ভোটের হাওয়ায় লাগল নাচন

শেষ আপডেট:

ব্যালট বাক্সে উৎসবের কোলাজ 

শৌভিক রায় 

চা বাগানের সবুজ চিরে চলে যাওয়া পরিচিত পথটি চিনতে পারিনি সেদিন। দু’ধারে নানা রঙের পতাকা আর রংবেরঙের কাগজের শিকল নিয়ে ছায়া ঢাকা শান্ত সে রাস্তা একদম বদলে গিয়েছিল। বিভিন্ন বর্ণের, ধর্মের মানুষ দলে দলে হাঁটছিলেন সেই পথে।

বাগানের প্রান্তে বিরাট মাঠ। সে মাঠে সপ্তাহে একদিন হাট বসলেও, সেদিন অন্য ব্যাপার। ভোট প্রচারে শহর থেকে নেতা আসবেন। সমাবেশ করবেন। ফলে ছোটখাটো উৎসব। সারাবছর ধরে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলা হাত ঝড় তুলছিল ধামসা-মাদলে। মংলু আর শনিচরা ত্রিপল টানিয়ে, টেবিল বিছিয়ে পান-বিড়ির দোকান দিয়ে বসে গিয়েছিল মাঠের একদিকে। মওকা বুঝে গঞ্জের রামাধীন বাদামওয়ালাও হাজির। তবে ওই গরমে ভিড় ছিল বেশি কুলফিওয়ালার সামনে।

কিশোর বয়সে দেখা সেই ছবি আজও ভুলিনি। ভোট এলেই তখন চা বাগানগুলো অচেনা হয়ে উঠত। যেখানে সারাবছর দারিদ্র্য আর নিষ্পেষণ নিত্য সঙ্গী, সেই চা বাগান সেজে উঠত উৎসবের আমেজে। তবে শুধু চা বাগান নয়। ভোট উৎসবে মহানগর থেকে গ্রাম ছবিটা ছিল একই। গমগমে মাইক, উত্তাল মিছিল, রাস্তার মোড়ে মোড়ে জনসমাবেশ, দেওয়াল লিখন, রোড শো, নেতাদের ঘনঘন আগমন সবকিছু মিলে প্রতিটি জনপদ বদলে যেত।

মনে আছে এই উৎসবের আবহাওয়াতেই প্রথম পথনাটক দেখেছিলাম। এভাবে যে রাস্তাতেও নাটক করা যায়, সেটা শিখিয়েছিল ভোট। পাশাপাশি মনে পড়ছে গানের কথা। কত ধরনের গান যে শোনা যেত ভোট এলে! আর সেসব গান গাইতেন জাঁদরেল সব মানুষরা। গ্রামবাংলায় সেই সময় চলত কবির লড়াই। নাটক, গান বা কবিতার বিষয়বস্তু মূলত ভোট হলেও, খুব সূক্ষ্মভাবে দেশ গঠনের একটা বার্তাও থাকত। আসলে বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ আগে স্বাধীনতার খানিকটা রেশ রয়ে গিয়েছিল সবার মনে। বাপঠাকুরদার মুখে শুনে পরাধীন ভারতকে উপলব্ধি করতে পারতেন সবাই। ভোট মানে যে গঠন ও উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, কমবেশি বুঝেছিলেন সকলেই। প্রচারে নেমে সব রাজনৈতিক দলও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই সে সময় ভোটের চেহারা ছিল আলাদা। জোর দেওয়া হত বাড়ি বাড়ি সংযোগ, মিটিং, মিছিল ইত্যাদির ওপর। টেলিফোনে, খবরের কাগজে বিরাট বিজ্ঞাপনে, টিভির বিতর্কেও যে ভোট প্রচার করা যায়, সেটা কেউই ভাবেননি।

অন্যান্য বহু বিষয়ের মতো আজকাল ভোটেও কর্পোরেট সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। বড় বড় ফ্লেক্স, কাটআউট, সুসজ্জিত গাড়ি, গাড়ির ওপর থেকে দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের ওপর পুষ্পবৃষ্টি, নৃত্যরত পুরুষ-মহিলা ইত্যাদি আজকাল ভীষণ চোখধাঁধানো। অতীতের সেই ম্যাড়মেড়ে মিছিল আর বস্তাপচা স্লোগান কবে যে এরকম ঝলমলে হয়ে গেল, কে জানে! ভোটের মিটিংয়ে, মঞ্চসজ্জাতেও ব্যাপক পরিবর্তন। খুঁটি পুঁতে যেভাবে আজকাল মঞ্চ ও শ্রোতাদের বসার জায়গা তৈরি করা হয়, সেটি তো রীতিমতো দর্শনীয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ড্রোন ক্যামেরার গৌরবময় উপস্থিতি। রক ব্যান্ডের অনুষ্ঠানের মতো পোডিয়ামে এগিয়ে পিছিয়ে নেতা-কর্মীদের জনসংযোগেও নতুনত্বের ছাপ। সত্যি বলতে, ভোটের সঙ্গে বড় বড় উৎসবের সেভাবে আর কোনও পার্থক্য নেই।

