ঘুমহীনতা : মধ্যরাতের কড়চা
দেবদত্তা বিশ্বাস
‘ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত…’ খোলা জানলার ফুরফুরে হাওয়ায় নিঝুম রাতে এমন মায়াবী চাঁদের কল্পনায় বিভোর হন ক’বাবু। সচেতনতার স্তরে নিদ্রার প্রলেপ মাখিয়ে দু’চোখের পাতা যখন ভারী হয়ে এল ধীরে ধীরে আর রাতপরিরা নেমে এল বিছানার চারপাশে ঠিক তখনই ট্যাঁ ট্যাঁ করে মোবাইলের অ্যালার্মটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল তাঁর। সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে মেলাটোনিন নিঃসরণের দফারফা করে ক’বাবুর মনে পড়ল আর এক ঘণ্টার মধ্যেই প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরতে হবে তাঁকে। সারারাত ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকার পর ভোররাতে মাধবী রাতের কল্পনায় যখন তিনি চোখ বুজেছিলেন তখন দু’একটা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল বাইরে।
শুধু ক’বাবুই নন এমন ইনসোমনিয়াক ব্যক্তি আমাদের চারপাশে অসংখ্য যাদের কাছে আজকাল ঘুমহীনতা হল সেই অভিমানী প্রেমিকা যাঁর জন্য হাপিত্যেশ করা প্রেমিক গাইতেই পারেন ‘…তারে ধরি ধরি মনে করি ধরতে গেলে ধরা দেয় না।’ এই ডিজিটাইজেশনের যুগে বলা যায় আমাদের বর্তমান চিন্তার বিষয় দুটি। এক বাজারে খুচরোর অভাব। ছোট নোটগুলো যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আর দ্বিতীয়ত গভীর রাতে ছোটবেলায় শেখা ব্যাক কাউন্টিং আউড়ে অথবা চলন্ত সিলিং ফ্যানের দিকে রোজ তাকিয়ে থাকার টোটকা প্রয়োগ করেও চোখের পাতা পলকহীন। প্রথম সমস্যার সমাধান যদি বা অ্যাপ্লিকেশন করতে পারে কিন্তু দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান জটিল।
খ’বাবুর আবার অ্যাস্ট্রোলজি থেকে ডাক্তারি যে কোনও সমস্যার সমাধানে বিশ্বস্ত ও ভরসাযোগ্য প্রতিষ্ঠান মুঠোফোনের অ্যাপ্লিকেশন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রয়োগে অ্যাপ্লিকেশনগুলো যখন আল্ট্রা প্রো ম্যাক্স লেভেলে নিজেদের সাজিয়ে নিচ্ছে এমন সময় রাতে ঘুম না আসা খ’বাবু একদিন পছন্দের অ্যাপকে মনের কথাটি বললেন খুলে। মেয়েলি সুরেলা কণ্ঠ তাকে উপদেশ দিল ‘ঘুম একটি অতি প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। চোখ বন্ধ করুন এবং মন স্থির করুন।’ খ’বাবু এবার মন স্থির করার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। সুরেলা কণ্ঠ বলে ‘অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করবেন না। মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আমি কী আর কোনওভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ খ’বাবু প্রশ্ন করেন সুরেলা কণ্ঠ উত্তর দেয়। তারপর যখন দিনের আলো একটু ফুটতে শুরু করেছে খ’বাবু বুঝতে পারেন প্রশ্ন–উত্তর পর্বে কেটে গেল সারারাত। ঘুম ও ঘুমহীনতা বিষয়ে তিনি যথেষ্ট জ্ঞানলাভ করেছেন অথচ তাঁর নিজের ঘুমটি ফুড়ুত করে উড়ে গেছে ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে।
আজকাল ঘুমহীনতা অনেকটা নৈশ অভিযানের মতো। পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে বহু পথ অতিক্রমের পর কোনও মরুভূমি সামনে পড়লে আপনি হেঁটে যান একটু জলের আশায়। তারপর মরীচিকাকে জল ভেবে ছুটে গেলে জলটাও পান করা হয় না আবার কপাল খারাপ থাকলে হাতের চৌম্বকীয় কম্পাসটাও কাজ করে না আর। অর্থাৎ একটা ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে সারারাত বালিশ জাপটে ছটফট করলেন আপনি। ভাবলেন উত্তরমুখী শোয়ার ধরনটাই কাল হল। অতঃপর হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ সেবনে ঘুমানোর চেষ্টা করেও সকাল অব্দি তাকিয়ে থাকলেন চোখের নীচে কালি ফেলে।
