বাঙালির বারোটা আর ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম
জয়দীপ সরকার
বছর তিরিশ আগের কথা। মোবাইল ফোন নামক যন্ত্রটি আমাদের হাতে আসেনি তখনও। কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার খবর রাস্তা ছাড়া আর কারও রাখার কোনও সুযোগ ছিল না। আমাদের পাড়ার মঞ্জুদির বিয়ে ঠিক হয়েছিল শিলিগুড়িতে। তখন দিনহাটা–শিলিগুড়ি রাস্তার অবস্থা ভয়ংকর। এমনিতেই বাঙালির বিয়েবাড়িতে বরযাত্রী কখনোই সময়মতো আসে না, তবুও সেদিন দেরি হতে হতে লগ্ন বয়ে যায় প্রায়। অতিথি আপ্যায়নে তখনও কেটারার সার্ভিস শুরু হয়নি এ তল্লাটে। কোমরে গামছা বেঁধে পাড়ার ছেলেরা পরিবেশনে ব্যস্ত। আমরা সিনেমার মতো দেখলাম, একটা সময়ের পর পাড়ায় আমাদের বয়হুড হিরো রঞ্জনদার কোমরের গামছা বদলে গেল নতুন ধুতিতে। যে হাত সন্ধ্যার পর থেকে বইছিল মাংসের বালতি, সে হাতে উঠে এল আমের পল্লবে মোড়া ‘দর্পণ’। মঞ্জুদি ‘লগ্নভ্রষ্টা’ হলেন না। আমরা তখন হাইস্কুল ডিঙোচ্ছি সবে। মঞ্জুদি পাড়ার ডাকসাইটে সুন্দরী। ওর প্রতি রঞ্জনদার সীমাহীন দুর্বলতার কথা আমাদের কারও অজানা ছিল না। তো এই মধুরেণ সমাপয়েৎ আমাদের কাছে এক রূপকথার গল্পের মতো আনন্দ যাপন হয়ে উঠল। আর এইসব ঘটনা যখন ঘটছিল, বরযাত্রীর গাড়ি তখনও নাকি ময়নাগুড়ি বাইপাসের রেলগেটের জ্যামে আটকে।
ময়নাগুড়ি বাইপাস এখন চার লেনের ফ্লাইওভারের নীচে বিষণ্ণ এক বাজার মাত্র। ওই রাস্তার ধারে বিখ্যাত ঝাঝাঙ্গি ধাবা এখন বিরহী প্রেমিকের মতো উদাস চোখে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে দেশি-বিদেশি ঝাঁ চকচকে গাড়ির গতিময়তা মাপে সারাক্ষণ। কিন্তু এখনও, হরেকরকম ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের তৈরি করা শিডিউলের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেই বাঙালি বরযাত্রীর দল কিন্তু পথে একটু দেরি করেই ফেলে। এ দেরি মজ্জাগত।
আসলে বাঙালির কোনও অনুষ্ঠান ১২টায় শুরু হবে মানে ১টায় পৌঁছালেই যথেষ্ট— এটা আমরা, মানে বাঙালিরা, ধরেই নিই। স্মিতহাস্যে যে কোনও অনুষ্ঠানেই স্বতঃপ্রণোদিত বিলম্বে আয়োজকরাও যুক্তি দেন— ‘বোঝেনইতো, বাঙালির টাইম।’ উলটোদিকে, যেসব বাঙালি সময়ানুবর্তিতা মেনে চলেন, তাঁরা গর্ব করে বলেন, ‘আমি কিন্তু ভাই ব্রিটিশ টাইম মেনে চলা লোক।’ যদিও ব্রিটিশদের মজ্জায় দেরি করার প্রবণতা নেই, ইতিহাস সেকথা বলে না, কারণ ইংল্যান্ডে ভিক্টোরিয়ান যুগের আগে ‘পাংচুয়ালিটি’ ব্যাপারটা তাদের সামাজিক আচরণবিধির মধ্যে সেভাবে ছিল বলে জানা যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, যৌনতার রক্ষণশীলতা সহ ইংরেজদের আজ যা কিছু সামাজিক ‘এটিকেট’ সেসবের সিংহভাগই ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে পল্লবিত হতে শুরু করে।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের চালচিত্র সমীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিলম্বিত লয়ে চলা ভারতবর্ষের বিবিধের মাঝে মিলনের একটা অন্যতম উপাদান। ভারতবর্ষের এমন কোনও প্রদেশ নেই যেখানে নেতারা নির্ধারিত সময়ে মিটিংয়ে আসেন বা সরকারি কর্মচারীরা সঠিক সময়ে অফিসে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। স্বাধীনতা বা প্রজাতন্ত্র দিবসে লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন বা উন্মোচনে এক মিনিট দেরি কখনোই হয় না। কিন্তু সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে, গোটা ভারতেই সরকারি স্কুলে, কলেজে শিক্ষকরা একটু দেরি করেই ক্লাসে ঢুকবেন, এটাই দস্তুর। যদিও এই বদনামে আমাদের খুব একটা