কখনো-কখনো মনে হয়, উৎসবের এই আবহ গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করে তুললেও, যুক্তিবোধকে কি খানিকটা আড়াল করে রাখে না? ‘রুটি-কাপড় আর বাসস্থান’-এর প্রাথমিক চাহিদা ভুলে, মানুষ কি এই জৌলুসে ভেসে যায় না? আচ্ছন্ন হয়ে থাকে না কি তাঁর নিজস্ব বোধ ও চিন্তা? এই ব্যাপারে বোধহয় গ্রাম আর শহরের কোনও পার্থক্য নেই। বহু মানুষই এই চাকচিক্যে এতটাই প্রভাবিত হন যে, ভোট প্রদানের সময় নিজের ভালোমন্দ বুঝতে পারেন না। ফলে, ভোটবাক্সে তার প্রভাব দেখা যায়। বাজিমাত করে যান তাঁরা, যাঁদের গিমিক বেশি। ভোটের এই হাওয়া ছুঁয়ে যায় প্রায় সবাইকেই। আলাদা করে এখানে পার্থক্য করা যায় না কোনও ভোটারকেই। ভাবনার নিজস্ব জগতে সকলেই বোধহয় পরিযায়ী হয়ে যান তখন।

কিছু ক্ষেত্রে অতীতের মতো, ভোট আজও অনেকের বাড়তি উপার্জনের মাধ্যম। মাত্র কয়েকদিন আগে কথা বলছিলাম খালেদ মিয়াঁর সঙ্গে। এক রাজনৈতিক দলের প্রচার সভার মঞ্চ তৈরি করছিলেন তিনি। নির্দ্বিধায় বললেন, ‘ভোট এলে প্রচুর কাজ পাই। আমাদের ভালোই হয়।’ হুবহু একই কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর প্রচার সভায়, নিজের সাবেক ব্যবসা ছেড়ে, দু’দিনের জন্য ফল বিক্রেতা বনে যাওয়া তরুণটি। তাঁর সংযোজন, পুজোর সময়ও এরকমই দোকান দিই পাড়ার প্যান্ডেলের কাছে। পার্থক্য কিছু নেই। ওটা দেবী পুজো, এটা ভোট পুজো।’

তবে পরিবর্তনও এসেছে বহু। আজকাল ভোটকেন্দ্রের কাছে মেলা বসে যাওয়া ব্যাপারটি আর নেই বললেই চলে। সকাল-বিকেল চায়ের আড্ডায় সেভাবে ঝড় তুলে দেওয়া আলোচনাও প্রায় বন্ধ। দেওয়াল লিখনে উধাও হয়ে গিয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত স্লোগান, তীক্ষ্ণ শ্লেষ আর ব্যঙ্গ। দেওয়াল লিখতেন এমন এক শিল্পী দুঃখ করলেন, ‘আজকাল আমরা ব্রাত্য। কেউই আর ডাকে না।’ খুব ছোট দল ছাড়া, রিকশায় মাইক রেখে স্লোগান দেওয়া মানুষগুলি উধাও হয়ে গিয়েছেন কবে! মিলিয়ে গিয়েছে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হ্যান্ডবিলও।

এত পরিবর্তন সত্ত্বেও, পরিযায়ী শ্রমিক, খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষদের কাছে ভোট কিন্তু আজও বড় ব্যাপার। আসলে এই সময়েই তাঁরা তাঁদের মনুষ্যত্ব ফিরে পান। সারাবছরের অবজ্ঞা আর বঞ্চনার জাঁতাকল থেকে সাময়িক মুক্ত হন। টিভির পর্দায় বা দূর মঞ্চে দেখা বিখ্যাত মানুষজন কাঁধে হাত রাখেন। কাছে টানেন। পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো কথা বলেন। কেউ কেউ তো একধাপ এগিয়ে প্রণাম পর্যন্ত করে ফেলেন। আবার বাড়ির হেঁশেলে ঢুকে রান্নায় সাহায্য করতে, ভোটারের চুলদাড়ি কেটে দিতেও পিছপা হন না অনেকে। ভোটপ্রার্থীদের এরকম কাণ্ডকারখানা অনেক সময় হাসির সৃষ্টি করলেও, বেশ চমকপ্রদ। সেরকমই মজা লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিও আসে টিভির টক শো বা বিতর্ক সভায় বক্তাদের সমস্বরে চিৎকারে।