একটা সময় ছিল যখন সন্ধ্যার পর ঝুপ করে রাত্রি নামত চারপাশে। ক্লান্ত বাচ্চার মুখে রাতের খাবারটুকু গুঁজে ঘুম পাড়িয়ে মায়েরা ঝিমাতেন সারাদিনের খাটনির পর। আজকাল আর তেমনটা হয় না। মাঝরাত অব্দি না জাগলে বাচ্চার হোমওয়ার্ক শেষ হয় না। মা-বাবাও জাগেন তার সঙ্গে। কর্পোরেটে চাকরি করা মানুষটি ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে আবার বসেন ল্যাপটপ খুলে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করতে হলে হেড অফিসের সময় ধরে মাঝরাতে আপনাকে জাগতে হবে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের স্বার্থে। অন্যদিকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আজকাল স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সকালে বেরিয়ে যান কর্মক্ষেত্রে। সারাদিন শেষে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে আপনি এবারে যখন মনোনিবেশ করেন গার্হস্থ্যে তখন আপনার শরীর জানান দেয় দৈনিক জৈবিক চক্রে এখন আপনার বিশ্রামের সময়। আবার আপনার ঘরে বসে চট করে মুশকিল আসানের মার্কেটিং অ্যাপগুলো কারও কারও কাছে হয়ে ওঠে এই সময় ভীষণভাবে কার্যকরী। প্রসাধনী থেকে ফার্নিচার- লম্বা ফর্দ মিলিয়ে একটা একটা করে কিনে নিতে হবে সবকিছু। অতএব গভীর রাতের গভীরতায় ব্যাঘাত ঘটে। জৈবিক ছন্দে কাটে তাল। নেমে আসে অনিবার্য ঘুমহীনতা। পাড়া জাগে ঘুমহীনতা অসুখে। মাঝরাতের অন্ধকার পাড়া আজকাল আলোয় ঘেরা। ফ্ল্যাটবাড়ির জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পিচ রাস্তায় পড়ে প্রায় সারারাত।
এই মাঝরাতের ঘুমহীনতার কড়চা মাঝে মাঝে বালিশের অবস্থান বদল, প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ঠান্ডা-গরম অনুভূতির বদলে যাওয়া থেকে শুরু হয়ে চরম আকার ধারণ করে আমাদের মধ্যে যখন জেগে ওঠে কোনও দার্শনিক। অল্প কাজে হাঁফিয়ে ওঠা মানুষটাও এই রাতেরবেলাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল তত্ত্ব মাথায় নিয়ে আইকিউ টেস্টে বড় বৈজ্ঞানিক হয়ে উঠতে পারেন তখন। পৃথিবী সৃষ্টির জটিল রহস্যের সমাধান তাকে ছাড়া চলবে কেন? ওদিকে, মন ভাঙা প্রেমিক-প্রেমিকার চোখের জলে বালিশ ভেজার এটাই সময়। নিষ্ঠুর ভালোবাসাহীন পৃথিবী তার জন্য বেদনাদায়ক। তার দুঃখবিলাসী মন ঘুমহীন চোখে জলের ধারায় ভাসছে তখন। মোবাইলে বেজে চলেছে ‘…তড়প তড়প কে ইস দিল!’ রাতেরবেলা মোবাইল ঘেঁটে পরপর রিলস দেখা কাকিমা যখন ভাবেন পরের দিন নিজেও একটা রিল বানাবেন তখন পাশে শুয়ে কাকু ঘাঁটছেন একটার পর একটা নিউজ চ্যানেল। বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় নিজের ঘুম উড়িয়ে কাকু ভাবছেন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা কথা। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে দেশের বিদেশমন্ত্রীর অবস্থান কী হতে পারে? এরপর আসে সেই ব্রাহ্মমুহূর্ত যখন রাতজাগা পাখিরা বুঝতে পারেন এবার ঘুমাতে হবে। আপনার হৃদয় গতি গভীর রাতে শিথিল হবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে বারেবারে। কারণ আপনি ঘুমহীন। অজস্র চিন্তায় অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছেন নানাভাবে। চিন্তাগুলো চেপে বসেছে মাথার অনেক গভীরে।
দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সার্কাডিয়ান ক্লকের ছন্দের পরিবর্তন হচ্ছে ক্রমাগত। ঘুম ও কাজের সময়ের স্বাভাবিক অনুপাতের তারতম্যে শুধুই যে মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে তাই নয় শারীরবৃত্তীয় নানা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত হচ্ছে অনবরত। সারাদিন ব্যস্ততা শেষে পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন থাকলেও দিন-দিন কমছে ঘুমের সময়। বস্তুত, সারাদিন ঘুম ঘুম চোখে কেটে গেলেও রাতেরবেলা একদম ঘুম আসে না চোখে। তারপর শুরু হয় আবার একটা দিনের ব্যস্ততা। এমন ঘুমহীনতার নানা গল্পের ফাঁকে গ’বাবুর ঘটনাটা দিয়েই শেষ করি না হয়! উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে গ’বাবু ঘুমহীনতায় ভুগছিলেন মধ্য ত্রিশ থেকে। সারাদিন পরিশ্রমের পর মন খুলে মোবাইল ঘাঁটলে রাতেরবেলা নেটিজেনদের সুখের সংসারের ফোটো চোখে পড়ত চল্লিশে পৌঁছেও অবিবাহিত গ’বাবুর। অ্যাস্ট্রোলজি বিয়ের সাইট ঘেঁটেও পছন্দসই মেয়ে পান না। অবশেষে পরিবারের চেষ্টায় বছর পঁচিশের সুন্দরী এক তরুণীকে মনে ধরল তাঁর। বিয়ে প্রায় পাকা। ফোন নম্বর আদানপ্রদান কমপ্লিট। গ’বাবু রাত জাগবেন হবু স্ত্রীর ফোনের অপেক্ষায়। রাত গভীর হয়। ঘুমহীনতা যাঁর নিত্যসঙ্গী তাঁর পক্ষে রাত জাগা কঠিন কিছু নয়। মাঝরাতে ফোনটা এল। ওপাশে কোকিলকণ্ঠী। আদরে আবদারে যত্নে গ’বাবু তখন ঘোরের মধ্যে। এক তীব্র সুখানুভূতি। তারপর যখন ঘোর কাটল তখন সকাল। ওপাশের ফোন কেটে গিয়েছে অনেক আগে। গ’বাবু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন সারারাত। এমন ঘুম তার অনেকদিন হয়নি। তারপর জানতে পারলেন বিয়েটা ভেস্তে গেছে। ফোনের ওপাশে তার নাক ডাকার আওয়াজটা বড্ড কর্কশ ঠেকেছে হবু স্ত্রীর। পরিবারের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তবে আজ গ’বাবু বড্ড চনমনে। দীর্ঘদিন পর ভালো ঘুম হওয়ায় কাজের ইচ্ছা দ্বিগুণ। তৃপ্ত মনে একাই সামলাচ্ছেন দশজনের কাজ। এক ফাঁকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁচাপাকা চুল দেখে মনে মনে ভাবলেন বিয়েটা নাই হোক এই বয়সে ঘুমটা খুব জরুরি। খুবই।
আর কতক্ষণ ঘুমোবি? এই তো উঠছি …
অভিষেক বোস
তারপর একদিন খেয়াল হল, মা আর বকছে না। স্ত্রীর অভিযোগও কমে এসেছে। সবাই কেমন যেন মেনে নিয়েছে, এই যে লোকটা পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে আছে, মানুষটা ঘুমকাতুরে। কেউ ওকে আর জাগানোর চেষ্টা করছে না। এর’ম একটা দুঃস্বপ্ন দেখেই মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল অনিমিখের। ঘেমে উঠেছিল ওর তালু দুটো। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছিল। পাশ ফিরে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে ডাকতে গিয়েও ভাবল। কী বলবে? ভয় লাগছে! এমনিতে ওর স্মার্টফোনের অ্যালার্ম সাউন্ডটা ভারী মিষ্টি। কিন্তু জীবন নামের অ্যালার্ম ঘড়িটার আওয়াজ মরচে ধরা টিন পেটানোর মতো। মাঝে মাঝে নিজে থেকেই বেজে ওঠে। বন্ধুর হঠাৎ সাফল্যে, স্কুলবেলার সহপাঠীর ফেসবুক পোস্টে, আয়নায় চুল আঁচড়াতে গিয়ে নিজের চোখের নীচে বিচ্ছিরি কালো দাগ দেখে।
কখনও আবার পুরোনো রিপোর্ট কার্ডের মতো কিছু দেখে মনে পড়ে যায়, যত্ন করে রাখার মতো মার্কস জোটেনি কোনওদিনও। তখন ওর মনে হয়, একটু বেশিই ঘুমিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তা-ও অনিমিখ কী করে? টুক করে স্নুজ করে দেয়।
—আরও পাঁচ মিনিট… ফুরিয়ে গেলে আবার পাঁচ।
পাঁচ মিনিটটাই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা। পাঁচ মিনিট কখনও পাঁচ মিনিটে থেমে থাকেনি। কখনো-কখনো পাঁচ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। কখনও দশ। রবিবারের সকালগুলো মনে পড়ে যায় অনিমিখের। দশক আগের শীতের রবিবার। অনিমিখ তখন লেপের ওমের নীচে হারিয়ে গিয়েছে। অচ্ছে দিনের মতো দেখা যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই দু’পাল্লার দরজার বাইরে থেকে মায়ের গলা শোনা যেত, আর কতক্ষণ ঘুমোবি?
