সায়নদীপ ভট্টাচার্য, বক্সিরহাট: যিনি রাঁধেন, তিনি চুলও বাঁধেন। এই আপ্তবাক্যটি প্রমাণ করছেন কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের (Tufanganj) সীমারা। মহিলাদের স্বনির্ভর করে তুলতে দিশা দেখাচ্ছেন ওঁরা। সংসার সামলে চরকা ঘুরিয়ে তাঁত বুনছেন সীমারা। ওঁদের হাতের কারুকার্যে ফুটে উঠছে উত্তর-পূর্বের জনপ্রিয় মেখলা, ডোকনা। তাঁদের প্রচেষ্টায় আজ স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে অনেকেই।
এক সময় তুফানগঞ্জে তাঁতের তৈরি শাড়ি, গামছা, চাদরের চাহিদা ছিল ব্যাপক। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে সেসব সামগ্রী যেত। তবে সেসব দিন এখন ফুরিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অসমের পোশাক মেখলা, ডোকনা তৈরি করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি সীমা, মামণিদের মতো অনেকেই। ওদের হাতে ফুটে উঠছে অসমের ঐতিহ্যবাহী পোশাক মেখলা। এই শাড়ির এতদিন মূলত অসমে সীমাবদ্ধ হলেও ফ্যাশন ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বাংলার মেয়েরাও এখন এই শাড়ি পরতে পছন্দ করেন। আর সেই মেখলা নিজে হাতে বোনেন বক্সিরহাটের সীমা, মামণি, সুমনারা। তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের মহিষকুচি -১ গ্রাম পঞ্চায়েতের বালাবাড়ি এলাকার সীমা মোদক সাহা দীর্ঘ এক দশকের অধিক সময় মেখলা শাড়িতে সুতো বোনার কাজ করেন। তাঁর হাতে প্রশিক্ষণ পেয়ে কাজ করছেন অনেকেই।


এলাকার তাঁতশিল্পীরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট বাজার গড়ে না ওঠায় পরবর্তীতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বন্ধ হতে থাকে তাঁতকলগুলি। বাধ্য হয়ে অনেকেই ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে যোগ দেন। আবার অনেকেই বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। আবার অনেকেই তাঁতের শাড়ি, গামছার বদলে মেখলা, ডোকনা তৈরি করছেন।
কী এই মেখলা? এই শাড়ি কখনও ছাপা হয় না। সব সময় তার গায়ে নকশা বোনা হয়। শাড়িতে ফুটে ওঠে বিভিন্ন কারুকার্য। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি শুরু করেন সুতো বোনার কাজ। পুরুষ কারিগরদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই কাজ শিখে সীমা এখন একা হাতেই মেখলা বানাতে পারদর্শী।
সীমার কথায়, ‘একটু ভালো মানের ও দরের মেখলা তৈরিতে একজন কারিগরকে অন্তত দু’দিন সময় দিতে হয়। প্রতি সপ্তাহে আমার থেকে ২৮-৩০টি মেখলা কেনেন পাইকাররা। দাম থাকে চার থেকে পাঁচ হাজারের আশপাশে।’
সীমা এই কাজ শিখিয়ে তিনি স্বাবলম্বী করে তুলেছেন মামণি দাস, সুমনা দে’র মতো গ্রামের বেশ কয়েকজন মহিলাকে। মামণির কথায়, ‘মেখলায় সুতোর সূক্ষ্ম নকশা তোলার কাজে ধৈর্য প্রয়োজন। সীমার থেকে আমরাও তাঁতের কাজ শিখেছি। নিজে হাতে একটা মেখলা শাড়ি বোনা মুখের কথা নয়।’