গাত্রদাহ হয় না। আসলে ঘড়ির বাইরে যে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম’ তার একটা আভিজাত্যের ঔদার্য আছে। স্কুলে ১০ মিনিট দেরি করে ঢোকা মাস্টারমশাইকে তাঁর পাণ্ডিত্যের নিরিখে, পড়ানোর শৈলীতে আমরা বিচার করেছি চিরকাল, সময় মেপে নয়। যদিও এখন সময় পালটেছে। বিদেশের মতোই ঘণ্টাপ্রতি পড়ানোর চুক্তিতে কর্পোরেট স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে আমাদের দেশেও। কিন্তু এগুলো সাধারণ চালচিত্র নয়। গোটা দেশেই সরকারি অফিস যদি সকাল ১০টায় খোলার কথা হয়, সেখানে, আমাদের কাজ থাকলে, আমরা ১১টা নাগাদ যাব বলে ঠিক করি, কারণ, ব্যাংক, বিমার মতো কর্পোরেট সরকারি ক্ষেত্র বাদ দিলে, ১১টার আগে কেউ টেবিলে বসবেন কি না সেটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থেকেই যায়।
কিন্তু ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের লোকজন জীবনচর্যার এই বিলম্বিত লয়ের দায় নিজেদের কাঁধে সেভাবে নেয় না, যেভাবে বাঙালি ‘বাঙালির টাইম’ শব্দবন্ধে এই দায় বহন করে। এটাও আসলে বাঙালির এক ধরনের বৌদ্ধিক আঁতলামি। আসলেই, সারাদিন বাঙালি যেভাবে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে—বাঙালির কিছু হবে না, বাঙালি কাঁকড়ার জাত, ইত্যাদি, ইত্যাদি— সেরকমভাবে নিজের জাতিসত্তার অবমূল্যায়ন সারা ভারতের অন্য কোনও জাতি করে বলে জানা নেই। খুব গভীরভাবে দেখলে, বাঙালি অস্মিতা একটা রাজনৈতিক প্রয়োজনের শব্দ এখন। অবশ্যই একটা সময় প্রকৃত অস্মিতা বাঙালির ছিল। বাঙালি তখন নোবেল পেত, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজে বক্তৃতা করতে যেত। সেই বাঙালির যাপন ছিল বিলম্বিত লয়ের, সে শিলাইদহের কাছারি বাড়িতে হোক বা মংপুর বাংলো, কিন্তু তাঁর বৌদ্ধিক অনুশীলন ছিল বিশ্বকে দিশা দেখানোর। সেই বৌদ্ধিক আভিজাত্যের মানুষগুলোকে আমরা হারিয়েছি, বিনিময়ে পেয়েছি সেইসব বাঙালি জাতিসত্তার নেতৃত্বদের যাঁরা আমাদের সামনে মডেল হিসেবে দাঁড় করান উত্তরপ্রদেশ বা অসমের কর্মতৎপরতাকে। আমরা এখন ঈর্ষা করি গুজরাটি ব্যবসায়ীদের, না, দক্ষিণ ভারতীয়দের বৌদ্ধিক অনুশীলনকে নয়। কিন্তু একসময় বাংলার সমগোত্রীয় বৌদ্ধিক চর্চা ছিল দক্ষিণেই।
বছর কুড়ি আগে আমরা কয়েকজন বাঙালি অধ্যাপক ভিনরাজ্যে একটা অ্যাকাডেমিক কোর্সে ছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন গোটা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। সেখানে একজন অধ্যাপক ছিলেন, যিনি হরিয়ানা থেকে এসেছিলেন। তিনি পড়াতেন একটা আইন কলেজে। খুব সপ্রতিভ ছিলেন তিনি। কীভাবে যেন হঠাৎ করেই আমরা তাঁকে ডাকতে শুরু করেছিলাম ‘উকিল সাব’ বলে। তিনি যতই বলতেন— আরে ভাই, আমি উকিল নই, ল’ কলেজে পড়াই মাত্র— কিন্তু কে শোনে কার কথা! ল’য়ের লোক মানেই উকিল! ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার উপর সেই অধ্যাপকের গভীর আস্থা ছিল, এবং তা নিয়েই একজন রিসোর্সপার্সনের সঙ্গে একদিন তাঁর লম্বা একটা তার্কিক আলোচনা চলে। না, তখনও সব অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ আমাদের হাতে ছিল না। কিন্তু আমাদের এক বন্ধু ফিল্ম ক্যামেরায় সেই মুহূর্তটি বন্দি করেছিলেন। সেই হরিয়ানি অধ্যাপক অনেক দিন সেই ছবিটি আমাদের বাঙালি অধ্যাপক বন্ধুর কাছে চেয়েছিলেন। না, ছবিটি তিনি পাননি। হ্যাঁ, ১০ বছর পর ছবিটি তাঁকে পাঠিয়েছিল আমার সেই বন্ধু, আর নোট লিখে দিয়েছিল— তোমার সেদিনের ছবিটা পাঠাতে আমার একটু দেরি হয়ে গেল, তবে তোমার জন্য খুব বেশি দেরি নয় হয়তো, কারণ তুমি তো বিচার বিভাগের মানুষ!
