লোডশেডিং, কলিং বেল ও ভোম্বলের প্রেম

শেষ আপডেট:

সানি সরকার

মেঘলা আকাশ চিরে আচমকা এক চিলতে রোদের ঝলক এসে পড়েছে বারান্দায়। এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছের পাশাপাশি জারুলের ডালগুলি হঠাৎ দমকা হাওয়ায় হেলে পড়ছে, পরক্ষণেই প্রাণপণে সোজা হওয়ার চেষ্টা করছে। ব্যালকনির টবে এখন আর রোদ নেই, বরং ঝড়ের দাপটে তারের বাঁধন ছিঁড়ে টবগুলোর খসে পড়ার উপক্রম। কালবৈশাখীর দাপট শেষে স্বস্তির বৃষ্টি। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে প্রকৃতির এই অপরূপ রূপবদল দেখতে বেশ লাগছিল। কৈশোর থেকেই তো ঋতুবৈচিত্র্যের এমন খামখেয়ালির সাক্ষী। যবে থেকে বুঝতে শিখেছি, নিজের খেয়ালে এই ঝড়-বৃষ্টিকে সামলে আসছি। বাড়ির সামনের জল-জমা খেলার মাঠে বিকেলে ছুটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে কাদা মেখে ফুটবল খেলা, আর কাদামাখা শরীর নিয়ে ফিরে মায়ের প্রলয়ংকরী গর্জনের মুখোমুখি হওয়া! সাদা চুলের ভিড়ে স্মৃতির দল তখন মস্তিষ্কে হানা দিয়েছে।

আপন মনেই হাসছি, হঠাৎ নস্টালজিয়ার তাল কাটল— ‘ডিং ডং… ডিং ডং…’। একবিন্দু ইচ্ছে না থাকলেও, একরাশ বিরক্তি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে সদর দরজা খুলতেই দেখি, বৃষ্টিভেজা রেইনকোট গায়ে এক ডেলিভারি বয় প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে। ওটিপি জেনে প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে একগাল হাসি দিয়ে মুহূর্তে উধাও ছেলেটি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার আগে হঠাৎ নজরে পড়ল ‘যত নষ্টের গোড়া’ ওই ছোট্ট প্লাস্টিকের সুইচটার দিকে। পোশাকি নাম ‘কলিং বেল’! মানুষের আগমনী বার্তার কী অদ্ভুত আবিষ্কার! ছোট্ট এই যন্ত্রটার মধ্যে কত শত গল্প, রাগ-অভিমান আর গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। বাঙালি যদি কলিং বেল নিয়ে থিসিস লিখত, আমি নিশ্চিত তার শিরোনাম হত— ‘কলিং বেল : বাঙালির মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক আদানপ্রদান’।

কলিং বেল শুধু আগমনী বার্তাই দেয় না, এর আওয়াজ অনেকসময় বাড়িওয়ালার মেজাজও নিখুঁতভাবে তুলে ধরে। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কলিং বেলের আওয়াজ শুনে নির্ভুল বলে দেওয়া যায় গৃহকর্তার মেজাজ কেমন। কিছু বাড়ির কলিং বেল থাকে যারপরনাই বদমেজাজি। সুইচে হাত রাখতেই সজোরে— ‘ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং’…। এমন তীক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক আওয়াজে চমকে দু’পা পিছিয়ে যেতে হবেই, মনে হবে ভেতরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলছে। এ আওয়াজ শুনলেই মালুম হয় গৃহকর্তা রাগভারী, পাড়ার ছেলেরাও ভুলেও এই বাড়িতে পুজোর চাঁদার রসিদ নিয়ে যায় না। আবার কিছু কলিং বেল ভারী মিষ্টি। মোলায়েম মিউজিকে শোনা যায় পাখির ডাক বা হালকা ‘টুং টাং’। সুইচ টিপলে মনে হয়, বেলটা সলজ্জ হেসে বলছে, ‘একটু অপেক্ষা করুন, ভেতরে খবর পাঠিয়েছি’। বোঝা যায় মানুষজন অতিথিবৎসল ও নরম স্বভাবের। কিছু বেলের আওয়াজ আবার ভক্তিগীতি বা শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয় পরিবারটি ধর্মভীরু। এর বাইরে কিছু বেল আছে, যেগুলি থেকে অধিকাংশ সময় যন্ত্রণাকাতর গোঙানির মতো বিটকেল আওয়াজ বের হয়। বোঝা যায় বাড়ির লোকজন এতটাই অলস যে, খারাপ বেলটা ঠিক করার সময় নেই। এঁরা চরম নির্লিপ্ত, সংসারের কিছু নিয়েই বিশেষ মাথা ঘামান না।

