সেবন্তী ঘোষ
উদ্বাস্তু, বরিশালী বড়মামা ছিলেন স্বল্পবাক এবং আদ্যন্ত কেজো মানুষ। ছুটিতে মামার বাড়িতে অল্প বয়সের আস্ফালনে তখন বিদেশি নারীবাদী থিয়োরির ‘নেম ড্রপ’ চালাচ্ছি এবং এঁড়ে বাছুরের মতো ঢুসো মারা তর্ক চলছে। বড়মামা যে তাঁর কাজের ফাঁকে এসব বালখিল্য বাক্যাবলি শুনছেন, খেয়াল হয়নি। হেসে বললেন, ‘যা বলছিস আমরা বুঝি সব। কিন্তু সেসব মানলে আমাদের অসুবিধা, তাই বুঝিনি এমন ভাব করি।’


তত্ত্ব না জানা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পরিবারের কর্তার মুখে কথাগুলি শুনে বোধোদয় হয়েছিল যে, সাধারণ মানুষের কাছে তর্ক জাল বিস্তার করা বা না করার মধ্যে কোনও তফাত নেই। মানুষ দিব্য বোঝে। সুবিধা যেখানে সাড়ে নিরানব্বই ভাগ, মানুষ সেখানে। ঠিক এখান থেকেই নারী দিবসে একটা খোঁচা উঠে আসে। একি সুবিধাবাদ, না সমতার অধিকার? আমরা সুবিধাপ্রাপ্তরা কি আরও সুবিধা চাইছি? স্বেচ্ছাচার ও স্বাধীনতার মধ্যে এক চুল সুতোটা কি আমরা মেয়েরা ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছি? এই যে সদ্য অতিক্রান্ত বসন্ত উৎসব থুড়ি দোল রঙের ফুর্তির দিন অজস্র নেশাগ্রস্ত মেয়েকে দেখলাম ফুটপাথে থেবড়ে বসে আছে, টাল খাচ্ছে দিনে-দুপুরে, অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে, একে কোন স্বাধীনতার বোধ দিয়ে ধরব? এই দৃশ্য চিরকাল ছেলেদের মধ্যেই দেখা যেত। নিম্নবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মেয়েদের এই স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্য চিত্তে এমন দুরন্ত সংস্কারহীন বিপ্লব দেখা দিল কীভাবে? এই আগলহীন, যা ইচ্ছে তাই স্বাধীনতাই কি চেয়েছিলাম আমরা? সারা বছর ধরে নানা বিশিষ্ট ঘটনার জন্মদিন পালন হয়। আজ নারী দিবসের জন্মদিনে এই প্রশ্নগুলো সাধারণ জনগণের মধ্যে উঠবেই।
শুধুই এক ধরনের ‘পিঙ্ক ওয়াশিং’?
প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনে নারী-অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের কথা উচ্চকিত হয়ে ওঠে। নানা সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট দুনিয়া নারী দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রচার চালায়, বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে, গোলাপি রঙে শহরকে সাজায়। কিন্তু এই উদযাপনের মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমশ সামনে এসে পড়ছে- এই উদযাপন কি সত্যিই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, নাকি এটি অনেক সময় শুধুই এক ধরনের ‘পিঙ্ক ওয়াশিং’?
পিঙ্ক ওয়াশিং বলতে বোঝায় এমন এক প্রচার কৌশল, যেখানে নারী-সমর্থনের ভাষা ব্যবহার করে কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে, অথচ বাস্তবে সেই সমর্থনের গভীরতা খুব বেশি থাকে না। নারী দিবসে বহু কোম্পানি ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়, বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে, বা কর্মক্ষেত্রে নারীদের সম্মান জানায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে- সারা বছর তাদের কর্মক্ষেত্রে নারীরা কি সমান মজুরি পান? মাতৃত্বকালীন ছুটি বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ কি সত্যিই নিশ্চিত করা হয়?