প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলি এখন যত উৎসবের আবহ তৈরি করুক না কেন, মানুষের মনে ক্রমশ জেগে উঠছে নানা প্রশ্ন। এটিই বোধহয় আধুনিক ভোটের সবচেয়ে বড় চিত্র। আগে, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা সেভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেন না। তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের খানিকটা যেন দূরত্ব ছিল। তবুও  বিপদে-আপদে তাঁদের কাছে আশ্রয় খুঁজতেন নিরাশ্রয় মানুষ। কিন্তু সেই পরিবেশ আর নেই। এখন মানুষ প্রশ্ন করছেন। কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিতে চাইছেন তাঁর প্রদত্ত ভোটের হিসেবে। পার্থক্য আজ এখানেই। এটা হওয়াও উচিত। কেননা উৎসব মানে অগ্রগতির জয়যাত্রা। আর সেটি তখনই সম্ভব, যখন প্রত্যেকের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে বৌদ্ধিক বিকাশও ঘটবে। ভোট উৎসব তাই সাধারণ নয়, তার তাৎপর্য সবসময় আলাদা।

কিন্তু বর্তমান প্রজন্মকে ভোটের হাওয়া ঠিক কতটা আন্দোলিত করতে পারছে? এখনও অবধি যে চিত্র দেখছি, তা কিন্তু আশাপ্রদ নয়। আসলে তাঁদের সামনে না আছে অনুসরণ করার মতো নেতা, না রয়েছে অনুকরণ করার মতো কাজ। প্রচণ্ড আগ্রাসী এক সর্বক্ষয়ী অবক্ষয়ে আজ ক্রমশ ভাঙন সর্বত্র। তার বিপুল প্রভাব পড়ছে এই প্রজন্মের ওপর। ভোট সম্পর্কেই উদাসীন হয়ে উঠছেন তাঁরা। ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এটি কিন্তু অশুভ সংকেত। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন আজ এমন জায়গায় যে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অধিকাংশই। আর সেই শূন্যস্থানে ঢুকে পড়ছে কিছু ধান্দাবাজ দুশ্চরিত্র। তারা উৎসব বোঝে না, গণতন্ত্র তো অনেক দূরে।

ভোটের হাওয়ার এই নাচনে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যে উৎসবকে একদিন প্রাণে ধরে একটি রাষ্ট্র গুটিগুটি পায়ে চলতে শুরু করেছিল, তার চেহারায় বহু পরিবর্তন এলেও, কখনও ভাবা যায়নি এরকম এক সংকটময় সময় আসতে পারে। মিথ্যাচার, মারামারি, হানাহানি, রক্তক্ষয়, কদর্য ভাষা ইত্যাদি সবকিছু গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবকে আজ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তার জন্য দায়ী নিজেরাই। অথচ এই উৎসবের হাত ধরেই আমরা সারা বিশ্বের কুর্নিশ আদায় করতে পারতাম অনায়াসে।

দেদার মেগাবাইটের দুনিয়ায় রঙিন ভোটরঙ্গ

অন্বেষা বসু রায় চৌধুরী

লাল নীল সবুজেরই মেলা বসেছে / লাল নীল সবুজেরই মেলা রে / আয় আয় আয় রে ছুটে / খেলবি যদি আয় / নতুন সে এক খেলা রে। মান্না দে-র সেই চিরসবুজ কণ্ঠ আর গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলম থেকে বেরিয়ে আসা এই গানটি শোনেনি বা চেনে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। বাঙালির শৈশব থেকে বার্ধক্য- সব ঋতুতেই এই গানটি এক অদ্ভুত আশাবাদ জাগিয়ে তোলে। সম্প্রতি গানটি আবার শুনতে শুনতে হঠাৎ মনে হল, গানের কথাগুলো যেন আজকের এই ডিজিটাল বাংলার প্রেক্ষাপটে ২০২৬-এর আসন্ন ‘ভোট-রঙ্গ’ নিয়েই লেখা হয়েছিল। যদিও গৌরীপ্রসন্নবাবু যখন এটি লিখেছিলেন, তখন তাঁর মানসপটে ছিল বাংলার মেঠো পথের সেই চেনা ধুলো ওড়া মেলার ছবি, নাগরদোলা আর মাটির পুতুলের গন্ধ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে সেই মেলার চেয়েও এক বিশাল মেলা ইদানীং জাঁকিয়ে বসেছে আমাদের হাতের তালুতে ধরা থাকা পাঁচ ইঞ্চির স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। নাম তার-  ‘ভোটের মেলা’। আর সেই মেলায় লাল, নীল, সবুজ বা গেরুয়া- সব রংয়ের রাজনৈতিক সওদাগরেরাই বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে নতুন নতুন মরণখেলার পসরা সাজিয়ে বসেছেন।