তবে কলিং বেলের সঙ্গে সবচেয়ে বড় আর চিরন্তন লড়াইটি বাঙালির দুপুরের ভাতঘুমের। ছুটির দিনে আয়েশ করে খাসির মাংস দিয়ে পেটপুরে ভাত খাওয়ার পর অলস শরীরটা বিছানায় টানটান করে দেন অনেকেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে নেমে আসে ঘুমের ভারী পর্দা। ঠিক এই মোক্ষম সময়ে যদি কানে আসে— ‘ক্যাঁক… ক্যাঁক… ক্যাঁক!’ ইচ্ছে না থাকলেও বাধ্য হয়ে ধড়মড় করে উঠতে হবে। একরাশ বিরক্তি আর ঘুমের জড়তা নিয়ে দরজা খুলে দেখলেন, একগাল মাছি-তাড়ানো হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে এক সেলসম্যান। ‘দাদা, ঘুম নষ্ট করার জন্য দুঃখিত। প্রোমোশনের জন্য কোম্পানি প্রোডাক্টে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। এই ডিটারজেন্টটা নিলে ২০ লিটারের বালতি একদম ফ্রি!’ বিশ্বাস করুন, তখন ইচ্ছে হয় ওই বালতিটা সেলসম্যানের মাথাতেই পরিয়ে দিই। রাগ গিয়ে পড়ে কলিং বেলের ওপরেও। বেলটা না বাজলে দুপুরের সাধের ঘুমের এমন দফারফা হত না!

কলিং বেলের আওয়াজ কানে এলেই ছোটবেলার বন্ধু ভোম্বলের কথা বড্ড মনে পড়ে। ভোম্বল ছিল রাতের অন্ধকারের দস্যি। অন্ধকার হলেই ওর মাথায় দুনিয়ার বদবুদ্ধি ভিড় করত। আমাদের তারুণ্যে লোডশেডিং ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাড়ির বাইরে পা রাখার আনন্দে কখন কারেন্ট যাবে, সেই অপেক্ষা শুরু হত সন্ধ্যার পর থেকে। কারেন্ট যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় না থাকলেও ফিরতে পাক্কা এক ঘণ্টা নিত। এই এক ঘণ্টা বাড়ির সামনের মাঠে ভোম্বল, সান্টু, তুতুনদের সঙ্গে আড্ডা চলত। কিন্তু আড্ডা মারতে ভোম্বলের ভালো লাগত না। এই কারেন্ট যাওয়ার সময়টাই ওর কাছে ছিল ‘গোল্ডেন আওয়ার’। ঘুটঘুটে অন্ধকার, গরমে হাঁসফাঁস মানুষ, টানা পাখার আওয়াজ আর মশার গুনগুন— এমন সুবর্ণ সুযোগের জন্যই ওঁত পেতে থাকত ভোম্বল। পকেটে কালো ইনসুলেশন বা ব্ল্যাকটেপ নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ত নিজস্ব অপারেশনে।

গল্পের আসরে ব্যাঘাত ঘটিয়ে ওর ডেস্টিনেশন হত পড়শি পাড়া। তখন অধিকাংশ বাড়ির কলিং বেল থাকত সীমানা প্রাচীরে বা সদর দরজার দেওয়ালে। অন্ধকারে যে বেল নজরে পড়ত, তার সুইচটা চেপে ধরে ব্ল্যাকটেপ মারত সেই ভোম্বল। একের পর এক বাড়িতে অপারেশন শেষে নির্লিপ্ত মুখে ক্লাব মোড়ে এসে কারেন্ট আসার অপেক্ষা করত। কারেন্ট এলেই শুরু হত আসল খেলা! ব্ল্যাকটেপ লাগানো সব বাড়ির কলিং বেল একসঙ্গে টানা বেজে উঠত। বিভিন্ন বেলের আওয়াজ মিলে তৈরি হত এক ভয়াবহ সিম্ফনি। ভোম্বলের হাসির আওয়াজটাও তখন হত অন্যরকম। বেলের আওয়াজে লোক এসেছে ভেবে কেউ লুঙ্গি পরেই বেরিয়ে আসতেন, কেউ কেউ আবার কারণ অনুসন্ধানে টর্চ হাতে ছুটতেন। কিন্তু ভোম্বলের নাগাল পাওয়া কি এত সহজ! ধরা পড়ার আশঙ্কায় দিন বুঝে পালানোর বিভিন্ন রাস্তা ছকে রাখত সে, কেউ টিকি ছুঁতে পারত না।

কিন্তু চোরের দশ দিন তো গৃহস্থের একদিন। ভোম্বলও একদিন ধরা পড়ল। তবে গৃহস্থের হাতে নয়, এক তরুণীর ডাকাবুকো দাদার হাতে, আর সেটা নিতান্তই নিজের বোকামিতে। সেবার ডেস্টিনেশন বদলে ওই তরুণীর বাড়ির কলিং বেলেই টেপ মেরেছিল। মেরেছিস মার, কিন্তু তা আবার কলেজ ফেরত সেই তরুণীকে শুনিয়ে বলার কী দরকার! পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের বলেছিল, ‘কারেন্ট আসার পর কলিং বেল তো বাজল, কিন্তু একজনাকে দেখতে পেলাম না…।’ মেয়েটির বুঝতে অসুবিধা হয়নি কাণ্ডটি কার। সে দাদাকে জানায় এবং পরের দিন ইশারায় ভোম্বলকে চিনিয়ে দেয়। যথারীতি ডাকাবুকো দাদা দলবল নিয়ে হাজির। ভোম্বলের সঙ্গে একপ্রস্ত ঝামেলা এবং অভিযোগ পৌঁছাল পাড়ার সিনিয়ার দাদাদের কাছে। ক্লাবের মোড়ে সকলের সামনে কান ধরে ওঠবোস করে সে যাত্রায় ছাড় পেল সে। আমরা ভাবলাম, যাক, ভোম্বলের একটা জুতসই শিক্ষা হল!