মশারির ভেতর থেকে চোখ না খুলেই অনিমিখ বলত, এই তো উঠছি …
—এই তো উঠছি মানে? ঘড়িটা দেখেছিস?
অনিমিখ লেপের ভেতরে থেকেই মুখ লুকিয়ে বলত, সাতটা বাজেনি এখনও।
মা বিরক্ত হয়ে বলত, আর বাজবেও না আজকে।
বাংলা ভাষার যেমন অভিধান আছে, এই বঙ্গের মায়েদের ভাষারও একটা অভিধান থাকা উচিত। কোন ঘুম থেকে ওঠার কথা বলছে, বোঝা দায়। কী বাজবে না, তাও বোঝা গেল না।
মায়ের বিরক্তির পারা চড়ছে দেখে অনিমিখ জড়ানো গলায় উত্তর দিত, এই তো উঠছি।
তখনও ছেলেটা জানত না, এটাই বাংলার সবচেয়ে বড় ফিকশন।
এই তো উঠছি মানেই, এখন উঠব না। হালকা করে ভাসিয়ে দিয়ে রাখলাম ‘উঠছি’। আর কিছুক্ষণ।
অনিমিখের গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগেই।
ছোটবেলায়, ক্লাস ফাইভে বোধহয়। অ্যাডমিশন টেস্টের রেজাল্ট বেরোনোর পর। মা-বাবার পছন্দের স্কুলের লিস্টে নাম ওঠেনি। পাড়ার স্কুলেই ভর্তি করে দিয়ে এসেছিল বাবা। সেদিন রাতে রান্নাঘরের বালবের আলোটা একটু বেশিক্ষণ ধরে জ্বলছিল।
অনিমিখ আধঘুমে শুনছিল মা বলছে, একটু চেষ্টা করলে পারত না?
বাবা খুব ধীরে বলেছিল, সবাই পারে না। ওকে দিয়ে যা হবে, সেটাই করুক।
পরদিন বেশ দেরি করে উঠেছিল অনিমিখ।
মা সেইবার প্রথম বলল, আর কত ঘুমোবি রে?
অনিমিখ ভাবত, ঘুম একটা ম্যাজিকের মতো ব্যাপার। ঘুমিয়ে পড়লেই, সব সমস্যা ‘ভ্যানিশ’। যতক্ষণ না ঘুম ভাঙছে।
টাইম জাম্প।
কলেজ। সকালসকাল ক্লাস। বিছানায় শুয়ে ভাবছিল, আজ না গেলে কী হবে? তারপর নিজেই উত্তর দিল, কিছুই না। এতদিনও কিছুই হয়নি। পাশ ফিরে শুতেই মায়ের আওয়াজ কানে এল। সুরটায় আর আগের মতো ধার নেই। একই দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। অবজ্ঞা মিশে আছে খানিকটা, আর কত ঘুমোবি? কবে ভাঙবে তোর ঘুম?
এই সবকিছু রোজনামচার মতো গায়ে জড়িয়ে, পাড়ার সিগারেট দোকানের ধার আর কলেজ ক্যান্টিনের বাসি শিঙাড়া পেরিয়ে অনিমিখের জীবনেও প্রেম এল।
একদিন মেয়েটা জিজ্ঞেস করেছিল
— এত নিশ্চিন্তে থাকো কী করে?
অনিমিখ না ভেবেই বলল, কিছু না ভাবলেই সব সহজ লাগে।
সহজ নাকি… মেয়েটা কথাটা শেষ না করে চুপ করে তাকিয়ে ছিল।
অনিমিখ প্রথম প্রথম ওর কথা শুনে ভাবত, কমপ্লিমেন্ট। কিছুদিন পর বুঝল, কমপ্লেইন।
চাকরিও একটা জুটেছিল।
প্রথম দিন অফিসে বসেই মনে হল, আরে এই চেয়ারে তোফা ঘুম হবে। শুধু চোখ খুলে ঘুমোতে হবে।
ঊর্ধ্বতনের কাছ থেকে একদিন শুনতে হল —‘আর ইউ অ্যালাইনড?’