আসলে বাংলার রাজনীতিতে এখন আর বৈশাখের সেই চিরাচরিত দাবদাহের দাপট অতটা চোখে পড়ে না, যতটা দাপট দেখাচ্ছে স্মার্টফোনের ৫জি স্পিড। একসময়কার চুনসুরকি আর চটচটে আলকাতরার দেওয়াল লিখন এখন বাঙালির কাছে স্রেফ নস্টালজিয়া। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ফেসবুকের অন্তহীন স্ক্রল আর প্রতি মুহূর্তে হোয়াটসঅ্যাপের ‘টুংটাং’ নোটিফিকেশন। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ভোট যেন এক আজব ডিজিটাল কার্নিভাল। যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই পর্দার আড়ালে একেকজন দুঁদে চিত্র পরিচালক হিসেবে কাজ করছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজের দীর্ঘ সম্পাদকীয় পড়ার চেয়েও বাঙালির কাছে আজ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে- জনসভায় দাঁড়িয়ে আজ কোন নেতা নতুন কোনও ‘তত্ত্ব’ আওড়ালেন। নেতাদের মুখ ফসকে বেরোনো একেকটা কথা বা ভুল উচ্চারণ এখন মিমারদের কাছে ঠিক যেন ‘আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ’। সেই সংগৃহীত কথাগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে জনপ্রিয় কোনও সিনেমার গানের সুরে এমনভাবে ‘রিমিক্স’ করা হয় যে, সাধারণ মানুষ রাজ্যের গম্ভীর সমস্যাগুলো বেমালুম ভুলে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে স্রেফ হেসে কুপোকাত হন। ধরুন, কোনও এক নেতা হয়তো আবেগের বশে বলে ফেললেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে প্রতিটি বাড়ির ছাদে একটা করে ছোট ছোট হেলিপ্যাড বানিয়ে দেব!’ ব্যাস, আর যায় কোথায়! পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই ভিডিওর নীচে রিদমিক মিউজিক বাজতে শুরু করল এবং শুরু হল লাইক আর ভিউসের প্লাবন। এই যে হাসির খোরাক, এটাই এখন জনমত গঠনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ভোট মানে এখন আর সিরিয়াস আলোচনা নয়, বরং ভোট মানে এখন এক দারুণ ‘ভাইরাল’ জোকস।

এই তো ক’দিন আগের কথা। অফিস থেকে ফেরার পথে এক পরিচিত চায়ের দোকানে ঢুকেছি ক্লান্তি মেটাতে। দেখলাম, সেখানে এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর মুখে এক নেতার উন্নয়নের ভাষণ শুনছিলেন। পাশের টেবিলে বসা সম্ভবত এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে তার স্মার্টফোনটা ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফিশফিশ করে বলল, ‘জেঠু, একটু এটা দেখুন তো’। ফোনের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে সেই নেতারই ভিডিও, কিন্তু সেটাকে বেশ মুখরোচকভাবে এডিট করা হয়েছে। ভিডিওর প্রথম অংশে নেতা তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন, ‘রাস্তাগুলো একদম মাখনের মতো মসৃণ করে দেব’- আর ঠিক তার পরের দৃশ্যেই মিমার নিপুণ দক্ষতায় জুড়ে দিয়েছে একটি জনপ্রিয় কমেডি সিনেমার ক্লিপ, যেখানে ছবির নায়ক গর্তে ভরা রাস্তায় নাচতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে আছাড় খাচ্ছে। সেই গম্ভীর ভদ্রলোক ভিডিওটি দেখতে দেখতে কখন যে মুচকি হেসে ফেলেছেন, তা বোধহয় তিনি নিজেও টের পাননি। আর এভাবেই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে একটি ১৫ সেকেন্ডের মিম অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ওই কলেজ পড়ুয়া ছেলেটার মতো হাজার হাজার যুবক এখন মিম শেয়ার করেই জনমত গঠন করছে। সেখানে প্রকৃত উন্নয়ন বা রাজনৈতিক নীতি বড় কথা নয়, বরং ‘কে, কাকে, কত বড় জোকস-এ পরিণত করতে পারল’- সেটাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভোটের আসল মাপকাঠি। দিনের শেষে ওই ভদ্রলোকটির মতো লক্ষ লক্ষ ভোটার যখন বুথে যাচ্ছেন, তাঁদের মগজের এককোণে ওই হাসির মিমটাই থেকে যাচ্ছে। যা অজান্তেই ব্যালট বা ইভিএমে তাঁদের আঙুলের অভিমুখ বদলে দিচ্ছে। এটাই ডিজিটাল বাংলার ‘নতুন নাচ’। যা অবশ্যই সচেতন মনে এই প্রশ্ন জাগায় যে, আদতে আমরা সত্যিই কি নিজেদের স্বাধীন মগজ খাটিয়ে ভোটটা দিচ্ছি? নাকি আমাদের স্মার্টফোনের পর্দার অদৃশ্য ‘অ্যালগরিদম’ আগেভাগেই ঠিক করে দিচ্ছে আমাদের কোন বোতামটা টিপতে হবে?