গৃহশ্রমের মূল্যায়ন
নারী দিবসের আরেকটি বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে অদৃশ্য গৃহশ্রমকে ঘিরে। সমাজে নারীরা ঘরের কাজ- রান্না, সন্তান লালনপালন, বৃদ্ধদের দেখাশোনা, সংসারের নানা দায়িত্ব- নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করে চলেন। এই কাজগুলো অর্থনৈতিক পরিমাপে ধরা পড়ে না, কিন্তু একটি পরিবার ও সমাজের স্থিতি বজায় রাখতে এগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শ্রমকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা হয়, শ্রম হিসেবে নয়। এই প্রশ্নটি মাঝেমধ্যেই উঠে আসে- গৃহশ্রমের মূল্যায়ন কি আমরা সত্যিই করছি? এত বছরের শিক্ষক হিসেবে দেখেছি, যখন অভিভাবকদের মধ্যে মা দেখা করতে আসেন, ‘আপনি কি করেন?’ জিজ্ঞেস করলে অনেকেই সংকোচের সঙ্গে বলেন, ‘কিছুই করি না’। কত বড় একটা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন অথচ সমাজ পরিবার মাথায় গেঁথে দিয়েছে যে তাঁরা গৃহবধূ, তাঁদের অপর্যাপ্ত সময়, বরের উপার্জন বসে শুয়ে ধ্বংস করেন। এর চেয়েও জটিল অবস্থা চাকরিরতাদের গৃহশ্রম। তাঁদের বাইরের জগতের উপার্জন সংসার গ্রহণ করে, তার সঙ্গে গৃহবধূর কাজটিও যুক্ত হয়। বাড়ির কাজ করতে না পারলে তাঁরা নিজেরাও অপরাধবোধে ভোগেন। এসব বহুস্তরীয় অবস্থার মধ্যে মেয়েদের মধ্যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা ফোনের মাধ্যমে যথেচ্ছ এবং সহজ সংযোগ স্থাপন। সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মেয়েদের মধ্যে একটা বন্ধ বোতলের ছিপি খুলে গিয়েছে। তারা আর নীতিবাগীশ জ্যাঠাপুলিশদের গ্রাহ্য করছে না। স্বাধীনতার প্রাথমিক অভিঘাত কিঞ্চিৎ অপ্রকৃতিস্থ হয়। আশা করা যায় ভবিষ্যতে সেটি নিশ্চয়ই সুস্থির হবে। ‘যা ইচ্ছে তাই’–এর পরের ধাপটি খুঁজে নিতে হবে তাঁদের।
বিপণনের কৌশল
আরেকটি জটিল বিষয়- মার্কেটিং টুল হিসেবে নারীর ব্যবহার। আধুনিক বিজ্ঞাপন ও বিপণন কৌশলে নারীকে প্রায়ই আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারী দিবসকে ঘিরে বিশেষ পণ্য, বিশেষ অফার, গোলাপি রঙের প্রচারণা- সব মিলিয়ে একটি বাজার-চালিত উৎসব তৈরি হয়। এতে নারীকে কখনও ‘ক্ষমতায়নের প্রতীক’ হিসেবে, কখনও আবার সৌন্দর্যের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এর ফলে কি সত্যিই নারীর সামাজিক অবস্থান বদলায়, নাকি এটি কেবল বাজারের কৌশল? এই প্রসঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে- নারী দিবস কি শুধুই শহুরে মধ্যবিত্তের উদযাপন হয়ে উঠছে? গ্রামাঞ্চলের নারী, কৃষিশ্রমিক, গৃহপরিচারিকা- তাঁদের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো কি এই উদযাপনের কেন্দ্রে আসে? তবে এর মানে এই নয় যে, নারী দিবসের গুরুত্ব নেই। বরং এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে- সমতার পথে আমরা কতদূর এগোলাম এবং কতটা পথ এখনও বাকি। নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। এই দিনে আমাদের উচিত সমাজের সেই অদৃশ্য বৈষম্যগুলিকে সামনে আনা, যেগুলো প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
অতএব, নারী দিবস আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়- আমরা কি সত্যিই নারীর সমতা চাই, নাকি আমরা শুধু তার উদযাপনের ছবি দেখতে ভালোবাসি? যখন সমাজ এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হতে সাহসী হবে, তখনই নারী দিবস সত্যিকার অর্থে একটি অর্থবহ দিনে পরিণত হবে।
(লেখক সাহিত্যিক)