—না, হরাইজন্টালি লেইড।
একটা হাসির রোল উঠল অফিসে। কিন্তু তারপরের ঘটনাগুলোয় হাসি দুম করে মিলিয়ে গেল।
অনিমিখদের গল্প আসলে এইভাবেই ফুরিয়ে যায়।
ঘুম থেকে চিরঘুম। তবে নিদ্রাদেবী হয়তো ওর জন্য অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল।
বেশ কয়েকদিন হল, রাত হলেই অনিমিখ কেমন যেন মিইয়ে যায়। ঘরের মধ্যে পায়চারি করে। ঘড়ির কাঁটা যেন ওকে বিরক্ত করবে বলে ইচ্ছে করে একটানা শব্দ করে—টিক – টিক – টিক…
একদিন বৌ জিজ্ঞেস করেছিল, ঘুমোবে না?
—ঘুম আসছে না।
—কী ভাবছ?
—কিছু না।
স্ত্রী হালকা হেসে বলেছিল —তুমি ‘কিছু না’টা খুব বেশি ভাবো।
তারপর আর কিছু বলেনি।
এই না বলাটাই সবচেয়ে বেশি কানে লাগে আজকাল।
বন্ধুর সাফল্য
নিজের সিদ্ধান্ত
স্ত্রীর নীরবতা
মায়ের চুপ হয়ে যাওয়া
মা আর এখন বলে না— আর কতক্ষণ ঘুমোবি।
একদিন ফোনে মা বলেছিল, এখন একটু নিজে বুঝে বুঝে চলিস।
এই নিজে বুঝে চলিস কথাটার ভেতরে কোনও বকুনি নেই। কোনও তাড়া নেই।
শুধু একধরনের সরে যাওয়া আছে।
এই চুপ করে যাওয়ার আওয়াজটাই সবথেকে বেশি কানে বাজে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে মধ্যযাম পেরিয়ে গিয়ে অনিমিখ স্পষ্ট শুনতে পেল— আর কতক্ষণ ঘুমোবি?
চমকে উঠেছিল অনিমিখ। এটা মায়ের গলা না। স্ত্রীর গলাও না। কোনও পরিচিত অথবা অপরিচিতরও গলা না।
একটু থেমে, নিজেই নিজেকে বলল —উঠবি? নাকি আর পাঁচ মিনিট?
এটা অনিমিখের নিজের গলা। ঘরের অন্ধকারে নিজের মুখটাই কেমন অপরিচিত লাগছিল! ঘরের অন্ধকারে চোখ দুটো খুলে রেখেই শুয়ে রইল অনিমিখ।
ঘড়ির কাঁটা একঘেয়ে শব্দ করেই চলেছে —টিক-টিক-টিক। মনে হচ্ছিল, উঠে বসা খুব কঠিন কিছু না। শুধু একটু নড়লেই হয়।
কিন্তু শরীরটা নড়ল না।
মাথার ভেতর আবার সেই গলাটা—
—আর কতক্ষণ?
অনিমিখ খুব ধীরে বলল —
—আরেকটু…
ভোর হয়ে আসছিল। রাতের গাঢ় অন্ধকার ম্লান করে ফিনফিনে কালো চাদরের পেছন থেকে আসা আলোর মতো ভোর।
ঘরের ভেতরে একটু একটু করে আলো ঢুকতে শুরু করেছে।
অনিমিখ চোখটা বন্ধ করল।
ঘুম আসেনি।
তবুও অনিমিখ উঠল না।
তারা ভোটের পরে ঘুমিয়ে পড়ে ভোটের আগে জাগে
সন্দীপন নন্দী
এ কী বাঙালির ফেজ টু অকালবোধন? মহালয়া ভোরের পর এই সেই বিশেষ ঋতু, যখন এ জাতির সমবেত ঘুম ভাঙে পাড়ায় পাড়ায়। দল নামে ঢল নামে প্রতি গাঁয়ের মোড়ে মোড়ে। রণংদেহি মোডে দুর্গার মতো জেগে ওঠে ভোটার, জেগে ওঠে গ্রাহক, জেগে ওঠে সমাজে সকল প্রহরণের ধারক-বাহকরাও। আশ্চর্য! ভোর ৪টায় শিমুলের মা গত হবার পর শত ডেকেও যে মিত্রবাড়ির দরজা খোলেনি, সে বাড়ির জ্যেষ্ঠপুত্রই আজ সকাল ৫টায় দুধসাদা পাঞ্জাবি পরে কোথায় চললেন? শেষ চৈত্রে সবার চক্ষু চড়কগাছ! ১২টার আগে মাছ বাজারে চিরকাল অনুপস্থিত চিত্ত জেঠু আজ ফ্ল্যাগ নিয়ে সকাল ৬টায় রাস্তায় নেমে পড়েছেন! কারণ আজ ভোট। তাই ঘুমের দেশ থেকে সকাল সকাল এদের উদয়। জানা গেল মধুচন্দ্রিমার টাইগারহিলই শেষ, তার বছর কুড়ি পর আজ প্রথম সূর্যোদয় দেখবে পার্টির হোলটাইমার বিট্টু। যে পলিটব্যুরো থেকে আজ পলিতবুড়ো। দলের সূর্যাস্তেও শূন্যের ভেতর অসীম প্রত্যাশায় ঢেউ গুনে চলেছে।
