মুখে হাসি, মাথায় হাত

শেষ আপডেট:

মানবেন্দ্র সাহা

হাসির কথা বললে মানুষ হাসবে, এটাই তো দুনিয়ার দস্তুর। কিন্তু জোকস শোনানোর আগেই যদি কেউ বত্রিশ পাটি বের করে হাস্যমুখ করে বসে থাকে, তবে সেটা বিরক্তির একশেষ বৈকি! হাসির গল্পের মূল চাবিকাঠিই হল ‘টাইমিং’। ঠিক মোক্ষম সময়ে শ্রোতারা যদি হো হো করে উচ্চকিত হাসিতে ফেটে পড়ে, তবে গল্পকথকের কলার যেমন গর্বে ফুলে ওঠে, তেমনি ইডেনে বসে ক্রিকেটের ছক্কা দেখার আনন্দও সেই এক হাসির গল্পেই ষোলোআনা উশুল হয়ে যায়। কিন্তু মুশকিল হল, একালে ইএমআই আর ব্লাড সুগারের চাপে মানুষ যখন হাসতেই ভুলে গিয়েছে, তখন কোনও এক ব্যক্তি যদি বিনা কারণে সারাক্ষণ মুখে একটা ‘হেঁ হেঁ’ মার্কা হাসি সেঁটে ঘুরে বেড়ায়, তবে সেটাও এক সাংঘাতিক বিড়ম্বনা।

আমাদের গল্পের নায়কের সমস্যাটা ঠিক এখানেই। জন্মলগ্ন থেকেই তার মুখে যেন একটা হাসি পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে কেউ এঁকে দিয়েছে। আর এই অকারণ হাসির চক্করে পড়ে বেচারাকে পদে পদে যে কত হেনস্তা হতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। স্কুলের নীচু ক্লাসে পড়ার সময়কার কথা। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের গুঁড়ো উড়িয়ে মাস্টারমশাই যখন গম্ভীর মুখে পড়াচ্ছেন, হঠাৎ তাঁর নজর গেল ছেলেটির দিকে। পড়ানো থামিয়ে তিনি বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁরে, তুই মিটিমিটি হাসছিস যে বড়?’ ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘না স্যর, আমি তো হাসছি না।’ মাস্টারমশাইয়ের তো তখন রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলছে, ‘কী! মুখের ওপর মিথ্যে কথা বলিস? আমি নিজের চোখে দেখলাম তুই হাসছিস!’ শেষমেশ ক্লাসের প্রিয় বন্ধু ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এসে এই ঘোর বিপদ থেকে ওকে উদ্ধার করে। বলে, ‘না স্যর, ও সত্যি হাসছিল না, ওর মুখটাই আসলে ওইরকম হাসি-হাসি!’ ছেলেটি তখন ছলছল চোখে মাস্টারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে। স্যরও কিছুটা হকচকিয়ে, কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘ও, তোর মুখটাই এমন? আচ্ছা… তা সে কথা আগে বলবি তো?’

কিন্তু ছেলেটি এমন কথা কাউকে আগ বাড়িয়ে বলবেই বা কী করে? রাস্তায় অচেনা লোককে দাঁড় করিয়ে কি আর বলা যায়, ‘দেখো ভাই, কিছু মনে কোরো না, আমার মুখটাই কিন্তু সবসময় এমন হাসি-হাসি!’ বিধাতা যে নিজের খেয়ালে কত বিচিত্র ছাঁচে মানুষকে গড়েপিটে নেন, তার কোনও হিসাবনিকাশ চিত্রগুপ্তের খাতাতেও বোধহয় নেই। হাসি জিনিসটাকে যে ঈশ্বর কত রকমভাবে মানুষের মুখে লেপ্টে দিয়েছেন, তার বৈচিত্র্য দেখলে তাজ্জব হতে হয়। মানুষ আবার সুবিধামতো সেই হাসির হাজার রকম নামকরণও করেছে- রাবণের মতো অট্টহাস্য, নায়িকাসুলভ মুচকি হাসি, মাড়িজুড়ে দেঁতো হাসি, খিলখিলে হাসি, মোসাহেবদের হেঁ হেঁ হাসি, পিশাচ হাসি, তাচ্ছিল্যের হাসি, বিদ্রুপের হাসি, ব্যঙ্গের হাসি এবং সর্বোপরি নির্ভেজাল বোকা হাসি। দুনিয়ার যাবতীয় সফল মানুষেরা তাঁদের প্রয়োজন আর ফায়দা মতো এই সমস্ত হাসির অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু যত মুশকিল ওই হাবাগোবা ভালোমানুষগুলোর, যারা সারাক্ষণ মুখে ওই একরকমের বোকা হাসি ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসির রকমফের করা তাদের সিলেবাসের বাইরে। এরা অন্যের চূড়ান্ত সর্বনাশ বা কারও মৃত্যুসংবাদ শুনেও ওই একই হাসিমুখে হয়তো বলে ওঠে, ‘বেশ বেশ। খুব ভালো।’ হাসি আর মৃত্যুসংবাদ যে আদতে উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু, এই সাধারণ জ্ঞানটুকুও তাদের থাকে না। আর এই ‘বেশ বেশ, ভালো ভালো’ বলাটা তো আবার অনেকের জন্মগত মুদ্রাদোষ। একবার এক ভদ্রলোক তাঁর মায়ের মৃত্যুসংবাদ এক পরিচিতকে জানালে, সে তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে ‘বেশ বেশ, ভালো ভালো’ বলে ওঠায় শোকাহত ভদ্রলোক চরম ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে রীতিমতো অসভ্য তকমা দিয়ে আজীবন সযত্নে এড়িয়ে চলেছেন।