আবার এই রঙিন ডিজিটাল নাচের আড়ালে খুব সন্তর্পণে ওঁত পেতে আছে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়ো খবরের এক বিষাক্ত মাকড়সার জাল। স্যাটায়ার বা বিদ্রুপ যেখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়, সেখানে তথ্যের বিকৃতি বা এআই-এর কারসাজিতে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিও এখন সাধারণ ভোটারদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে। হোয়াটসঅ্যাপের ‘গ্রুপ’গুলোতে এখন এমন সব অডিও এবং ভিডিও ঘুরপাক খাচ্ছে যে, কোনটি আসল আর কোনটি নিছক এডিটিংয়ের কারসাজি, তা বোঝা খোদ ব্যোমকেশ বক্সীর পক্ষেও বোধহয় কঠিন হত। কোনও এক নেতার পাঁচ বছর আগের ঘরোয়া আড্ডার ভিডিওকে এখনকার ‘গোপন আঁতাত’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্দ্বিধায়। কখনও আবার বিরোধী দলের মিছিলে অন্য রাজ্যের কোনও পুরোনো অশান্তির ক্লিপ জুড়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো হচ্ছে। কে ক্ষমতায় এলে রাজ্যে মাছ খাওয়া বন্ধ হবে, আর কে আবার বেছে বেছে ঘরে ঘরে মাছ পৌঁছে দেবেন-  এই নিয়ে চলছে অবিরাম কাদা ছোড়াছুড়ি। তথ্যের এই গোলকধাঁধায় সাধারণ পশ্চিমবঙ্গবাসী এখন সম্পূর্ণ খেই হারিয়ে ফেলছেন। চায়ের দোকানে এখন আর জেলা বা ব্লকের উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা হয় না, বরং পাড়ায় পাড়ায় তর্ক চলে- ‘ওরে ভাই, ওই ভিডিওটা কি এডিট করা, নাকি সত্যি উনি ওমন কথা বলেছেন?’ স্যাটায়ার আমাদের হাসাতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু সেই সুযোগে তৈরি হচ্ছে এমন সব ফেক নিউজ, যা আমাদের মধ্যে বিভেদের দেওয়াল গড়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আধুনিক বাংলার ভোটের বাজারে স্যাটায়ার আর ফেক নিউজের সীমারেখাটা এতটাই পাতলা হয়ে গিয়েছে যে, আমরা ভাবছি আমরা স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছি, কিন্তু আসলে আমরা ফোনের স্ক্রিনের সেই নাচের পুতুল হয়ে উঠছি, যা পর্দার ওপার থেকে আমাদের দেখানো হচ্ছে।

আর আজকের এই ‘কনটেন্ট’ নির্ভর যুগে যুবসমাজের কাছে ভোট দেওয়াটা নাগরিক কর্তব্যের চেয়েও বড় একটি ‘ইনফ্লুয়েন্সার ইভেন্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের হাতে এবারই প্রথম ভোটের কালি লাগবে, তাদের কাছে বুথের সামনে আঙুল উঁচিয়ে একটি ট্রেন্ডি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ‘স্লো মোশন রিল’ না বানালে যেন গণতান্ত্রিক অধিকারটাই অপূর্ণ থেকে যায়। আদর্শের লড়াই বা নীতির তর্কের চেয়েও এখন বড় লড়াই হল কার ডিজিটাল সেল কত বেশি উন্নতমানের ড্রোন শট ব্যবহার করল, কিংবা কার বানানো প্রচার ভিডিও কত দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ট্রেন্ডিং’ হল। ভোট এখন আর শুধুই ব্যালট বক্সের গোপন লড়াই নেই, এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক রঙিন মঞ্চ। তবে এই রঙিন চাকচিক্যের আড়ালে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধানটা আজও হিমালয় সমান। ডিজিটাল পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্মের আসল প্রত্যাশা থাকে কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থা আর এক আধুনিক বাংলার। তারা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ বা ‘উন্নত বাংলা’র যে ঝকঝকে ছবি দেখে অভ্যস্ত, বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই প্রাপ্তি অনেক সময় বড় ফিকে হয়ে যায়। একদিকে অ্যালগরিদমের তৈরি করা মায়াবী প্রচারের মেলা, আর অন্যদিকে চাকরির অভাবে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার কঠিন বাস্তবতা-  এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলার যুবসমাজ এক অদ্ভুত দোলাচলে বিদ্ধ। মেগাবাইটের এই মচ্ছব যখন শেষ হয়, তখন দেখা যায় প্রত্যাশার পাহাড় টপকে প্রাপ্তির ভাঁড়ারটা আসলে অনেকটা সেই ‘এক্সট্রা ১জিবি ফ্রি ডেটা প্যাক’-এর মতোই অতি ক্ষণস্থায়ী।