কিন্তু আসল চমক টের পেলাম কয়েক মাস পর, সরস্বতীপুজোর দুপুরে। হঠাৎ দূর থেকে নজরে এল ফুচকার দোকানের ভিড়ে ভোম্বল। কাছে গিয়ে বুঝতে অসুবিধা হল না যে ওটা ভোম্বলই, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে ও অমন গদগদ হয়ে কথা বলছে? এ তো সেই মেয়েটি! হ্যাঁ, সেই কলিং বেল-বিলাসিনী, যার দাদা ভোম্বলকে মেরে তক্তা করতে এসেছিল। কীভাবে এই অসাধ্য সাধন হল, তা আজও পাড়ার বিরাট রহস্য। তবে ভোম্বল মুচকি হেসে সরস্বতীপুজোর রাতে বিড়িতে সুখটান দিয়ে বলেছিল, ‘বুঝলি, জেদ চেপেছিল। ঠিক করেছিলাম ওকে জব্দ করবই। শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু একটা অনুষ্ঠানে ওর নাচ দেখে, আর চোখদুটো দেখে প্রতিশোধ নিতে পারিনি। উলটে প্রেমে পড়ে যাই…।’ জানলে অবাক হবেন, ওই মেয়েটাই এখন ভোম্বলের ঘরনি। দুই সন্তানকে সামলাচ্ছে। একবার কলকাতায় ভোম্বলের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দরজা খোলার জন্য আমাকে ফোন করতে হয়েছিল। কারণ, ভোম্বল নিজের বাড়িতে কোনও কলিং বেল লাগায়নি! ভোম্বলের বাড়িতে কলিং বেল না থাকলেও, ওদের দাম্পত্য দেখে বিশ্বাস জন্মেছে, কলিং বেল শুধু সদর দরজাই খোলে না, মাঝে মাঝে মানুষের মনের দরজাও খুলে দেয়।

কলিং বেল যেমন বিরক্তি আর হাসির খোরাক জোগায়, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভীষণ এক বিষণ্ণতা। কোনও বাড়িতে যখন কাছের কেউ মারা যান, তখন উৎসবের বাড়িটা নিমেষে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আত্মীয়রা যখন ফিরে যান, তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা গ্রাস করে বাড়িটাকে। স্বজন হারানোর এই হাহাকারের বড় সাক্ষী ওই কলিং বেলটাই। যে বেলটা সকালে হকারের ডাকে বাজত, দুপুরে পরিচারিকার আগমন জানাত, বিকেলে ছোট ছেলেমেয়ের স্কুল থেকে ফেরার আনন্দে টুংটাং করে উঠত, সেটা হঠাৎ চিরতরে আওয়াজ হারিয়ে ফেলে। দিন, সপ্তাহ, মাস গড়ায়, অদ্ভুত স্তব্ধতা দরজার বাইরে অপেক্ষা করে। কেউ এসে আর সুইচে হাত দেয় না। ঘরের ভেতর থেকে কেউ বলে না, ‘দাঁড়ান, আসছি!’ না-বাজা কলিং বেলটা রোজ মনে করিয়ে দেয়, ডাকে সাড়া দেওয়া মানুষটি চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছে, আর কোনওদিন দরজা খুলে দাঁড়াবে না। এমন পরিবেশে মনে হয়, বিরক্তিকর সেলসম্যানটাও যদি অন্তত একবার এসে বেলটা বাজাত, তবু তো এই দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা ভাঙত!

আসলে কলিং বেল আকারে নেহাত ছোট্ট হলেও, যন্ত্রটা আমাদের জীবনের স্পন্দন। বাজছে মানে জীবন চলছে। হাসি, কান্না, বিরক্তি ও প্রেম— সবকিছুরই অদ্ভুত সুইচবোর্ড এই কলিং বেল। জীবনের পিচে বছরের পর বছর নটআউট থাকার পর মনে হয়, জীবনের কলিং বেলটাও ঠিক একদিন বেজে উঠবে। তা সে লোডশেডিং হোক বা না হোক। তবে যতদিন না সেই ডাক আসছে, ততদিন এই ‘ডিং ডং’ আওয়াজের মধ্যেই জীবনের ছন্দ খুঁজে নেওয়া ভালো। কী বলেন?

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...