হাসি হল আক্ষরিক অর্থেই দু’দিকে ধার দেওয়া তরোয়ালের মতো। যেদিকেই কোপ মারো, সেদিকেই কাটে। এই আপদ কাটাতে ছেলেটা মাঝেমধ্যেই ঘরের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে মুখে একটা গুরুগম্ভীর, ‘ডন’ গোছের ভাব আনতে। কিন্তু প্রতিবারই চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে। জোর করে মুখ গোমড়া করতে গেলে হাসিটা যেন আরও বেশি প্রকট আর উৎকট হয়ে ওঠে। মনে মনে সে বহুবার ভেবেছে, এর একটা জোরদার বিহিত হওয়া দরকার। ভাবল, চোখে কালো চশমা পরলে হয়তো চোখের ওই হাসি-হাসি ভাবটা ঢাকা পড়বে। সেই চেষ্টাও মাঠে মারা গেল। অনভ্যাসের চন্দন ফোঁটায় যেমন কপালের চামড়া চড়চড় করে, সারাক্ষণ কালো চশমা পরে থাকায় তারও তেমন হাঁসফাঁস অবস্থা। গোটা পৃথিবীটাকে অকারণেই বড্ড বেশি অন্ধকার আর গুমোট লাগতে শুরু করল। তখন মনে হল, বাবা থাক, অন্ধকারের ওই বিপদের চেয়ে আমার এই ‘আপদ হাসি’ ঢের ভালো!

ভোটের বাজারে সমস্ত ভোটপ্রার্থী সকাল থেকে রাত অবধি পাড়ায় পাড়ায় যে যার নিজস্ব হাসির স্টক বিলিয়ে গিয়েছেন, এখনও যাচ্ছেন। এই বাজারে হাসতে হাসতে চোয়ালের কবজা ব্যথা হয়ে গেলেও তাঁদের কিছু করার নেই। ভোটে একবার জিতে গেলে ওই সামান্য চোয়াল ব্যথা তো তখন নস্যি! ভোটে জিতে গদিতে বসার পর আবার পাবলিককে দেখানোর জন্য অন্য মেজাজের হাসির পসরা বের করতে হবে। হাসি জিনিসটা দাবা খেলার মতো, যখন যেমন চাল, তখন তেমন মুখের পেশির ব্যবহার- এই সূক্ষ্ম অঙ্কটা রপ্ত করতে হয়। ছেলেটা কোনওমতেই বুঝে উঠতে পারে না, তার এখন ঠিক কী করণীয়? ওর আবার একটা সুপ্ত বাসনা আছে, ভবিষ্যতে একজন জাঁদরেল রাজনৈতিক নেতা হওয়ার। তার জন্য তো পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসতে জানাটা প্রাইমারি কোয়ালিফিকেশন! সারাক্ষণ এমন দাঁত বের করে হেসে গেলে তো হাসির গুরুত্বই মাঠে মারা যাবে।

