গৌতমেন্দু রায়
আমাদের ছোটবেলায় কাজী নজরুল ইসলামের লেখা একটা কবিতা খুব প্রচলিত ছিল। তার প্রথম চরণ দুটি ছিল ‘ভোর হলো, দোর খোলো/ খুকুমণি ওঠো রে’। ভোর হলে কেন খুকুমণিকেই উঠতে হবে আর খোকাবাবু পড়ে পড়ে ঘুমোবে সেই প্রশ্ন কখনও মাথায় আসেনি। পরে, কবির অন্য কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে আরও একটি কবিতা পাই যেখানে খোকাবাবু ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে চাইলেও মা তাকে বারণ করছেন। বোঝো ঠ্যালা! খোকার সাধ নামের সেই কবিতাটি ছিল এইরকম –
‘‘আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসম-বাগে উঠব আমি ডাকি।
সুয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,
‘হয়নি সকাল, ঘুমো এখন’–মা বলবেন রেগে।”
যাই হোক, জন্মসূত্রে খোকা হওয়ার সুবাদে আমি নিজেও এই কবিতার সুফল পেয়েছি। সেই যে দেরি করে ওঠার সুপরামর্শ কবি খোকাবাবুদের দিয়ে গিয়েছিলেন সেটা ধেড়ে খোকা হওয়া অবধি আমি খুব নিষ্ঠা সহকারে মেনে চলেছি।
এই লেখাটির শিরোনাম আপনার শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠার আগেই অন্য একটি বিষয় আমি উত্থাপন করতে চাই। তা হল- শিরোনামের মধ্যে সদম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা দরজা বা ‘দোর’ শব্দটি। দোর কথাটা শুনলে আপনার ইংরেজি ডোর শব্দটির অনুষঙ্গ মনে পড়ে না? নিশ্চয়ই মনে পড়ে। কারণ, হে পাঠক, আপনি অতি বিচক্ষণ। লেখকদের মাঈ-বাপ। আপনারা থাকলে লেখক আছেন, আপনারা না থাকলে লেখক ভ্যানিশ কুমার অথবা ভ্যানিশ কুমারী।
তো, এইবার ফিরে আসি সেই ডোরের মায়াডোরে। তারজন্যে আপনাদের কাছে একটি কিসসা শোনাতে হবে। কিসসাটি আজকের নয়। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর ল্যাজা আর ঊনবিংশ শতাব্দীর মুড়োর দিকের। সেই সময়ে লালমুখো-রা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় নীলচাষিদের পৃষ্ঠদেশে কী পরিমাণ লাঠির বাড়ি মেরে নীল করে দিতেন সে অত্যাচারের ইতিহাস আপনারা সবাই কমবেশি জানেন। তবে তাঁদের মনে একটু ভয়ও ছিল। কখন আবার চাষিরা বেঁকে বসেন আর হামলা করেন তাঁদেরই না মুখ ব্যাঁকা করে দেন। তাই, যেখানে যেখানে নীল চাষ হত তার ধারেকাছে তাঁদের যে কুঠি ছিল সেখানে তাঁরা শক্তপোক্ত দ্বার নির্মাণ করতেন। দ্বার ওয়ান, দ্বার টু অথবা দ্বার থ্রি-তে যেসব দেশি রক্ষী সেই গোরাদের পাহারা দিতেন তাঁদের একটিই নাম ছিল। সেটি হল দারোয়ান। দ্বার ওয়ানেও দারোয়ান, দ্বার টু-তেও দারোয়ান। বাংলায় রাজত্ব করেও এই গোরা সাহেবরা বাংলা ভাষার গোড়ায় পৌঁছাতে পারেননি। যাকে বলা যায় গোড়ায় গলদ। আপনি অবশ্য এই বিষয়টিকে গোরার গলদও বলতে পারেন। সেই স্বাধীনতা আপনার অবশ্যই রয়েছে। এই যে নীলকুঠির ডোর-এর কথা উল্লেখ করলাম তা নিয়ে তাঁদের বেশ ডর ছিল। যাকে