সম্প্রতি একটা ‘দেরি’র ঘটনা সইতে হয়েছে আমাকে। কলেজ যাচ্ছিলাম। ঘুঘুমারিতে পথ অবরোধে আটকে পড়লাম। ঘড়িতে দেখলাম, প্রথম ক্লাস নেওয়ার জন্য মিনিট ৪০ হাতে আছে তখনও। এই রাস্তায় পঁচিশ বছর নিত্যযাত্রী হিসেবে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে ভাবলাম, পুলিশের মধ্যস্থতায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অবরোধগুলো উঠে যায় সাধারণত, আর তাই একটু দেরি হলেও ক্লাসটা ধরতে পারব ঠিক। ছাত্রদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ করে দিলাম— একটু দেরি হবে আমার পৌঁছাতে, তোরা অপেক্ষা করিস। কিন্তু সেই একটু দেরিটা শেষ অবধি দাঁড়াল প্রায় ঘণ্টাতিনেক। একের পর এক গ্রুপে মেসেজ করতে হল আমাকে— তোরা ফিরে যা, আজ আমি ক্লাসটা নিতে পারছি না। কিন্তু তিন ঘণ্টা দেরি হলেও, কলেজ না গিয়েও আমার আর অন্য কোনও উপায় ছিল না, কারণ পেছনে গাড়ি ঘোরানোর কোনও পথও ছিল না। পথ অবরোধ করেছিলেন এসআইআর–এর সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে যেসব বৈধ ভোটারের নাম ডিলিটেড, তাঁরা। তাঁদের মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছিল। কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা অবরোধকারীদের হাতে ছিল না, পতপত করে উড়ছিল জাতীয় পতাকা। এর মধ্যে খবর পেলাম, তোর্ষা সেতুর ওপরে নাকি এলাকার বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর মুখোমুখি একপ্রস্থ বচসা হয়ে গেল এই অবরোধ নিয়ে। গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে নিশ্চুপ বসে আছি। তিন ঘণ্টা পর আমি যখন কলেজের দিকে এগোচ্ছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের জুতোয় পেরেক ছিল বলে পথে বড় কষ্ট, আর তাই কবির যেমন দেরি হয়েছিল, আমাদেরও অনেক পেরেকের হিসেবনিকেশ করতে করতে ক্রমাগত দেরি হয়ে যায়, সে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিতে হোক বা এসআইআর শুরু করতে, সময়টা ব্রিটিশ রাজ হোক বা ৭৫ পেরোনো অভিজ্ঞ ভারতীয় গণতন্ত্র। জল থেকে তুলতে দেরি না হলে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো আজ তাঁর পডকাস্টের নতুন কোনও পর্বে সময়মতোই শামিল হতেন।
অপেক্ষাই তো প্রেমের প্রাণ
পার্থপ্রতিম মিত্র
ফিলিং গুড হরমোন ডোপারিনের নিঃসরণ কী বাইরের অভিব্যক্তিতে কোনও চিহ্ন বহন করে চলে? সেদিন সমস্ত হোমটাস্ককে সিকেয় রেখে উলুলি ঝুলুলি চুলে আঙুল চালাতে চালাতে মোবাইলের কিপ্যাড ত্রস্ত হাতে টিপে চলা পৌত্রী জানিসাকে পরখমগ্ন ঠাম্মু জয়িতা এমনটাই ভাবছিল কিনা! ওর নাক টিপলে দুধ বের হওয়া নাত প্রেমিকপ্রবর জয় ছোকরাটিকে দর্শন ধন্য হওয়ার সুযোগের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে তো দিয়েছে এই মোবাইল যন্ত্রটাই। অনুরাগ আর পূর্বরাগ যখন জন্ম হচ্ছে এবং সাঙ্গ হচ্ছে চ্যাটিংয়ের মধ্যে দিয়েই তখন নানা অছিলায় ফ্ল্যাটে এসে ঘুরঘুর করতে চ্যাংড়ার বয়েই গিয়েছে। ঠাম্মু হয়ে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে নাতনির কাছে আবদারে আহ্লাদে এক ঝলক পুঁচকে প্রেমিকের প্রোফাইল পিকচারটা দেখতে পেয়েছিল মাত্র। আজ যখন কন্যা প্রজ্ঞা অফিস যাওয়ার আগে মেয়ের মোবাইলটা তার জিম্মায় রেখে রাগ দেখিয়ে বলে গেল, যেন ওর হাতে না যায় মা। তাহলে কিচ্ছুটি পড়বে না। জয়িতা দেবী তখন কপট গাম্ভীর্য দেখিয়ে মোবাইলের উপর চোরা চোখ রেখে দেখতে থাকে জয় ছোকরাটির মেসেজের অনন্ত নোটিফিকেশন স্রোত। হ্যাঁরে বাপু, একে কি প্রেম বলে? এই মোবাইল যন্ত্রটা তোদের তারিয়ে তারিয়ে প্রেম করতে দিল নারে! হ্যাঁ করেছিলাম বটে আমরা –! এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিভ কাটলেও ততক্ষণে স্মৃতি স্বর্গের উদ্যানে সৌরভ নিতে শুরু করে দিয়েছেন!