আসলে বাংলার এই ডিজিটাল ‘ভোট-রঙ্গ’ একুশ শতকের এক আধুনিক ট্র্যাজিক-কমেডি। যেখানে নেতাদের গম্ভীর রাজনৈতিক ভাষণ এখন ইউটিউবের কমেডি শর্টস-এর সস্তা রসদ জোগায়। রাজনৈতিক দলগুলো এখন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে কোনও প্রখ্যাত মিমারকে নিজেদের ডিজিটাল সেলে টানতে। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে, দশটা বিশাল জনসভায় যত মানুষ না আসে, একটা মিম ঠিকঠাক ‘হিট’ হলে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের নিউজ ফিডে পৌঁছানো যায়। ভোট এখন আর কেবল ভোটার কার্ডের নেই, ভোট এখন আঙুলের ডগার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের। কোনও এক বিশেষ দলের ‘চাণক্য’ হয়তো এসিতে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখছেন যে, কোন অঞ্চলের মানুষের কাছে কোন গানটা বেশি জনপ্রিয়, আর সেই অনুযায়ী নিখুঁতভাবে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল প্রচারের মরণফাঁদ। অর্থাৎ, ডিজিটাল অ্যালগরিদমই পরোক্ষভাবে ঠিক করে দিচ্ছে আমাদের পছন্দের নেতাকে। পশ্চিমবঙ্গের ভোট এখন এক আজব ‘ডিজিটাল যাত্রা’। এখানে নীতি বা আদর্শের চেয়ে মেগাবাইটের ‘রিচ’ বেশি কথা বলে। মেঠো পথ থেকে মেগাসিটি সর্বত্র এখন এক অদ্ভুত ‘কনটেন্ট’ যুদ্ধ। ভোটাররা এখন বুঝছেন যে, নেতার হাতের ইশারার চেয়েও ফোনের একটা ‘লাইক’ বা ‘শেয়ার’ বাটনের ক্ষমতা অনেক বেশি। তবে মনে রাখা জরুরি যে, স্মার্টফোনের ব্যাটারি শেষ হলে পাওয়ার ব্যাংকে চার্জ দেওয়া যায়, কিন্তু ভুল তথ্যের ফাঁদে পা দিয়ে ইভিএম-এ ভুল বোতাম টিপে ফেললে আগামী পাঁচ বছর সেই ভুলের কিন্তু কোনও ‘রিচার্জ’ হবে না। ডিজিটাল বাংলার এই ভোট বিলাসে হাসুন, মিম শেয়ার করুন, বিনোদিত হন- কিন্তু দিনের শেষে কোনটা ‘রিল’ আর কোনটা ‘রিয়েল’, সেটা চিনতে ভুল করলে চরম বিপদ। আর বাংলার মানুষের এই যে প্রখর ডিজিটাল সচেতনতা আর বিদ্রুপের ক্ষমতা, তা যেন কেবল সাময়িক বিনোদনে আটকে না থাকে, তা যেন হয়ে ওঠে সঠিক সত্যকে চিনে নেওয়ার হাতিয়ার। কারণ মেলা বা উৎসবের আলো নিভে গেলে দিনের শেষে সেই প্যান্ডেলটা কিন্তু আমাদেরই সরাতে হয়, আর নেতারা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন অন্য কোনও ডিজিটাল খেলায় নতুন কোনও সওদাগরি নাচ দেখাতে।

অনুপমার তখন… এখন…

উমাদাস ভট্টাচার্য

 —-দুধ তো এবার উথলাবে দিদি

জয়ন্তীর মায়ের চ্যাঁচানিতে অনুপমা দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাসের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে নব বন্ধ করতে করতে বলেন

—-তা তুমি মহারানি একটু উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধ করতে পারছ না? আরেকটু হলেই তো দুধ উপচে বার্নারের মুখ জ্যাম হয়ে আমার হাড়মাস কালি হত…