ডোরের ডর বললে অত্যুক্তি হবে না। দ্বারে যে দারোয়ান রয়েছেন তাঁরা তো সাহেবদের জড়ানো ইংরেজি হুকুম তামিল করতে পারবেন না। ইংরেজিতে ‘ওপেন দ্য ডোর’ বললে তাঁরা হয়তো একঘটি জল এনে দেবেন। তাই তাঁরা তখন একটা বুদ্ধি বার করলেন। এঁরা জানতেন যে, এই দ্বাররক্ষীরা ইংরেজি না জানলেও হিন্দি কিছুটা বোঝেন। সেজন্য তাঁরা মূলত দুটি হিন্দি হুকুম মনে রাখার চেষ্টা করলেন। প্রথমটি হল ‘দরওয়াজা খোল দে’। সেটা তাঁরা রিপ্লেস করলেন ইংরেজি দিয়ে। ‘দেয়ার ওয়াজ আ কোল্ড ডে’। ভারী জিভ দিয়ে উচ্চারণ করলে তা ‘দর-ওয়া-জা- খোল-দে’র মতোই শোনায়। পরের হুকুমটি তার বিপরীত। এটা বলার জন্য তাঁরা যে ইংরেজি বাক্যটি জড়িয়ে জড়িয়ে বলতেন তা হল ‘দেয়ার ওয়াজ আ ব্রাউন ক্রো’ অর্থাৎ কিনা ‘দর-ওয়া-জা- বন-করো ’। সত্যি মিথ্যে জানি না বাপু! তবে হতেও তো পারে!
এতক্ষণ ধরে আপনাদের কাছে ভোর, ডোর বা দোরের যে সাতকাহন মেলে ধরলাম তার কারণ একটাই। এখন আপনার দুয়ারে ভোট। আর ভোট মানেই নানা দলের জোট অথবা ঘোঁট। সেই ঘোঁটের ঘ্যাঁটে আপনি নিজে পাঁচফোড়ন। অর্থাৎ প্যাঁচে পড়ে ফোড়ন হয়েছেন। আপনাকে বাদ দিয়ে ভোটের ঘণ্ট স্বাদহীন। ভোটের নির্ঘণ্টও অর্থহীন। তাই বলে ভোটের ময়দান কিন্তু অর্থহীন নয়। এই ময়দানে ময়দানবেরা অর্থের বান্ডিল নিয়ে ঘুরছে। সিম্পল ফর্মুলা, একহাতে নাও অন্য হাতের আঙুল দিয়ে ভোটের মেশিনে চাপ দাও। কোনও চাপ নেই, সেই মোহন অঙ্গুলির চাপের ছাপ কোথায় পড়েছে বাপেরও সাধ্য নেই কোনওভাবে তা ঠাহর করার।
ঘুম ভাঙলেই আপনি এখন শুনতে পাবেন আপনার বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রার্থী রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন। ‘খোলো খোলো দ্বার রাখিয়ো না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে। দাও সাড়া দাও, এইদিকে চাও এসো দুই বাহু বাড়ায়ে’। আপনি তো তেমন বাহুবলী নন, আপনার প্রাণের ভয় আছে, সেজন্য কাঁচা ঘুম বিসর্জন দিয়ে কান এঁটো করা হাসি হেসে আপনাকে দরজা খুলে বাহু বাড়াতেই হবে। আগে সে এক জমানা ছিল যখন আপনি ভোট দিতেন প্রার্থীর রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর সেবামূলক মনোভাব, তাঁর ব্যবহার, শিষ্টতা, আচার-আচরণ, সৌজন্যবোধ, শরীরী ভাষা এইসব দেখে। এখন সময় বদলে গিয়েছে। এখন আর আপনি প্রার্থীর উপরিউক্ত রং-ঢং দেখে কিছু বিচার করেন না। আপনার আমার ইদানীন্তন একটাই বিচার্য বিষয়। সেটা হল রং। প্রার্থী মনুষ্য অথবা ‘মনুষ্যেতর’ যা-ই হোন না কেন তাঁর পরিচয় হল শুধু রং। কেউ লাল, কেউ নীল, কেউ সবুজ, কেউ গেরুয়া- এইরকম আর কী। কত রঙে যে তিনি নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছেন সেই রংবাজির হিসেব রাখব সেরকম সামর্থ্য আমাদের কোথায়! যিনি সকালে ছিলেন লাল, দুপুরে হয়েছেন