সারা পাড়ার অহংকার সুব্রতদা যখন জয়েন্টে হেব্বি র্যাংক করে শিবপুর বিই কলেজে শেষমেশ চলেই গেল, সেটা ছিল জুলাই মাস। পুরোপুরি তিন মাস নো চিঠি – নো টিকি! আচ্ছা চিঠিটা দেবে কীভাবে শুনি! বাড়ির দরজার পাশে ঝোলানো তালা লাগানো চিঠি বাক্সগুলো তো ছিল অভিভাবকদের কঠোর কঠিন নজরদারিতেই। আগে বসার ঘরের জানালার পর্দাটা ফাঁক করতেই চোখে পড়ে যেত সুব্রতদাদের বাড়ির বারান্দায় ওর সাইকেলটা ধুলোর প্রসাধনী মেখে দাঁড়িয়ে আছে কেমন! মাঝে ঝন্টু কাকুদের ধ্যাড়ধেড়ে বাড়ির মাধবীলতা গাছটা এমন করে বেড়ে উঠল যে দেখাও যায় না ছাই ঠিকঠাক! এখন ছাদে ওঠো! তুখোড় জিমন্যাস্টের মতো শরীরটাকে ১৮০ ডিগ্রি বেঁকিয়ে ঝুকাও! ওমা! দেখতেই শিরশির করে উঠল! সাইকেলটা নেই! তার মানে সুব্রতদা এসে গিয়েছে! এসেই চক্কর কাটতে বেরিয়েছে! সুতরাং আমাকেও বেরোতে হচ্ছে সুব্রতদার সঙ্গে সাক্ষাৎ অভিযানে! — মা! অলকদা পুজোর ছুটিতে কুণ্ড স্পেশালে ঘুরতে যাচ্ছে। তাই আমাদের এক্সট্রা পড়াবে! যাওয়ার আগে অঙ্কটা শেষ করে দিয়ে যাবে। ভাগ্যিস তখন কোচিং-এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছিল না! তাহলেই চিত্তির হত আর কি। ব্যাস! দুই বেণি করে লাল ফ্রকটা পরে বঙ্গলিপি খাতা হাতে নিয়ে সুব্রতদাকে বাউল খুঁজতে (প্রেমিকের বেলায় গোরু খোঁজা বলা যায় নাকি) বেরিয়ে যাওয়া! কাট! স্মৃতিবিহার এইটুকুই। — ওই যে! আসছে মোবাইলটা ছিনিয়ে নিতে। এই শোন! টেরোরিস্টের মতো প্রেম করার মজাটা কিন্তু তোরা পেলি না। আর তা এই মোবাইলের জন্য! দীর্ঘশ্বাস ফেলেন জয়িতা দেবী। ডোডো পাখির মতো পৃথিবীর থেকে হারিয়ে গিয়েছে বুঝি প্রেমিকার চোখের প্রতীক্ষার ভাষা! রেড ডেটা বুকে চলে গিয়েছে প্রেমিকের উদ্বেগের কথকতা! পথের দিকে আর ঘড়ির দিকে সমানুপাতিক হারে তাকাতে তাকাতে প্রেমিকের জন্য অপেক্ষমান প্রেমিকার কপালের জমে ওঠা স্বেদবিন্দুগুলি মোবাইলের ঝোড়ো হাওয়ায় সব বাষ্পীভূত! প্রেমের মতো সান্নিধ্যকামী মহার্ঘ মিথুনলীলার মাঝে ছিল কতই না অপেক্ষা প্রতীক্ষার হার্ডেল রেস! আর এখন? একমুহূর্ত দেরি না করে মোবাইল স্ক্রিনে প্রেম বার্তা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হরেককিসিমসে ইমোজি- স্মাইলি -পিক্টিওগ্রাফি – লোগোগ্রাম- ইডিওগ্রাম- কতই না প্রযুক্তিধন্য ভাবলিপি! এক মুহূর্ত দেরি নয়। আরে দেরি হলে তবেই না মগজের রসায়নটা জমে ভালো!
