজা হত গরম গরম শিঙাড়া আর কচুরি। কিন্তু মানুষের ভিড় জমত মূলত সেই বিশেষ রসমালাইয়ের টানেই। বর্তমান কর্ণধার রাজকিশোর ঘোষ বাবার কাছে শোনা গল্পের ঝাঁপি খুলে স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, প্রায় ৫০ বছর আগে ভারতে যখন জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল, তখন সেই পুরোনো দোকানটি ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতির চাপে রাধারমণ আর তাঁর ছেলে রামনারায়ণ ঘোষ দোকানটিকে বর্তমান স্টেশন রোডে সরিয়ে নিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে কাঠের কাঠামোর জায়গায় উঠেছে পাকা দেওয়াল, লেগেছে আধুনিকতার প্রলেপ। কিন্তু দোকানের প্রাণভোমরা সেই রসমালাইয়ের স্বাদ আজও আদি ও অকৃত্রিম।
রামনারায়ণকে সবাই ভালোবেসে ডাকতেন ‘রামদা’ বলে। সেই থেকেই দোকানের নাম হয়ে যায় ‘রামদার মিষ্টির দোকান’। বর্তমান যুগে বেকড রসগোল্লা, বেকড সন্দেশ বা ছানাপোড়া হরেক রকম আধুনিক মিষ্টির জোগান থাকলেও রাজকিশোর একটি বিষয়ে অটল—ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস নয়। তাঁদের বিশেষত্ব হল রসমালাইয়ের সেই ঘন ক্ষীর, যার ঘনত্ব আজও সত্তরের দশকের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়।
দোকানে মিষ্টি কিনতে আসা অনির্বাণ দাসের কথায় ফুটে ওঠে এই পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি টানটার ছবি। মায়ের আবদারে নলেন গুড়ের রসমালাই আর স্পেশাল রসমালাই প্যাক করতে করতে তিনি জানান, তাঁর মা আজও সেই ছোটবেলার স্বাদের টানে এখানে ফিরে আসতে চান। যুগের পরিবর্তনে নলেন গুড়ের নতুন রসমালাই এলেও পুরোনো আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। দোকানে আসা অন্তরা বসু বললেন, ‘স্বামীর কথায় একবার এই দোকানে এসে রসমালাই কিনেছিলাম। তারপর থেকে বলতে গেলে এর প্রেমেই পড়ে গিয়েছি। এই মিষ্টির টানে দু’–তিনদিন পরপরই হানা দিই!’ সুগার হলে? অন্তরা হেসে ফেলেন।
মৃণালকান্তিদের কথায় ফেরা যাক। ষাটোর্ধ্ব এই কারিগররা রামনারায়ণের আমল থেকে আজও রসুইঘরে একইভাবে মিষ্টি তৈরি করছেন। বয়সের ভারে কিছটা ন্যুব্জ হলেও গুপ্ত মন্ত্র যাতে কোনওভাবেই কারও হাতে না যায়, সে বিষয়ে তাঁরা সদা সজাগ। এই কারিগররা এখন পরবর্তী প্রজন্মকে শিখিয়ে দিচ্ছেন এই গুপ্ত মন্ত্র, যাতে শহরের এই প্রিয় স্বাদটি সময়ের গর্ভে হারিয়ে না যায়।