নীল, বিকেলে আবার তাঁরই রং গেরুয়া অথবা হলুদ। রং বদলানোর জন্য এঁদের হলুদ কার্ড দেখাবেন এমন রেফারি এখন ফেরারি। এঁরা এক একজন হলেন রঙের রামধনু। বেনীআসহকলা। রং বদলানোর কলাকৌশলের দিক থেকে এঁরা সবাই নিপুণ কলাকার। যদিও আপনার দরজায় বাইরে যিনি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ভোটভিক্ষা করছেন তাঁর বহিরঙ্গের আবরণ সাদা, মানে সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা। এঁদের ওয়ার্ডরোবে আর অন্য কোনও রঙের পোশাকই নেই। অন্তরঙ্গ বা বহিরঙ্গের রং যা হোক না কেন। রবীন্দ্রসংগীতের ওই দু’কলি শেষ করেই উনি জাম্প দিয়ে দাদাঠাকুরের আশ্রয় নেবেন এটা নিশ্চিত। এইবার তিনি মনে মনে গাইবেন ‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারী সাজিনু/ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে’।
ভোট এলে দাদাঠাকুর সত্যিই খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। ১৪৫ বছর আগে জন্মেছিলেন এই প্রাতঃস্মরণীয় রসরাজ কিন্তু আজও তিনি রসিক বাঙালির হৃদয়ের অন্তঃপুরে বসে আছেন পূর্ণ মর্যাদায়। দাদাঠাকুর বলতে আমি যে শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের কথা মনে করাতে চাইছি সে নিশ্চয়ই আপনার মতো বিচক্ষণ পাঠককে খোলসা করে বলে দিতে হবে না। ‘দাদাঠাকুর’ নামাঙ্কিত একটি সিনেমার সুবাদে তাঁর লেখা একটি গান তদানীন্তন সময়ে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। গানটি হল ‘ভোট দিয়ে যা, আয় ভোটার আয়।/ মাছ কাটলে দুধ দিব, গাই বিয়োলে দুধ দিব। দুধ খাওয়ার বাটি দিব…’। এখন অবশ্য রসরাজ দাদাঠাকুর বেঁচে থাকলে গানের কথাগুলোর একটু হেরফের করতেন। হয়তো তিনি লিখতেন, ‘নোট নিয়ে যা, আয় ভোটার আয়…’ নোট যোগ করার পরেও অবশ্য মুড়ো সমেত মাছটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে না। টিভিতে দেখেছি, একজন প্রার্থী গোটা একটা মাছ হাতে ঝুলিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করছেন। রোদে ঝলসে সকালবেলার তাজা ভেটকি বিকেল গড়ালে খাজা শুঁটকি হয়ে যাচ্ছে। সে যাই হোক। মাছ বলে কথা। এই মাছ তাঁকে ‘ভেড়ি মাছ’ অথবা ভেরি মাচ টিআরপি তো দিচ্ছে রে বাবা। টিভির দৌলতে একজন প্রার্থীকে আবার দেখলাম ভোটারের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন। ভোটারটি হয়তো দাড়ি রাখতেই চান কিন্তু প্রার্থী নাছোড়বান্দা। ক্যামেরার সামনে তিনি ভোটারের দাড়ি কামিয়ে তবেই ছাড়বেন।
আটান্ন বছর আগে মারা গিয়ে একরকম বেঁচে গিয়েছেন দাদাঠাকুর। ঘন ঝোপের মতো গোঁফ ছিল তাঁর। ইংরেজিতে যার নাম ওয়ালরাশ মুশটাশ। রসরাজ শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ওই ভোটকেন্দ্রের ভোটার হলে নরসুন্দর প্রার্থী হয়তো তাঁর ওই নধর গোঁফজোড়া কামিয়ে তবেই ছাড়তেন।