নেহরুর পরামর্শে রিজার্ভ ব্যাংকের মূল ফটকের দুইপাশে ভাস্কর্য নির্মাণের কথা রামকিঙ্কর বেইজের। রামকিঙ্করের যক্ষ যক্ষীর ম্যাকেট পছন্দ হল রিজার্ভ ব্যাংককর্তাদের। দিন-বছর-ঋতুর পর ঋতু পেরোয়! ডেডলাইন পেরিয়ে যাওয়ার সতর্ক বার্তা আসে। রামকিঙ্করের প্রত্যুত্তর, ‘আমাকে জেলে দিন। ভালোই হবে সেখানে বসে অনেক মূর্তি করতে পারব।’ ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৭, মাত্র ১২ বছর দেরি হয়েছিল অনন্য ভাস্কর্য ‘যক্ষ ও যক্ষী’ সৃজনে! শুধু কি রামকিঙ্কর? রঁদ্যার ‘গেটস অফ হেল’ নির্মাণ দেরি হচ্ছিল বলে সে দেশের মিনিস্ট্রি অফ ফাইন আর্টস দপ্তর অগ্রিম ফেরত চেয়ে বসেছিল! রঁদ্যার বন্ধুরা ২৭ হাজার ৫০০ ফ্রাঁ চাঁদা তুলে ফেরত দিতে উদ্যোগী হয়েছিল এই ‘দেরি’ -কে মহিমান্বিত করতে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মোনালিসা আঁকা শুরু তো করলেন ১৫০২-তে। ১৫০৫-এর বসন্ততে ভিঞ্চির স্টুডিওর ফুলের কেয়ারির পাশে সিটিং দিচ্ছেন মোনালিসা সালাইনোর বেহালা আর আটলান্টোর বাঁশি শুনতে শুনতে। আর এই দেরিতে বেড়ে যাচ্ছে তার ধনকুবের স্বামী গাইকোণ্ডোর পায়চারি এবং সোনার পাইপে ঘন ঘন তামুক সেবন। ‘পথের পাঁচালি’র শুটিংয়ে লাল ফিতের গেরোতে ‘দেরি’ হওয়াতে সত্যজিতের সৃজনী উদ্ভাবনী ক্ষমতা পরীক্ষিত হয়ে ডালপালা মেলেছে। বর্ধমানের পালসিট গ্রামে প্রথম দৃশ্য গ্রহণের মাত্র সাতদিন পরে গিয়ে দেখা গিয়েছে কাশফুলশূন্য ধু-ধু মাঠ। গোরু নাকি সব সাবাড় করে দিয়েছে। বাকি অংশের চিত্রগ্রহণের জন্য পরের শরৎ পর্যন্ত দেরি। প্রথম চিনিবাস ময়রার কটা শট নিয়ে শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী শুটিংয়ের আগেই তাঁর মৃত্যু এবং দ্বিতীয় নাদুসনুদুস চিনিবাস ময়রার খোঁজ। ভুলু কুকুরকে নিয়েও এক কাণ্ড আর সেটাও শুটিংয়ের দেরির ফল। আর তিন মাস আগে ব্যান্ড বক্সে ধুতে দেওয়া স্যুট যথাসময়ে না নেওয়া অর্থাৎ দেরি করা এবং সেই স্যুট দেরি করে নিতে গিয়ে কর্মচারীদের ধর্মঘটের জন্য না নিতে পারা অর্থাৎ সেই ‘দেরি’কে উপজীব্য করেই মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ চলচ্চিত্র!
পাগলা দাশুর নাটকে বকলেস আটকে যাওয়ায় তলোয়ার বের করতে দেরি হয়েছিল বলেই না অমন মুচমুচে আখ্যান পেলাম সুকুমার রায়ের কাছ থেকে। ‘দেরি’তে দুঃখ ও আনন্দের এক যুগপৎ দ্বন্দ্ব আছে। পুজোর সময় আমার ছোট বোন বড় সাধ করে বানাতে দিয়েছিল ববিপ্রিন্টের ঘটিহাতা ফ্রক। ডেলিভারিতে দেরি! দেরি বলে দেরি! বোধন হয়ে ষষ্ঠী সপ্তমী পেরিয়ে রাত জাগা দরজি কাকুর চোখ যেমন লাল ফ্রক না পাওয়ায় কেঁদে কেটে একশা বোনের চোখও তেমনি লাল। শেষপর্যন্ত অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিয়ে আসার সময় মা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই ফ্রক নিয়ে আসতেই নতুন ফ্রকের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দিয়ে বোনের সেই হাসি মুখটা আজও ভুলিনি বা ক্লাস এইটে একদিন স্কুল যেতে দেরি হওয়ায় গেট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলেই না সারাটা দিন পুরানো স্টেশনে চক্কর দিয়ে ভানুমতির খেল থেকে ঝান্ডি মুন্ডি জুয়া দেখার অচেনার আনন্দ টইটুম্বুর ভরে নিয়েছিলাম জীবনপাত্রে। বাবা সন্ধেতে অঙ্ক করতে বসিয়ে ক্লাবে গিয়ে ‘দেরি’ করে ফিরত বলেই না খুনখারাবির হুংকারের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সুখনিদ্রায় সমর্পণ করতে পারতাম কিশোর বয়সের দিনগুলিতে। বন্ধু পলাশের বৃদ্ধা বিধবা মার অনুযোগ ছিল, বাছা আমার বিয়ে করতে দেরি করছে। কিন্তু আমরা সবাই জানতাম পলাশ এবাড়ি ওবাড়ি রোজই প্রায় পাত্রী দেখে বেড়াত। একটাও পছন্দ হচ্ছে না? পলাশকে পাকড়াও করাতে বলেছিল, আরে এই দেরি তো আমার অফিস ফেরত বিকালের টিফিনের পয়সা বাঁচানোর একটা প্রোজেক্ট। পাড়ার এক অনূঢ়া পিসির কাছে শুনেছিলাম, নকশালবাড়ি আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ দ্রোণাচার্য ঘোষ বা তিমিরবরণ সিংহের মতোই এক উজ্জ্বল তরুণের সঙ্গে ছিল তাঁর প্রেম। যার একহাতে রেডবুক আর একহাতে হৃৎপিণ্ড। শহিদ হল সে। পিসি বলেছিল, দিনক্ষণ ঠিক করে রাখা বিপ্লবের জন্য তার আর দেরি সয়নি। বিপ্লব শেষে ঘরে ফিরে বিয়ে করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিপ্লবীকে বিয়ে করতে দেরিটা সয়ে নিয়েছিল পিসি আমার। এদিকে, আমি তো কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লব হতে দেরি হওয়ার মতো আমার প্রেমিকাকে চুম্বন দিতে ‘দেরি’ হওয়ায় ওর বিয়েতে কবজি ডুবিয়ে মাংস সাঁটাতে পেরেছিলাম। আসলে পবিত্র ‘দেরি’ হচ্ছে প্রেমের জঙ্গমতা। মোবাইলের মবিলিটি প্রেমেরই ধ্রুবসত্যের রিজিডিটিকে ভেঙে চুরমার করে দিল। তারিয়ে তারিয়ে প্রেম করতে গেলে ‘দেরি’ করা তার প্রাথমিক প্রভাবক! পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথনে’ শুভঙ্কর তো ‘দেরি’কেই কুর্নিশ করেছে! ‘তোমার চিঠি আজ বিকেলে চারটে নাগাতে পেলাম /দেরি হল জবাব দিলে সপ্তকোটি সেলাম।’ শুভঙ্কর অনর্গল, ‘আসছো তো সেই রেস্টুরেন্টে সিতাংশু যার মালিক /সোনালি ধান খুটবে বলে ছটফটাচ্ছে শালিক।’ রেস্টুরেন্টে সেদিন কে দেরি করে এসেছিল? শুভঙ্কর না নন্দিনী? দেরি না হলে সোনালি ধান খোঁটা হবে না যে! অপেক্ষাই তো প্রেমের আসল শ্বাসপ্রশ্বাস।
৬৭ বছর বয়সে প্রথাগতভাবে ছবি আঁকা শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ
তৃণা বসাক
শহরের ট্রাফিক সিগন্যালে যখন লাল বাতিটা জ্বলে ওঠে, আমাদের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি তখন সেকেন্ডের কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। বাসটা ছেড়ে দিল? মিটিংয়ে দেরি হয়ে গেল? পছন্দের মানুষটা কি ক্যাফেতে বসে বসে বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখছে? আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভিলেনের নাম ‘দেরি’। আমরা সবাই ছুটছি- যেন মহাবিশ্বের সব ট্রেন আজই ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই যে অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি, যা আমাদের টেনশন বাড়িয়ে দেয়, তা আসলে প্রকৃতির দেওয়া এক আশ্চর্য বর্ম হতে পারে?
হয়তো আপনার ঘড়িটা স্লো ছিল বলেই আপনি সেই লিফটে ওঠেননি যা মাঝপথে আটকে গিয়েছিল। কিংবা ইন্টারভিউতে দেরি হওয়ার গ্লানি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই হয়তো এমন একজনের সঙ্গে দেখা হল, যে আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। জীবন তো কোনও অলিম্পিক রেস নয়, বরং সুখ-দুঃখ দিয়ে বোনা এক রঙিন নকশিকাঁথা, যেখানে প্রতিটি সুতোর নিজস্ব গল্প আছে। সেই গল্পের স্বাদ তাড়াহুড়ো করে নেওয়া যায় না।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে ‘দ্রুততা’ই কাম্য। ফাস্ট ফুড, ফাস্ট ইন্টারনেট, ফাস্ট রিপ্লাই, ফাস্ট গ্রসারি ডেলিভারি এমনকি ফাস্ট প্রেম! কিন্তু তাড়াহুড়ো করে খাওয়া বিরিয়ানি আর মাটির উনুনে ধীর আঁচে রান্না করা মাংসের স্বাদের তফাতটা আমরা বোধহয় ভুলতে বসেছি। আমরা ভুলতে বসেছি অপেক্ষা করতে। একেই আধুনিক দর্শনে বলা হচ্ছে ‘স্লো লিভিং’।
জীবনটাকে কি কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে দেখবেন? নাকি জানলার ধারের সিটে বসে বাইরের বদলে যাওয়া দৃশ্যগুলো উপভোগ করবেন? ধীরলয়ে চলায় এক অদ্ভুত বিলাসিতা আছে। যখন আপনি ধীরেসুস্থে এক কাপ চা বানান, চায়ের লিকারের রং বদলানো দেখেন, আলসেমি করে পছন্দের গজল চালিয়ে জানলার ধারে বসে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে জানলার বাইরে বাচ্চাদের হুটোপাটি দেখেন, দেখেন ফেরিওয়ালাদের, সাইকেল নিয়ে বাজরের পথে যাওয়া পাড়ার মিশুকে বয়স্ক জেঠুকে… তখন আপনি আসলে নিজেকে সময় দেন। সময় দেন নিজের ভেতরের ক্লান্ত মানুষটাকে। যে মানুষটি রোজকার দ্রুত ধাবমানতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে ছুটতে ফেলে এসেছে নির্মল শৈশবের দিনগুলো। তাই দেরি হওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়; দেরি হওয়া মানে অনেক সময় নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার বাড়তি কিছু মুহূর্ত পাওয়া। ‘তারে জমিন পর’ সিনেমায় সেই ছোট্ট ঈশান অবস্তিকে মনে পড়ে? ‘দেরি’র ভয়ে বাঁধাধরা রুটিনে সে কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি বলেই তার শিশুমনের কল্পনার রং কখনও শুকিয়ে যায়নি। মুক্তছন্দেও যে কাব্য লেখা যায়!