প্রশ্ন, একটা আসন্ন ভোটের দান শুধু কি ভোটদানেই সীমাবদ্ধ? উত্তর, একদম নয়! ফেলে আসা রীতিনিয়মের খোলস থেকে যে গণতান্ত্রিক উৎসব মানুষের অন্য ‘আমি’-কে হিঁচড়ে টেনে বের করে আনে গণসম্মুখে। প্রকৃতার্থে ঘুম ভাঙার যে বাইনারিতে রাজনীতির উদ্যানে কত যে নতুন ফুলের আমদানি হয়! রপ্তানিও! ফলে এই মতবিনিময়ে ভোট এক বিনিয়োগের অনন্য মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কেমন? ভোট দেবে ভাতা দেব। জলের কল দেব, ঘর দেব, রাস্তা দেব, আলো দেব। কাকভোরে দরজা খুলতেই হনুমানের মতো প্রতিশ্রুতির বিশল্যকরণী পাহাড় এনে হাজির করেন নেতারা। সে সূত্রে বৈশাখী দহনেও ‘শীতঘুম’ ভেঙে মাইকের কাছে শুরু হয় নেতাদের মকমকি। পিচ গলে, গলা চড়ে। ভোট ঘোষণার পরদিনই ভূতের মতো ঘুম ভেঙে চোখ ডলতে ডলতে যেন শ্যাওড়া গাছের মগডাল থেকে একে একে নেমে আসে পার্টির ছেলেরা। ওরা কারা? যারা দাদার লাইসেন্স না পেলে মর্নিং-এ দাঁত মাজে না, চান্স পেলেও চা চাখে না।
ঠিক এইসময় জনগণের জন্য তন্দ্রাহারা রাজনৈতিক কর্মীদের ‘হৃদয়ের একূল ওকূল দু’কূল ভেসে যায়’। আর বেলা বাড়লে দরদি ব্র্যান্ডের জামা পরে কেউ গৃহস্থের মাটিতে বসে একথালা পান্তায় লাঞ্চের সেলফি তোলেন, অনেকে ভোট প্রচারের গাড়ি থেকে নেমে সহসা ছুটে যান ইরিধানের জমিতে। তারপর? অদক্ষ হাতে ধান বপনের ছবিখানি ছবি হয়ে ঘুরতে থাকে সমাজমাধ্যমে। ট্রোল হয়, তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু প্লটে লেখা?
সবমিলে এক কুর্সি দখলের নির্বাচন নেতাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয় এবং মাঠে ময়দানে প্রার্থীর প্রচারে দিনরাত একাকার হয়। কার্যত প্রত্যেকেই এঁরা হয়ে ওঠেন নিদ্রাহারা সমব্যথী। ফলে নেতাদের ‘জীবসেবাই স্লিপসেবা’ হয়ে ওঠে বঙ্গের জেলায় জেলায়। স্নানাহার, নিদ্রা ভুলে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মানবসেবার ধুম লাগে হৃদকমলে। ধূমকেতুর মতো ভোটের ডাকে সাড়া দিয়ে বসন্তকোকিল সম নেতারা ছুটে আসে ভোটারের দরজায় দরজায়। অনেকে ভোটের টিকিট পেতে জেগে ওঠেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। তবে সে আগুন ভোটশেষে প্রতিবার নিশ্চিত নিভে যাবে জেনেও জনতা হাসি হাসি মুখে ঘৃণার ভাষণ শ্রবণ করে। পার্টির যে বিরল মানব ও মানবীরা গণনার দিনশেষে পুনরায় ঘুমের দেশে চলে যান। হাবেভাবে মৎস্যমুখীর পরদিন শোকের বাড়িতে জাগ্রত মানুষকেও যেমন নিদ্রামগ্ন লাগে সেইরূপ এই নেতারাও। ভোট শেষ তো সব শেষ। যে ভোটপ্রহর ঘড়ির অ্যালার্ম হয়ে জাগিয়ে তোলে নেতাদের। আবার ভোর হলে দোর খুলে তাঁরাই ভোটভিক্ষায় নেমে পড়েন। যে ভণিতায় ভোটারের চৌকাঠে কোটিপতি প্রার্থীও এসে কাঙাল সাজেন ক’দিন।
