অভিষেক ঘোষ, মালবাজার: শৈশবে দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছে সে, দারিদ্র পরাজয় স্বীকার করেছে তার মনের ইচ্ছাশক্তির কাছে। তখন থেকেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করছেন মা। আর এখন সেই ছেলে জলপাইগুড়ি জেলার গর্ব। মালবাজারের (Malbazar) রূপায়ণ চন্দ সদ্য প্রকাশিত জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৯৯.০১৯ পার্সেন্টাইল পেয়ে চমকে দিয়েছে সবাইকে (JEE Mains)। চরম দরিদ্রতার মধ্যেও রূপায়ণের অভাবনীয় সাফল্যের কাহিনী এখন অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
মালবাজার শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে দক্ষিণ কলোনিতে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকে রূপায়ণ চন্দ ও তার মা শুক্লা চন্দ। প্রথমে চন্দ পরিবার চালসায় থাকত। পরে মালবাজারে চলে আসে তারা। বাবা নিমাই চন্দের প্রয়াণের পর থেকে ভাড়াবাড়িতে থেকেই শুরু তাদের জীবন সংগ্রাম। মা শুক্লা চন্দ দিনে অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন, আর রাতে রোগীদের দেখাশোনার কাজ করেন। এছাড়াও অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্নার জন্য ডাক পড়ে শুক্লার। রূপায়ণের দিদি নীলাঞ্জনার বিয়ে হয়েছে আগেই। দিদি নীলাঞ্জনাও ভাইয়ের সাফল্যে আনন্দিত।


রূপায়ণ মাল আদর্শ বিদ্যাভবনের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে। রূপায়ণের ডাক নাম ঋজু। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলায় যথেষ্ট ভালো সে। রূপায়ণের ভাড়াবাড়ির ঘরগুলো খুবই ছোট। সেখানেই এক কোণে টেবিলে সাজানো বই, ল্যাপটপ। যদিও নিজের স্কলারশিপের টাকায় ল্যাপটপ কিনেছে সে। এখন রূপায়ণের লক্ষ্য আইআইটিতে পড়াশোনা করে গবেষণা করার। উত্তরাখণ্ডের আইআইটি, রোরকীতে পড়াশোনা করতে চায় রূপায়ণ। সেজন্য এখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স অ্যাডভান্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। আগামী ১৭ মে কলকাতায় তার পরীক্ষা।
আদর্শ বিদ্যাভবন থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রূপায়ণের মোট নম্বর ছিল ৫৮৭। তারপর একাদশে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। প্রায় গৃহশিক্ষক ছাড়াই রূপায়ণ দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির শেষ দিকে একজন গৃহশিক্ষক ছিল তার। জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ছিল না বড় কোনও কোচিং সেন্টারের সহযোগিতা। যেখানে অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে কোচিং নেয়, সেখানে শুধুমাত্র ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার করে তাক লাগিয়েছে রূপায়ণ। রূপায়ণের কথায়, ‘জেইই (মেইন্স)-এ প্রথম প্রচেষ্টায় ৯৮ পার্সেন্টাইল পেয়েছিলাম, দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সেটাই হয়েছে ৯৯.০১৯ পার্সেন্টাইল। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে। সেটা না পেলে স্ট্যাটিস্টিক্সে অনার্স নেব।’ ভালো বেতনের চাকরি করে দরিদ্রতা ঘুচিয়ে তারপর দেশের উন্নয়নে কাজ করতে চায় সে। রূপায়ণের মা শুক্লা চন্দ জানান, ঘরে বসেই বিভিন্ন বই, ইউটিউব দেখে পড়াশোনা করত ছেলে। ঋজুর শুভাকাঙ্ক্ষীরা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।
যদিও সফলতার শুভেচ্ছা জানাতে শনিবার দুপুরে রূপায়ণের বাড়িতে যান মালের বিজেপির প্রার্থী শুক্রা মুন্ডা। শুক্রা রূপায়ণকে মিষ্টিমুখ করান এবং আর্থিক সহযোগিতা করেন। শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মালের সদস্যরা রূপায়ণকে সংবর্ধনা জানান। শুক্রা মুন্ডা জানান, রূপায়ণ চন্দ ডুয়ার্সের গর্ব, ওকে দেখে ছেলেমেয়েরা অনুপ্রাণিত হবে। আদর্শ বিদ্যাভবনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক উৎপল পাল জানান, স্কুলের নাম উজ্জ্বল করেছে রূপায়ণ।