অবশেষে মনস্থির করে ফেলল, কোনও পাড়ার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে এর একটা এসপার-ওসপার করতেই হবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। একদিন সটান পাড়ার ডাক্তারের কাছে গিয়ে তার যাবতীয় দুঃখের কথা খুলে বলল সে। সব শুনে ডাক্তারবাবু অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে, নিজেই হঠাৎ ফিক করে একটু হেসে দিলেন। ছেলেটার তো তখন কেঁদে ফেলার জোগাড়। নিজের চেহারাটা তার কাছে এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে, প্রয়োজনে সার্জারি করতেও সে পিছপা নয়। ডাক্তারবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘আরে ভাই, হাসি তো অনেক রকম হয়। তোমার হাসি তো তেমন কিছু খারাপ নয়! আর সারাক্ষণ মুখে একটা হাসি-হাসি ভাব লেগে থাকা মোটেও খারাপ কিছু নয়। এতে চট করে কেউ তোমার ওপর রেগে যাবে না, তোমাকে গালাগালিও দেবে না। এই ভেজাল দুনিয়ায় এরকম একটা অমূল্য হাসি তুমি মিছিমিছি নষ্ট করতে চাইছ কেন?’ ডাক্তারবাবু যেন রীতিমতো চার্জশিট ধরিয়ে দিচ্ছেন। ছেলেটি মনে মনে ফন্দি এঁটেছিল, অপারেশন করে মুখের দু-একটা স্নায়ু বা পেশি একটু এদিক-ওদিক কেটে জুড়ে দিলেই হাসিটা চিরতরে জাদুমন্ত্রের মতো মিলিয়ে যাবে। ছেলেটি তবুও নাছোড়বান্দা, ‘যে করেই হোক স্যর, কিছু একটা আপনাকে করে দিতেই হবে, না হলে আমার লাইফ বরবাদ!’ ডাক্তারবাবু পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি একটু ভেবে দেখি। এ বিষয়ে আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে বা অ্যানাটমি বইয়ে কী লেখা আছে, সেটা আগে ভালো করে ঘেঁটে দেখি। বিশ্বাস করো, আমার এই প্র্যাকটিসে এমন অদ্ভুত বায়না নিয়ে কেউ কখনও আসেনি। আর আমাদের সিলেবাসেও এই বিষয়ের কোনও উল্লেখ ছিল না। যাই হোক, আমাকে একটু সময় দাও।’ এই বলে ডাক্তারবাবু নিজেই একচোট হো হো করে হেসে নিলেন। আর সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই আজব পরামর্শ বাবদ তিনি কোনও ভিজিটও নিলেন না! ছেলেটিও বুঝল, সিলেবাসে যা পড়েননি, সে বিষয়ে যখন কোনও টোটকাই দিতে পারলেন না, তখন আর কোন মুখে হাত পেতে টাকাটা নেবেন?

তবে এই হাসির চক্করে সবচেয়ে কেলোর কীর্তিটা ঘটল কিছুদিন আগে। সদ্য পাড়ার একটি মিষ্টি মেয়ের সঙ্গে ছেলেটির একটু সখ্য গড়ে উঠেছিল। একদিন পার্কে প্রাতর্ভ্রমণে গিয়ে ছেলেটি দেখল, মেয়েটির হাত থেকে একটি সুগন্ধী রুমাল মাটিতে পড়ে গিয়েছে। একেবারে সিনেমার কায়দায় সেটা মাটি থেকে তুলে মেয়েটিকে দিতেই, সে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে তা গ্রহণ করল। এরপরও বেশ ক’বার টুকটাক দেখা হয়েছে তাদের। দু-এক পশলা কথাও হয়েছে। যখন মনে হচ্ছিল প্রেমটা এবার বোধহয় ফুল স্পিডে এগোবে, ঠিক তখনই হঠাৎ মেয়েটির আর কোনও দেখা নেই। এদিকে ছেলেটির এমন কপাল, সে মেয়েটির ফোন নম্বরও জোগাড় করে উঠতে পারেনি। শেষে অনেক বন্ধুবান্ধব ও সোর্স মারফত সে জানতে পারে এক মর্মান্তিক খবর- মেয়েটির বাবা হঠাৎ করেই মারা গিয়েছেন। কয়েকদিন পর আবার একদিন সেই পার্কেই মেয়েটির সঙ্গে আচমকা দেখা। সুযোগ বুঝে ছেলেটি অত্যন্ত দরদ দিয়ে তাকে সমবেদনা জানাতে গেল। কিন্তু ওই যে, মুখটা সেই হাসি-হাসি! আর তখনই মেয়েটি তার ওই হাস্যরত মুখের দিকে তাকিয়ে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সবার সামনে মুখের ওপর বলে দিল, ‘তুমি একটা নিরেট অসভ্য! ইতর, অভদ্র কোথাকার!’ কথাটা ছুড়ে দিয়েই মেয়েটি হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল।

ছেলেটি তো আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ল! এত দরদ দিয়ে সমবেদনা জানানোর এই ফল? তখনই তার মাথার মধ্যে যেন একটা বালব জ্বলে উঠল। সে বুঝল, তার এই হাস্যরত মুখটাই হল যত নষ্টের গোড়া! অন্তত কারও দুঃখের কথা শোনবার সময় মুখে একটা শোকাহত বা গাম্ভীর্যের ভাব ফুটিয়ে রাখা যে কতটা জরুরি, সেটা হাড়ে হাড়ে টেরটাও পেল। অপমানিত, লাঞ্ছিত ছেলেটির তখন শহিদ ক্ষুদিরামের সেই বিখ্যাত গানের লাইনটা একটু পালটে নিয়ে গাইতে ইচ্ছা করছে- ‘হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে ভারতবাসী!’

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...