ইহাই ভোটরঙ্গের বঙ্গে কুলাকুশলীদের মুখ্য নীড় বাঁচনের ভূমিকা। যেখানে ঘুমহীনতার অভিনয়ে, তারা এক দু’মাস ফর দ্য পিপল অফ দ্য পিপল হয়ে ওঠেন। কী যেন আশ্চর্য জাদুবলে লেটরাইজার অলস মানুষগুলো প্রত্যেক প্রত্যূষে পুতলনাচের মতো দলের উন্নয়নের ইতিকথায় মুগ্ধতা রচনা করতে করতে এগিয়ে যান ভাঙাপথের রাঙাধুলোয়। পড়শির ডোরবেলে প্রথম হাত পড়ে, পাশের বাড়ির ম্যাট্রেসে প্রার্থীরা রেখে যান চরণের পয়লাধুলো। অথচ বিজয়মিছিল প্রস্থানের পর সেই কাছের মানুষ সাজারাই বেপাত্তা ভ্যানিশকুমার হয়ে যান। ক’দিন ধরে তৈরি হওয়া অন্যরকম সহানুভূতি ও সমানুভূতির চিত্রগুলো টুকরো টুকরো কাগজের মতো তুমুল ঝড়ে দিগবিদিক উড়ে যায়। ফেরে না, কেউ কথা রাখে না। ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা অচেনা খোকাবাবুদের আর প্রত্যাবর্তন হয় না। বরং ভোটান্তে প্রচারে দেওয়া ফোন নম্বর সহ রক্তমাংসের মানুষটিও নটরিচেবল হয়ে যান নিমেষে।
ফক্স টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সদা সত্যবাদী শ্রী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমোই’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবার ঘুরিয়ে বলেছিলেন, ‘যোগব্যায়াম আমায় ২০ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখে’। আবার বারাক ওবামার আমলে হোয়াইট হাউস রাত ১১টাতেও মেল রিসিভের অভূতপূর্ব ঐতিহ্য চালু করেছিল। সুতরাং ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে। শুধু দেশকাল ভেদে প্রেরণার ভার্সন বদলে যায় মাত্র। কিছুকাল পূর্বে সংসদ চলাকালীন নির্মলা সীতারামনের ভাষণের মাঝেই ঘুমিয়ে যান তার সতীর্থ এইচডি দেবেগৌড়া। এমনকি স্বয়ং রাহুল গান্ধিও একবার সংসদে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন। কিন্তু এসব অভিনয় নয়, আঁখো দেখা হাল। শোনা যায়, যুদ্ধরত নেপোলিয়ন ঘোড়ার পিঠে চড়েও দু’দণ্ড ঘুমিয়ে নিতেন। আবার ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’-র পাতায় শিব্রাম চক্কোত্তির স্বীকারোক্তি ‘সারা রাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে কহতব্য নয়’! মহাত্মা গান্ধি মনে করিয়ে দেন ‘প্রতি রাতে, যখন আমি ঘুমোতে যাই, আমি মারা যাই’। ফলে ঘুম দিয়েই ভোটপর্বে আসল ও নকল নেতা চেনা যায়। দিকে দিকে ঘুম ও জাগরণ মন্ত্রে শর্ট টার্ম দীক্ষার পলিসি নেন নেতারা।