—-আমি কী করব… আমার সারা হাতে আদাবাটা…

—-তোমাদের কারও কিছু উপায় নেই। আমার‌ই যত জ্বালা…

অনুপমা গজগজ করতে করতে চায়ের জল বসান।

—-একজন একজন করে আসবেন আর আমি আছি দাসীবাঁদি…

রাগ হত অনুপমার। আবার এও জানতেন কয়েকটা দিন। তারপর এমনিতেই এসব বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ির লোক পাশের বাড়ির লোক বাজার যাওয়ার পথে ফেরার পথে একটু উঁচু গলা একটু নীচু গলা। অনুপমা বিরক্ত হতেন। ভালোও কি লাগেনি কখনো-কখনো? একঘর লোকের মাঝখানে চায়ের কাপ ভর্তি কাঁসার থালাটা নামিয়ে রাখার সময় হঠাৎ কেউ যখন সাক্ষী মেনে উঠত অনুপমাকে? হয়তো ভুলেই জিজ্ঞেস করে উঠত

—-বলো বৌদি… তুমিই বলো…এদের কি আর সহ্য করা যায়?

অনেক কিছু। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করত অনুপমার। হয়তো একটা মিছিল গমগম করতে করতে চলে যেত সেই সময়ে বাড়ির পাশের গলিটা দিয়ে। বাড়ির মধ্যে অসমবয়সি পুরুষ নারীর গোলটেবিল একটু থমকে যেত সেই সময়। যার যার মিছিল তার তার চোখ কিংবা ঠোঁটে কি একটু উচ্ছ্বাস খেলে যেত? গমগম করতে করতে মিছিলটা আসলে ঢুকে পড়ত ঘরের ভেতরেই। অনুপমার তো তাই মনে হত। বাড়িতে লোকজন থাকলে তবেই তো পক্ষে-বিপক্ষে হয়। শুধু জয়ন্তীর মায়ের তাপ-উত্তাপ ছিল না। সকালে পাড়ায় একবার কাজে ঢুকে পড়লে যখন সব বাড়ি সেরে মেয়ের জন্য সব খাবার একসঙ্গে একটাই এনামেলের গামলায় সাদা কাপড়ে মুড়ে বাড়ির পথ ধরত ততক্ষণে ভোটের বাজার ঝাপসা হয়ে আসত।

—-তোমার কি মনে হয় এরা সব ধোয়া তুলসীপাতা? ভোট হলেও তোমার খোঁজ নেবে?

অনুপমা ছেলের কথা কান খাড়া করে শুনতেন। তিনি জানতেন এরপরই ছেলে আর ছেলের বাবার স্বর উচ্চগ্রামে উঠতে থাকবে আর অবধারিতভাবে ছেলের বাবা বলে বসবে

—-এসব বোঝার বয়স তোমার এখনও হয়নি…

ব্যাস… সদ্য ভোটাধিকার প্রাপ্ত নবীনের দপদপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় পাড়ি। অনুপমা পরে ভাবতেন এভাবেই কি বিরুদ্ধ মতের লড়াইয়ের নেট প্র্যাকটিসের সুচনা হয়? আর তা শুরু হয় বাড়িতেই? কতকিছু পালটে পালটে যায়। বাইরের যা কিছু পরিবর্তন কখন যে ঘরে চলে আসে।

—-কি এখনও রেডি হ‌ওনি? যাও যাও যাও…

মেজো ভাই সাতসকালে ভোট দিতে চলে গেছিল। মেজো ভাই তাড়া লাগাতেই ছোটজন ফুট কাটে

—-তোর এত কীসের ঠ্যাকা?

—-আমার আবার কীসের ঠ্যাকা …রোদ উঠছে… লাইনে পড়ে যাবে…

অনুপমা আর দুই বৌ মুচকি হাসে। ওরা তো জানে মেজো ঠাকুরপো আগেরদিন রাত পর্যন্ত কোন চিহ্নটা জপিয়েছে।

—-চলো তোমাদের এগিয়ে দি…

ছোটজন ডাইনিং টেবিলে বসে চা প্যাঁদাতে প্যাঁদাতে ছোট্ট করে ছাড়ে

—-মোড়ের মাথায় তো বুথ। ওরা কি রাস্তা চেনে না…

—-চিনুক… তা বলে ভোটের দিন… বাড়ির মেয়ে বৌ যাবে…

—-শোন মেজদা তোর পার্টি পাবে তো পনেরোটা ভোট

ছোটকে থামিয়ে মেজো বলে,

—-শোন এবার আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি… ঘরে ঘরে আশ্বাস…

