- দীপায়ন বসু
মধ্যবিত্ত। না ঘরকা না ঘাটকা। না পারে আম্বানিদের মতো বিলাসবহুল জীবন বাঁচতে না খুব গরিবির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে ফুটপাথে জীবন কাটাতে। মাঝামাঝি এক অবস্থান। দাঁতে দাঁত চেপে। বহুদিন ধরেই। আর এভাবেই চলতে চলতে তারা দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ভারতের অর্থনীতি যে এই মধ্যবিত্তদের কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত চালিত হয় তা আগ বাড়িয়ে বলার হয়তো কোনও প্রয়োজনই নেই।
এমন নয় যে, এই শ্রেণি শুধুমাত্র আমাদের দেশেই আছে। আছে গোটা বিশ্বেই। তবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে উপরি বিষয় বলতে এই শ্রেণিকে আরও দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চমধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। তফাত বলতে ট্যাঁকের জোর। সরকারি বা সম মানের কিছু বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি উপরি রোজগার যাঁদের তাঁরাই সাধারণত প্রথম দলে। এই শ্রেণিতে ভালো ব্যবসা করেন এমন কিছু মানুষও রয়েছেন। আর কমদামি বেসরকারি চাকরি, অতিরিক্ত কিছু আয়ের জন্য যাঁরা মুখে ফেনা তুলে দিনরাত ছোটাছুটি করেও সংসারে সেভাবে খুশির আলো দেখাতে ব্যর্থ, তাঁরা দ্বিতীয় দলে। আর এখানেই দু’দলে দারুণ ফারাক। ‘আমার বাবার দামি গাড়ি, তোর বাবার ভাঙা বাইক!’ বলে চিৎকার করে একদলের ভাবী প্রজন্ম আরেক দলের সমবয়সিদের দুয়ো দেওয়ার স্পর্ধা দেখে।
হরেদরে অবশ্য দু’দল মিলেমেশেই এই শ্রেণিকে শক্তপোক্ত করে। আর আখেরে বোকা বনে। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র ক্যাসানোভা শাহরুখ মধ্যবিত্ত (সিনেমার পটভূমি বিদেশবিভুঁই হলেও নির্মাতারা অবশ্য চরিত্রগুলিকে মধ্যবিত্ত মানসিকতা আর মূল্যবোধে মুড়ে দিতে চেষ্টায় কোনও খামতি রাখেননি) কাজলের প্রেমে পড়ে। নিজের সীমারেখার বিষয়ে খুব ভালোভাবে জানা থাকায় কখনোই তা ডিঙিয়ে ‘অনৈতিক’ কিছু করার চেষ্টা করে না। গোটা বিষয়টাকে দারুণভাবে মুড়ে দশর্কদের সামনে পেশ। বক্স অফিসে জয়জয়াকার, নির্মাতাদের ট্যাঁক ‘হাউসফুল’।
চেতন ভগতের কথায় আসা যাক। দারুণ পড়াশোনা, সেই সুবাদে মোটা টাকার ঈর্ষণীয় চাকরি। কিন্তু একদিন সব ছেড়েছুড়ে হাতে কলম তুলে নেওয়া। লিখলেন ‘ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান’। এই বইয়ের বিষয়বস্তু কী যাঁরা এটি পড়েছেন তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানেন, যাঁরা বইটি পড়েননি তাঁরা নিশ্চয়ই আমির খানের ‘থ্রি ইডিয়টস’ দেখেছেন। মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যবিত্ত ধ্যানধারণা কীভাবে মধ্যবিত্তেরই টুঁটি প্রতিনিয়ত চেপে ধরছে তা নিশ্চই উপলব্ধি করেছেন। সেই সিনেমায় দেখানো মুক্তির উপায় দেখে নিজেও বাঁধনছাড়া হওয়ার স্বপ্নে মজেছেন।
কিন্তু স্বপ্ন দেখলেই সেটা সহজে কে-ই বা হতে দিচ্ছে? ঘুরেফিরে সেই রোজগারের কথাতেই ফিরে আসা যাক। আসলে টাকাতেই তো লুকিয়ে শ্রেণিবিভাজন।
