মোহিত করাতি
বাংলার আকাশ মানেই একসময় ছিল রঙিন ঘুড়ির (Kite Flying Tradition) মেলা। পৌষ সংক্রান্তি হোক বা বিশ্বকর্মাপুজো—ছাদ তখন আর ছাদ থাকত না, হয়ে উঠত কুরুক্ষেত্র! সুতোয় সুতোয় লড়াই, আর আকাশ চিরে ‘ভোকাট্টা’র উল্লাস। দাদু শেখাচ্ছেন নাতিকে লাটাই ধরার কায়দা, বাবা শেখাচ্ছেন হাওয়া বুঝে সুতো ছাড়ার কৌশল—এই ছবিটাই ছিল বাংলার ঘরোয়া সংস্কৃতির সিগনেচার টিউন। কিন্তু হায়! আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার চাপে সেই লাটাই আজ ধুলোমাখা হয়ে চিলেকোঠার এক কোণে পড়ে আছে। তবে সব শেষ হয়ে যায়নি। আশার কথা হল, ফের সেই হারিয়ে যাওয়া সুতোর টান ফিরিয়ে আনার একটা জোরদার চেষ্টা চলছে।
প্রজন্মের সেতু ও কংক্রিটের দেওয়াল
একসময় ঘুড়ি (Traditional Kites) ওড়ানো ছিল প্রজন্মের মেলবন্ধন। বাঁশের কঞ্চি আর রঙিন কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানানোটা ছিল একটা আর্ট, একটা শিল্প। তাতে যেমন ধৈর্য বাড়ত, তেমনই মজবুত হত পরিবারের বাঁধন। কিন্তু এখন? প্লাস্টিকের তৈরি রেডিমেড ঘুড়ি আর মোবাইল গেমের দাপটে সেই আবেগটাই গায়েব। তার ওপর দোসর হয়েছে নগরায়ণ। শহরে এখন খোলা ছাদ বা মাঠ খুঁজে পাওয়া আর ডুমুরের ফুল দেখা একই ব্যাপার। আকাশ ঢেকেছে বহুতল আর বিদ্যুতের তারের জঞ্জালে। তবুও হাল ছাড়েনি বাঙালি। নানা সাংস্কৃতিক সংগঠন আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফের উদ্যোগী হয়েছে। প্রশাসনের সাহায্যে নির্দিষ্ট মাঠে উৎসব হচ্ছে, হচ্ছে কর্মশালা। যে সোশ্যাল মিডিয়া একদিন মাঠ থেকে ছেলেদের ঘরে ঢুকিয়েছিল, আজ সেই সোশ্যাল মিডিয়াতেই (Social Media) ঘুড়ি উৎসবের ডাক দেওয়া হচ্ছে।
বিষাক্ত নাইলন বনাম মাটির টান
তবে আবেগের সঙ্গে বিবেকের প্রশ্নটাও জরুরি। আগেকার সুতো ছিল পরিবেশবান্ধব। আর এখনকার চিনা মাঞ্জা বা নাইলন সুতো মানুষ আর পাখি—উভয়ের জন্যই মরণফাঁদ। এই ফেরার লড়াইয়ে তাই জোর দেওয়া হচ্ছে সেই পুরোনো সুতোর ওপর। এতে লাভ দু’দিকেই। পরিবেশও বাঁচবে, আবার গ্রামের যে কারিগররা লাটাই-ঘুড়ি বানিয়ে পেট চালাতেন, তাঁদের ঘরেও দু’পয়সা আসবে। লোকশিল্প চাঙ্গা হলে আখেরে লাভ তো আমাদের অর্থনীতিরই।
রিমোট ছেড়ে লাটাই ধরুক হাত
ঘুড়ি ওড়ানো ফেরানো মানে শুধু একটা খেলা ফেরানো নয়, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা। দলগত কাজ বা টিমওয়ার্ক শিখতে কর্পোরেট ক্লাসে যাওয়ার দরকার নেই, একটা লাটাই আর সুতোই যথেষ্ট। স্কুলের গণ্ডিতেও যদি একে জায়গা দেওয়া যায়, তবে মন্দ হয় না। সব বাধা ডিঙিয়ে যখন আবার আকাশে পেটকাটি-চাঁদিয়াল উড়বে, তখন শুধু ঘুড়ি উড়বে না, উড়বে বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। রিমোট কন্ট্রোল সরিয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে লাটাই তুলে দেওয়াটাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ।
(লেখক প্রাবন্ধিক)



