মৃত্যুদিবসে বিস্মৃত এক বিপ্লবী কবি

শেষ আপডেট:

 

  • বিশ্বজিৎ দত্ত

‘আমার ছিন্ন শির যদি আজ দুর্গপ্রাকারে ঝোলে, ঝুলুক।

তোমরা যারা রইলে এগিয়ে যেও দ্বিগুণ উদ্যমে’

১৯৭১ সালের ৪ অগাস্টের মধ্যরাতে বিরল প্রতিভাধর এক মানুষের পথচলা থমকে যায়। সরোজ দত্তের বিষয়ে এই প্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই। তাঁর লেখা কবিতার বই বাজারে অমিল, এমনকী বইমেলাতেও খঁুজে মেলা দায়।

১৯১৪ সালের ১৩ মার্চ সরোজ যশোরের নারাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের  সময় তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেন এবং ১৯৩৯ সাল থেকে সরোজকুমার দত্ত নামে কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর কবিতায় সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যন্ত্রণার সবসময় ফুটে উঠত। তাঁর কাব্য চেতনার অন্যতম গুণ ছিল শ্রেণিসচেতনতা। নিজে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন। সরোজ তাই মধ্যবিত্ত মানুষিকতার দোদুল্যমান  চরম সুবিধাবাদী চরিত্র বা  চিন্তাধারা সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল ছিলেন। আর তাই লিখে ফেলেছিলেন :

‘বৈশাখের মধ্যদিনে অগ্নিদাহে মূর্ছাতুর আমি

চাহি জল, চাহি ছায়া, চাহি বৃষ্টিধারা,

সকলি আনিবে যবে মহামেঘ কালবৈশাখির

পাতার কুটিরে আমি উৎকণ্ঠায় হব দিশাহারা।’

সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্যবোধ ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জমতে থাকে। এক সময় তিনি সাংবাদিকতা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। নকশালবাড়ি আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক এবং বিপ্লবী সংগঠক চারু মজুমদারের ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালে গঠিত সিপিআই(এমএল)-এর সঙ্গে তিনি যুক্ত হন এবং সেই সময়কার নকশাল আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর কবিতা বিদ্রোহের ভাষ্য, শোষণের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ অস্ত্র হয়ে ওঠে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কবিতা কেবলমাত্র সৌন্দর্যবোধের উপস্থাপনা নয়, বরং শাসনের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক সক্রিয় রাজনৈতিক হাতিয়ার।

তবে বজ্রকঠিন চরিত্রের কবির জীবনে হতাশাও উকি দিত :

‘মাঝে মাঝে মনে  হয় আশা নেই,

আশা নেই কোন

যে রাত্রি এসেছে নেমে সেই রাত্রি রবে চির কাল

ওপারে উঠিবে  সূর্য মেঘ মুক্ত রক্তিম অম্ব্রে

এপারে অনন্ত কাল অন্ধকারে কাদিবে কঙ্কাল।’

১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট গভীর রাতে পুলিশ তাঁকে  কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করে, পরদিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট ভোরে তাঁর গোপন হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলে বহু মানবাধিকার সংস্থা দাবি করে। তাঁর দেহ আজও পাওয়া যায়নি, এবং সরকারিভাবে তাঁর মৃত্যু কখনো স্বীকৃত হয়নি। সরোজ দত্তের এই নিঃশব্দ হত্যা আজও ভারতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। তাঁর মৃত্যু যেমন ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রতিচ্ছবি, তেমনই তাঁর জীবন ছিল একটি বিকল্প পথের সন্ধান—যেখানে কবিতা এবং রাজনীতি হাতে হাত রেখে চলত। সরোজ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর কবিতা ও আদর্শ আজও অনেক তরুণ মনকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির কবি, যিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ বদলানোর স্বপ্ন দেখতেন এবং সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করে নিজের জীবনও ত্যাগ করেন। তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন কবিকে স্মরণ করা নয়, বরং এক সংগ্রামী চেতনার প্রতীককে সম্মান জানানো।

(লেখক প্রাবন্ধিক, শিলিগুড়ির বাসিন্দা)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...