পূর্ণেন্দু সরকার ও রাহুল মজুমদার, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি: লক্ষ্য শুধু বিধানসভা ভোট নয়, আরও অনেক দূর। উত্তরবঙ্গের যুবশক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে আমজনতার মধ্যে নিজেদের মতাদর্শের বীজ ছড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করছে আরএসএস (RSS)। তারই প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে ডিসেম্বরে। ১৮-১৯ ডিসেম্বর শিলিগুড়িতে দুটি বৈঠকে হাজির থাকবেন সংঘপ্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)। প্রথম বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বাছাই করা তরুণ-তরুণীকে আরএসএস-এর আদর্শে কাজ করার পাঠ দেবেন তিনি। দ্বিতীয় বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বাছাই করা প্রায় ১৫০ বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাঁর মতবিনিময় হবে। ওই বুদ্ধিজীবীদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগেই পাড়ায় পাড়ায় নিজেদের জনভিত্তি তৈরির কাজ করবে সংঘের আদর্শে উদ্বুদ্ধ তরুণ লিয়াজোঁ টিম।
শিলিগুড়ির অনুষ্ঠানের পরের দিনই একই ধরনের কর্মসূচি রয়েছে কলকাতায়। সংঘের শতবর্ষ উদযাপনের আওতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও এর পিছনে রাজনৈতিক অঙ্ক থাকছেই। রাজনৈতির মহলের মতে, আরএসএস-এর মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার ফল ভোটে গেরুয়া শিবির পাবেই। যদিও আরএসএসের দাবি, এর সঙ্গে রাজনীতি বা বিজেপির কোনও যোগ নেই। সংঘের এক কর্তার বক্তব্য, ‘মোহন ভাগবতজি সংঘের অনুষ্ঠানে আসবেন। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই।’
সংঘ সূত্রেই জানা গিয়েছে, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলা থেকে সংঘের মানসিকতায় বিশ্বাসী এমন বাছাই করা তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেবেন ভাগবত। জেলা স্তর থেকে এই বাছাইয়ের কাজ ইতিমধ্যেই শেষ। ভাগবতের প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার আগে জেলায় জেলায় ওই তরুণ-তরুণীদের সংঘের নেতৃত্বে প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সংঘের এক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, যুবশক্তির ওই প্রশিক্ষণে ৩৫ বছরের বেশি বয়সি সদস্য-সদস্যাদের প্রবেশ নিষেধ। তাঁর ব্যাখ্যা, আমরা যা শেখার, যা দেওয়ার দিয়েছি। এখনও দিয়েই চলেছি। কিন্তু নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এখন থেকেই সংঘের নির্দেশে কাজ করার সময় এসেছে।
মোহন ভাগবতের মতো শীর্ষ নেতার কাছে কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাবেন তরুণ-তরুণীরা? সংঘের ওই নেতা বলছেন, ‘সংঘ এই মুহূর্তে পারিবারিক ও সামাজিক চেতনা বিকাশের উপর নজর দিয়েছে। সপ্তাহে পাঁচদিন নিজের বা পরিচিতের পরিবারকে সময় দেওয়া, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করা, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন ওই প্রশিক্ষিতরা। নিজের ও পরিচিতের পরিবারের যে কোনও সমস্যায় পাশে থাকতে হবে তাঁদের। জনসংযোগের মাধ্যমে সংঘের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে কার্যত নিঃশব্দে। পাড়ার মন্দিরে যাওয়া, লোকজনের সঙ্গে কথা বলা ও পাড়া বৈঠকে মানুষের কথা শোনা বাধ্যতামূলক। কোথায় কারা, কী আলোচনা করছেন তা শোনা এবং সেই আলোচনায় ঢুকে যেতে হবে। আলোচনা যাই হোক না কেন, নিজের মতামতকে কখনোই সংঘের লাইনের বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না। মঙ্গলবার জলপাইগুড়ি শহরে ওই বৈঠকের রূপরেখা তৈরি করতে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসেছিলেন আরএসএস-এর উত্তরবঙ্গের শীর্ষ নেতারা। ওই বৈঠকের পরই এক শীর্ষ নেতা জানান, মোহন ভাগবতের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে বাছাই করা তরুণ-তরুণীদের নিজের মোবাইল নম্বর ও আধার কার্ড দিয়ে অংশগ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংঘ। শিলিগুড়ির শতাব্দী ভবনের মাঠে মঞ্চ করে সভা হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, উত্তরবঙ্গ বিজেপির শক্ত গড়। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচনে কয়েকটি আসনে বিজেপিকে ব্যাকফুটে যেতে হয়েছে। ধূপগুড়িতে বিজেপির বিধায়কের মৃত্যুর পর সেই আসন আর দখলে রাখতে পারেনি গেরুয়া শিবির। কোচবিহারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে হারতে হয়েছে। এই জায়গাগুলিতে নিজেদের লাগাম শক্ত করতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। আরএসএস-এর মাধ্যমে তার ভিত তৈরির কাজ চলছে।
তারুণ্যের পাশাপাশি মেধাও যে আরএসএস-এর টার্গেট তা বোঝা যাচ্ছে তাদের কর্মসূচিতেই। ১৯ ডিসেম্বর শিলিগুড়িতে উত্তরবঙ্গের প্রায় ১৫০ জন বুদ্ধিজীবীকে ডাকা হবে। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসক, অ্যাথলিট, সমাজসেবী, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সফলরা রয়েছেন।