খিকখিক করে হাসে ছোট আর বলে

—-ও তো আমিও যদি ভোটে দাঁড়াই আর বাড়ি বাড়ি যাই তো লোকে এমন ভাব করবে যেন আমার জন্যই যুগ যুগ ধরে অপেক্ষায় ছিল…

এইসব সময়ই শ্বশুরমশাইয়ের প্রবেশ ঘটে। ঘরটা একটু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মেজো ছোট ঘর থেকে কেটে পড়ে।

—-বৌমা তোমরা এবার এগোও…

অনুপমা জানত মেজো ঠিক বুথে ঢোকার আগে দেখা দেবে।

তিরিশ বছর পর মেজো ছোট কেউ নেই। নেই মানে এক‌ই ঘরে এক‌ই উঠোনে কিংবা এক‌ই প্রাচীরে নেই। এক রান্নাঘরে এক ফ্রিজে কিংবা এক মস্ত ডাইনিংয়ের এক টিভিতে নেই। অথচ এখন অনেক বেশি লোক আছে এই বাড়িতে। আছে তবে ধাপে ধাপে ওপর নীচে। কারা কারা সব আছে সবাইকে চেনেন‌ও না অনুপমা। দু’-একটা চেনা গাছ দু’-একটা শ্যাওলা ধরা কাঁধ কোমর ধসে যাওয়া পাঁচিল আর বিশাল বিশাল বিল্ডিংয়ের ভারে পাড়াটা এখন পোয়াতির মতো শ্বাস নেয় খাঁ খাঁ দুপুর কিংবা মাঝরাতে। অনুপমা এসব‌ই এখন দেখেন নিজস্ব রুমালি বারান্দা থেকে। ভোটের সময় এখন কেউ বাজার যাওয়ার পথে অনুপমার বাড়ি ঢুকে পড়ে না। এখন এরকম হয় না। বাজার করতে যাওয়ার সময় কিংবা ব্যাগ ঝুলিয়ে ফেরার সময় কেউ কারও বাড়িতে ঢুকতে নেই। ভোটের সময় হলেও। এখন মেজো ছোট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এ বাড়ির উপর নীচে ধাপে ধাপে। মিলতে হলে ছুতো লাগে। তাও কেউ থাকে কেউ থাকে না। অনুপমা এখন টিভিতেই ভোটের কথা শোনেন। সারাদিন এক‌ই লোকজন এক‌ই পোশাকে এক‌ইরকম উত্তেজনা ছড়িয়ে যায়। রসহীন নির্লজ্জ নিলাম ডেকে যায়। মাঝেমাঝে হাতের ফোনটা বেজে উঠলে কারা কারা সব জানতে চায় ভোটের ব্যাপারে। রোবটের মতো প্রশ্ন করে যায়। অনুপমা চুপ করে থাকেন। ওপ্রান্ত একসময় নীরব হয়ে যায়। অনুপমা আজ ঘর গোছাতে থাকেন। কাল ভোট। মিনু। সারাদিন থাকে যে মেয়েটা বলে গেছে আজ আসবে না। অনুপমা বলতে গিয়েছিলেন

—-সকাল সকাল ভোটটা দিয়ে চলে আসতে পারবি না? একা একা থাকি…

—- ভোটের দিন… রাস্তাঘাটে কিছু হলে তুমি সামলাতে পারবে?

অনুপমার বহুদিন পর জয়ন্তীর মায়ের কথা মনে পড়েছিল। জয়ন্তীর মা এখন ভোট দেয়? এখন মনে হয় ওদের কথা তখন ভাবাই হয়নি। আজ বিকেলে তিন বছর পর ছেলে আসবে। ছেলের বৌ আসবে। ভোট দিতে। অনুপমা ওদের জন্য ঘর গোছাচ্ছেন না। গোছাচ্ছেন অংশুর জন্য। অংশু মানে অংশুমান। অনুপমার পাঁচ বছরের নাতি। আগেরদিন টেলিফোনে পাকাপাকা গলায় প‌ইপ‌ই করে বলে দিয়েছে

—-ঠাম্মি একা একা ভোট দিয়ে ফেলো না… আমি যাই… আমি গিয়ে বলে দেব…

অনুপমার মনে পড়তে একা একাই ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলেন। টিভির ওপর রাখা ফোটোস্ট্যান্ডে রাখা ছেলে বৌ আর নাতির একসঙ্গে তোলা ছবিটা একহাতে তুলে চোখের কাছে নিয়ে আসেন। ঘন হয়ে দেখতে থাকেন নাতির হাসিমুখ। দেখতে থাকেন। দেখতেই থাকেন। ফিশফিশ করে বলতে থাকেন

—-আমার ভোট তোওওওর দিকে…

আর অন্য হাতে না তাকিয়েই চিৎকার করতে থাকা টিভিটা বন্ধ করে দেন।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...