এদিকে চোর ঘুমোয়, ডাকাত ঘুমোয়, খোকা ঘুমোয়, হাতকাটা দিলীপ ঘুমোয়, শ্মশান স্বপন ঘুমোয়, ঘুমোয় বৈশাখী, ঘুমোয় শ্রাবণী, ঘুমোয় মেসি, ঘুমোয় ছদ্মবেশী। এই একটা জায়গায় টেমস টু মহানন্দার জল মিলেমিশে হরিবোল। অর্থাৎ মশারি থাক বা না থাক, পিসফুল চাঁদনিরাত হোক বা বিধ্বস্ত ওয়্যারফিল্ড, সমগ্র শোভন অশোভনকে গুলি মেরে ফৎ ফৎ চোখ বুজে নেন এই অদ্ভুত মানুষেরা। দণ্ডায়মান ভিড়বাসে, কাব্যবাসরে নিজের কবিতাপাঠ শেষে বা কোমলগান্ধারের মতো বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে যে দোষে ঘরে ঘরে রবিবাসরীয় খাঁসির ঝোলের তলে পোড়া গন্ধ গুম মেরে থাকে, কখনও অ্যালার্ম বিট্রে করায় অঙ্ক পরীক্ষাটা শেষমেশ দিতেই পারে না প্রথম শ্রেণির ছাত্র বিরহ।
আসলে সবটাই ঘুমসৌজন্য। এমনকি ভোটদিবসে এই অভিশপ্ত কালঘুমই মকপোলের দফারফা করে ছেড়েছিল এক নেতার। তাই সে মধ্যরাতে কুকুরের ঘেউঘেউ হোক বা অলস প্রহরে বিড়ালের মিউমিউ, নিদ্রা যাদের বিলাস তারা ঘুমোবেই। কচুবন বা নিপবন, বকুলতলা বা নিমতলা, হাতির হানায় ছিন্নভিন্ন পোলিং স্টেশন বা খেলার ড্রেসিংরুম অথবা নাটকের গ্রিনরুম, এই রোমাঞ্চকর প্রাণীদের ঘুমে বিরত করা কঠিন। সুতরাং বলা যায়, ঘুম এক অতি প্রাচীন বেদনারহিত, দুঃখবিস্মৃতির বা বাতের ব্যথামুক্তির সেরা টোটকা। তবে বৃদ্ধ বা নবজাতকের ঘুমের ধরন কিন্তু এক নয়। প্রথমজন অনিদ্রা উদ্বেগে আকাশে তারা গুনে বা বিচ্ছিরি কাশি হাতুড়ির মতো বুকে ঠুকে ঠুকে রাত কাবার করলেও শিশুর ঘুম দিবারাত্রি। একদিনে শিশু ঘুমোতে ঘুমোতেই কখন যেন বড় হয়ে যায়। তারপর কালের যাত্রাপথে শিশু-কিশোর হয়। একসময় যৌবন আসে। তখন সাংসারিক চাপ বা ব্রেকআপ কিংবা একটা ট্রু লাভের সন্ধানে কীভাবে যেন সহস্র ঘুমভাঙানিয়ারা তার ঘাড়ে এসে চেপে বসে। অতএব ঘুমের সঙ্গে বয়সের সম্পর্ক চিরকাল ব্যস্তানুপাতী। তবু কারও মগন গহন ঘুমের ঘোরে বৃষ্টি নামে, কারও ঘুমঘোরে মনোহর এসে ঘা দেয়। আসলে ঘুম এক স্বল্পমেয়াদি স্বপ্নসম্ভবের শ্রেষ্ঠ মেকানিজম, যার পাল্লায় পড়ে কোথাও বামন চাঁদ ধরে, কোথাও ভাগচাষি মেঘরোদ্দুর ভেঙে ভেসে যায় রাশিয়া, কেউবা অল্পস্বল্প লেখার জন্য সম্মানিত একপিস চাকতি পাওয়ার ধোঁয়া ধোঁয়া খোয়াব দেখেন অনায়াসে, কেউবা দূরদ্বীপবাসিনী ফার্স্ট লাভকে ফিরে পায় পাড়ার দারুচিনি দেশে। মোদি থেকে দামোদর নদী, সব পেরিয়ে ঘুম হয়ে ওঠে ম্যাজিক ও রিয়েলিজমের বিশেষ সেতু। তাই বিসিএস থেকে টিসিএস, সবাইকে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো ঘরে এনে ফেলে এক অনাহুত, পরম ও প্রখর সলিড ঘুম। ফলে মানবের মরতে দম তক, সাধ ও আশা মেটাবার এক অন্যতম ক্রাশকোর্স এই ঘুমময়তা। তিনপুরুষে পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ড না থেকেও আপনি অলংকৃত করতে পারেন অর্থমন্ত্রীর চেয়ার, মুহূর্তে হয়ে যেতে পারেন ক্রীতদাস হতে কালিদাস, পরি থেকে গ্লোরি! যে ইনস্টিটিউটে নাচ হোক বা গাছ, আপনার উচাটন ফ্যান্টাসি মন হয়ে ওঠে সর্বত্রগামী। আদতে ঘুম চাবুকের শব্দে সপাং করে একটা স্বপ্নকে যেমন মারতে পারে তেমন আজন্মলালিত অদেখা অজানা স্বপ্নকে নদীর ন্যায়ে বয়ে বেড়াতে পারে আজীবন। মরণ রে তুঁহু মম ঘুমসমান!