প্রথাগত সমাজ আমাদের শিখিয়েছে কাজ ফেলে রাখা বা ‘Procrastination’ এক মহাপাপ। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, বিশ্বের বড় বড় আবিষ্কার আর কালজয়ী সৃষ্টির পেছনে এই ‘দেরি’ করার এক বিরাট ভূমিকা আছে। কত কিংবদন্তি শিল্পী মাসের পর মাস সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে বসে থেকেছেন, শুধু কিছু হিসেব মেলানোর তাগিদে, দুটো মনমাফিক তুলির আঁচড় কাটতে, দুটো হৃদয়স্পর্শী লাইন লিখতে। দিনের পর দিন প্রচারবিমুখ কেউ ঘরের কোণে রেয়াজে বসেছেন এক সা থেকে পরবর্তী সা পর্যন্ত যতদিন না সুরের যাত্রাপথ একেবারে মসৃণ হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার ব্যর্থতা, আর্থিক অসচ্ছলতা, পেশাগত জয়যাত্রা-পথে দেরি হওয়া- একি অহেতুক? কবিগুরু বলেছেন – ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে, এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর, জীবনভরে…’। তারা দোষ দিয়েছে অলক্ষ্যের, লোকে ভেবেছে তারা সময় নষ্ট করেছে, কিন্তু তাদের অন্তরে তখন চলেছিল এক মহাযজ্ঞের আহুতি। তাদের প্রতিভা জারিত হওয়ার অবকাশ দিয়েছিল তাদের এই ‘দেরি’। যা ভবিষ্যতে গিয়ে সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে তাদের।
মনোবিদরা বলেন, যখন আমরা কোনও কাজ ফেলে রাখি, আমাদের মস্তিষ্ক শান্ত হয় না; বরং সে ব্যাকগ্রাউন্ডে সেই সমস্যাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। একে বলা হয় ‘ইনকিউবিশন পিরিয়ড’। এই দেরির মধ্যেই জন্ম নেয় এমন কোনও চিন্তা, যা হয়তো দ্রুত কাজ শেষ করলে কখনও মাথায় আসত না। সুতরাং, আজ যদি আপনার মনের সৃজনশীল জানলাটা খুলতে দেরি হয়, তবে হতাশ হবেন না। হয়তো আগের সৃষ্টিশীল চিন্তার ওপর অপর কোনও সৃষ্টিশীল চিন্তার স্তর জন্মাতেই এই দেরি… পরবর্তীতে যা হয়ে যেতে পারে এক মাস্টারপিস।
আমাদের চারপাশের সমাজটা এক অদৃশ্য ঘড়ি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ২৫ বছরে চাকরি, ৩০-এ বিয়ে, ৩৫-এ ফ্ল্যাট- এই ছকে না পড়লেই আপনি ‘দেরি’ করে ফেলেছেন। কিন্তু সাফল্যের কি কোনও এক্সপায়ারি ডেট থাকে? ভেরা ওয়াং ফ্যাশন জগতে প্রবেশ করেছিলেন ৪০ বছর বয়সে। রে ক্রক যখন ম্যাকডোনাল্ডস শুরু করেন, তখন তার বয়স ৫২। জেকে রাউলিং হ্যারি পটার লিখে যখন জগৎ জয় করলেন, তার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন ব্যর্থ মা ও বেকার নারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথাগতভাবে ছবি আঁকা শুরু করেন (১৯২৮ সালে), তখন তাঁর বয়স ছিল ৬৭ বছর।
জীবন যাদের শুরুতে একটু বেশি স্ট্রাগল করায়, তাদের ঝুলি শেষমেশ অভিজ্ঞতায় ভরে ওঠে। দেরি করে সাফল্য পাওয়া মানুষগুলো জানে, সাফল্যের চূড়ায় ওঠার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল সঠিক পাহাড়ে ওঠা। ভুল পথে দ্রুত হাঁটার চেয়ে সঠিক পথে ধীরে চলাই তো আসল কাজ। নিজের প্যাশন খুঁজে পেতে যদি চল্লিশ বছর সময়ও লেগেও যায়, তবে সেই খুঁজে পাওয়াটা সার্থক। কারণ আপনি অন্তত অন্য কারও ছকে নিজের জীবনটা কাটিয়ে দেননি। দেরিতে হলেও সুযোগ দিয়েছেন নিজেকে, নিজের সত্তাকে।