শেয়ারের কথায় আসা যাক। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই হল। শেয়ার কিনে দিনে চার–পাঁচ হাজার টাকার খুব সহজ রোজগার, এমন বিজ্ঞাপনের অহরহ হানাদারি। কিন্তু বিষয়টি কি এতই সোজা! যাঁরা নিয়মিত এই বাজারে কেনাকাটা করেন, আজকাল এখানকার পরিস্থিতি দেখে যেন আপাতত এই বাজারের ছায়া এড়াতে পারলে বাঁচেন। তবুও মানুষ রোজগারের স্বপ্ন দেখে। হয়তো কিছু রোজগারও করে। কিন্তু সরকার বাহাদুর ছাড়বে কেন? মধ্যবিত্ত যে এখানে টাকা খাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখে তা তাদের খুব ভালো করেই জানা আছে। পাশাপাশি, রোজগারের উপায়টাও। তাই খাতায়-কলমে যতই বছরে ১২ লাখ টাকায় কোনও আয়কর দিতে হবে না বলে জোরগলায় জানানো হোক না কেন, শেয়ার বাজারে এক বছরের কম সময় টাকা খাটিয়ে কেউ কোনও টাকা রোজগার করলে তার বেশ কিছুটা শতাংশ কেটে নিতে তার এতটুকুও হাত কাঁপে না। রোজগারের এই টাকা মিলিয়েও মধ্যবিত্তের যদি বছরে ১২ লক্ষ টাকা উপার্জন না হয়, কেউ শোনার নেই।
আসলে এটাই মধ্যবিত্তের আসল চরিত্র। উচ্চবিত্ত শ্রেণির চাপে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত। আবার নিজেরাও পারলে নিজেদের থেকে কমজোরিদের নিষ্পেষণে সদাই এগিয়ে। দুর্নীতিকে সঙ্গী করে এই শ্রেণির কতজন যে প্রাথমিক আর তার ওপরের স্কুলগুলিতে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়েছেন সেই অভিযোগের সাক্ষী আদালত। এভাবে শিক্ষক হিসেবে চাকরি বিশেষ করে প্রাথমিকে, গর্বের শেষ নেই। এঁদের অনেকেরই বাংলাতে একটা বাক্য ঠিকমতো লেখার যোগ্যতাও নেই, আবার সিস্টেমকে দোষারোপেও খামতি নেই। তাই এঁরা নিজেদের ছেলেমেয়ের শিক্ষায় সরকারি ব্যবস্থায় মোটেও ভরসা না করে নামী বেসরকারি স্কুলে পাঠান। নিজের ছোট ছেলের বিয়েতে মুকেশ আম্বানিকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে দেখে ‘এর থেকে দেশের সবাইকে এক লক্ষ টাকা করে দিয়ে দিলে কাজের কাজটা হত’ বলে ফুট কাটেনও। ঠিকমতো মাথা খাটিয়ে হিসেবে করে দেখেনও না ওই বিয়েতে খরচ করা টাকা দেশের মাথাপিছু বাসিন্দার হিসেবে ভাগ করলে টাকার পরিমাণটা ৪০ টাকাও হবে না। আর সেই টাকা আম্বানিরা কীভাবে ফের নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছেন তা যাঁরা তাঁদের মোবাইল পরিষেবা ব্যবহার করেন তাঁরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। অন্তত ভুক্তভোগীদের তেমনটাই দাবি।
তবুও জীবন স্বপ্ন দেখে। মধ্যবিত্ত তা দেখে। জীবন বদলের আশাও করে। নিজের পাশাপাশি আর পাঁচজনেরও। চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করে দেখুন, এক্ষেত্রে ডঃ এপিজে আবদুল কালাম, ডঃ ভার্গিস কুরিয়েন, কৈলাস সত্যর্থী, অরুণাচলম মুরুগানানথম, ডাঃ দেবী শেঠির মতো এত নাম আসবে যে লিখে শেষ করা যাবে না। এঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল। আবার অন্যরাও যাতে সফল হন, সেদিকেই সদাই নজর রেখেছেন, রেখে চলেছেন। আসলে এখানেই মধ্যবিত্তের শিকড়। ‘খুব বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে/খুব ছোটো থেকো না, ছাগলে খেয়ে যাবে’ বলে মন্ত্রে যাঁরা বেড়ে উঠেছেন, জীবনের প্রকৃত অর্থটা কী তা এই মধ্যবিত্তরা খুব ভালোমতোই উপলব্ধি করেছেন। আর তাই সেভাবেই নিজের পাশাপাশি দেশকে গড়ার চেষ্টা করেছেন।
আর এখানেই মধ্যবিত্ত মিলেমিশে একাকার। একদিকে চরম স্বার্থপরতা, অন্যদিকে উদারতা। দুইয়ে মিলেমিশে একটা ব্যালেন্স। ১৯৯১ সালে আমাদের দেশে উদারীকরণ চালু হওয়ার পর থেকে যে ব্যালেন্স দেশকে প্রকৃত ভারসাম্য দিয়ে চলেছে। যেদিকে তাকিয়েই বাজারে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন স্মার্টফোন, নানা সুদে হোম লোনের অফারের হানাদারি। নতুন কেনা সেই স্মার্টফোন বা ফ্ল্যাটকে মধ্যবিত্ত বুক দিয়ে আগলে রাখে। আবার সাধ্যে কুলোলে কিছুদিন পর নতুন কিছু কেনার দিকে হাত বাড়ায়।
ভালো থাকুক মধ্যবিত্ত। ভালো থাকুক দেশ। ভালো থাকুক সবাই।