ভালোবাসার ক্ষেত্রেও আমরা বড্ড অস্থির বোধহয় আজকাল। ‘সবাই সেটল হয়ে গেল, আমি কেন একা?’ এই হাহাকার আমাদের ভুল মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। অথচ ভেবে দেখুন, সেই বিশেষ মানুষটির সঙ্গে দেখা হতে দেরি হচ্ছে বলেই হয়তো আপনি নিজেকে আরও বেশি করে চেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
কখনো-কখনো সঠিক মানুষটি ভুল সময়ে আসে, আবার ভুল মানুষটি আসে একেবারে সঠিক সময়ে। কিন্তু জীবন যখন আপনাকে একা রাখে, তখন সে আপনাকে তৈরি করে। যাতে যখন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষটির সঙ্গে আপনার দেখা হবে, তখন আপনি তাকে দেওয়ার মতো একটা পরিণত মন নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। মূল্য দেন তার সব ছোট ছোট চেষ্টার। তখন আপনি নিজের অজান্তেই জগজিৎ সিং-এর সেই গানের লাইনগুলো গুনগুন করতে করতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরবেন- ‘দের লগি আনে মে তুমকো, শুক্র হ্যা ফিরভি আয়ে তো…’ জীবনের রিক্ত বাগানে দেরিতে আসা বসন্তের ফুলগুলো বুঝি সহজে ঝরে যায় না, সৌরভে ভুলিয়ে দেয় দীর্ঘ দহনযন্ত্রণা।
অনেকের জীবনেই আবার এমন কিছু দেরির গল্প আছে যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয় আজ। সেই অভিশপ্ত দিনগুলোতে গন্তব্যে যাওয়ার পথে তাঁরা দেরি করে ফেলেছিলেন। কারণ হতে পারে, হয়তো কারও জুতোর ফিতে ছিঁড়ে গিয়েছিল, জল শেষ হয়ে গেছিল শৌচাগারে, অথবা ইস্ত্রি করা ছিল না পছন্দ করে রাখা কুর্তিটা। কেউ হয়তো ফ্লাইট মিস করেছিলেন জ্যামের কারণেই। আর তাই বিমান দুঘর্টনা বা হাড়হিম করা নানা ঘটনাগুলিকে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন। আমরা যখন দেরি হওয়ার জন্য ট্রাফিক পুলিশকে গালাগাল দিই বা কপাল চাপড়াই, আমরা জানি না মহাজাগতিক কোনও শক্তি হয়তো আমাদের বড় কোনও বিপদ থেকে আড়াল করতে চাইছে। কে বলতে পারে? জীবন মাঝে মাঝে আমাদের থামিয়ে দেয়, কারণ সামনে হয়তো কোনও গভীর খাদ আছে তা হাঁ মুখ নিয়ে। যাতে একমুহূর্তের ব্যবধানে শেষ হয়ে যেতে পারে এ নশ্বর জীবনের যাবতীয় মায়াখেলা। এই ‘দেরি’ আসলে হয়তো তখন বিধাতার এক গোপন আশীর্বাদ।
শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা ভাবুন তো, যখন লোডশেডিং হলে আমরা বিরক্ত হতাম না, বরং মোমবাতির আলোয় ছায়ার খেলা খেলতাম। জীবন তখন ধীর ছিল, আর সেই ধীরতাতেই ছিল আনন্দ। আজ আমরা ফাইভজি গতির যুগে এসে সেই মানসিক প্রশান্তি হারিয়ে ফেলেছি।
দেরি হওয়াকে শাপ হিসেবে না দেখে, একে একখণ্ড অবসর হিসেবে দেখা উচিত। বাস আসতে দেরি হচ্ছে? পাশের মানুষটার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। ইন্টারভিউতে সুযোগ মেলেনি? হয়তো আপনার জন্য আরও বড় কোনও মঞ্চ অপেক্ষা করছে।
জীবনটা কোনও প্রতিযোগিতার ট্র্যাক নয় যে ফিনিশ লাইনে প্রথম পৌঁছালেই ট্রফি মিলবে। এখানে প্রতিটি মোড়, প্রতিটি দেরি আর প্রতিটি থমকে যাওয়া আসলে এক একটি নতুন গল্প। তাই পরের বার যখন কাজে দেরি হবে বা জীবনে পিছিয়ে পড়েছি বলে মনে হবে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসাটাই দারুণ কাজে দেবে। মনে রাখতে হবে, নদীর স্রোতও কিন্তু পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকে যায় বলেই এত সুন্দর জলপ্রপাতের জন্ম দেয়। দেরি হোক, ক্ষতি নেই- যাত্রাটা যেন মনের মতো সুন্দর হয়। তবেই জীবন সার্থক।



