ডুবুরি

শেষ আপডেট:

  • রিমি মুৎসুদ্দি

শীতকালে বিশের কাজ করতে সুবিধা হয়। লাশ জলের ওপরে ভেসে ওঠে। এখন এই গরমের সময়ে জল বড় বেশি ঘোলা। মেয়েছেলেটা গঙ্গার কোন খাঁজে যে ঢুকে আছে? চারদিন ধরে গোরুখোঁজা খুঁজেও ওরা কেউই পায়নি।

শোভাবাজার ঘাট বিশের জন্য খুব পয়মন্ত। ওখান থেকে কাজ শুরু করলে কিছু না কিছু প্রাপ্তি ওর কপালে জুটে যায়। কেবল নন্দর শরীরটা তুলে আনার পর ওর মায়ের ওই চিৎকার করে মূর্ছা যাওয়া দেখে বিশের কঠিন প্রাণও সেদিন আর পয়সা চাইতে পারেনি। নিমতলা থানার সুবীরবাবুকে মনে করিয়ে দিলেও বলে,

-‘পার্টি পয়সা দেয়নি। তোদের দেব কোথা থেকে? আমার পকেট থেকে?’

সুবীরবাবুকে ঘাঁটাতে বিশের সাহস হয় না।

জলে নেমে বিশের মনে হল কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? চারদিন হয়ে গেল লাশের টিকিও মিলল না? এইবারের পার্টি বেশ মালদার। ওদের পনেরোশো দেবে বলেছে। তরুণী মেয়ের লাশ। স্বামীটাও অল্পবয়সি। স্বামীটা রোজ এসে ঘাটে বসে থাকে। বিশুর মনে হত লাশটা পেলে লোকটা হয়তো ইনসুরেন্সের অনেক টাকা পাবে। লাশ না পেলে লোকটার পুরো টাকাটাই মার যাবে?

জলের আরও একটু গভীরে যেতেই ওর প্রায় গা ঘেঁষে একটা শাল মাছ চলে গেল। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে বিশু আজ। সেবার ওদের দলের চঞ্চলকে এরকমই একটা বড় শাল কাঁটা মেরেছিল। একেবারে চোখ নাক টিপ করে কাঁটা! সেপটিক হয়ে ওর চোখের সামনেই চঞ্চল মারা গেল। বিশু বিড়বিড় করে বলল,

-‘আরে শালা! বহুত জোর বেঁচে গেছি আজ। মা গঙ্গার কিরপা।’

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপে বলল,

-‘চঞ্চলদা এখনই আসছি না তোমার কাছে। আমার হেবি কাজ বাকি আছে।’

দূর থেকে একটা লঞ্চকে ওর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে বিশু বাগবাজারের দিকে সাঁতরাতে শুরু করল। মনে মনে বলল,

-‘শালা, আজ দিনটাই মাইরি হেবি খারাপ। শালের কাঁটা থেকে বাঁচলাম তো জাহাজের প্রপেলার আসছে। একেবারে দুই নয় চার টুকরো করে ফেলবে।’

দ্রুত সাঁতরাতে গিয়ে মুখে জল চলে গেল ওর। একদলা থুতু জলের মধ্যে ফেলে বলল,

-‘কেন রে মা? এমন করিস কেন? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস মেয়েটারে? আজ এনে দে। তোর পায়ে পড়ি। একটা কাঁচা টাকা দেব তোর বুকে। বাবারে সিদ্ধি বেটে দিয়ে সোহাগ করিস?’

জাহাজটা শোভাবাজার ঘাটের দিকেই যাচ্ছে। বিশুর সাঁতারের অভিমুখ বাগবাজারের দিকে। সাবির অসুখটা বাড়লে বিশু গঙ্গার কাছে এরকমই মানত করে। এক টাকায় সিদ্ধি পাওয়া যায়। সেই টাকায় সিদ্ধি কিনে মা গঙ্গা শিবকে বেটে খাওয়াবে। আর স্বর্গের সুখ ছেড়ে সিদ্ধির টানে মর্ত্যের কাদা মাটি ঘোলাজলে নেমে আসবে শিব। এমনই বিশ্বাস বিশুর দাদির।

সেই কোন ছোটবেলা দাদির কাছে শিবগঙ্গার প্রেমকাহিনী শুনেছিল বিশু। শিব গঙ্গাকে নিয়ে এসেছিল দেবতাদের কোনও এক উৎসবে রান্না করার জন্য। গঙ্গার স্বামী বলেছিল, যদি সূর্যাস্তের আগে গঙ্গা ঘরে না ফেরে তাহলে বৌকে আর ঘরে রাখবে না। দেবতাদের উৎসব কি মুখের কথা? গঙ্গা রান্নাবান্না সেরে সব কাজ গোছাতে গোছাতে এত দেরি করে ফেলল যে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। শিব গঙ্গাকে ফিরিয়ে দিতে এলে তাঁর স্বামী কিছুতেই ঘরে নেবে না। শিব তখন তাঁর জটায় গঙ্গাকে আশ্রয় দিলেন। তারপর আবার ঘরের বৌ দুর্গার জন্য রাখতেও পারলেন না। জটা খুলে মর্ত্যে ভাসিয়ে দিলেন গঙ্গাকে।

সাবির সঙ্গে বিশু যখন থাকে ওর মনে হয় সাবিও গঙ্গার মতোই পুরুষ সঙ্গের আশায় এমন চাতকের মতো অপেক্ষা করে। চামেলি পদ্মা রোজি আমিনার মতো যে কোনও পুরুষ সঙ্গতেই সাবি আনন্দ পায় না। ওটা ওর পেটভাতা। ওতে ওর শরীরে এই গঙ্গার মতোই কাদাপাঁক নোংরা থুতু কফ পেচ্ছাপ জমতে জমতে শ্যাওলা আর পচা পাঁক হয়ে যায় ভেতরটা।

সাবির জীবন এত ছোট হয়ে এল যে সেখানেও এই গঙ্গার মতোই পাকের শুরু নেই শেষও নেই। বিশু তবুও চায় ও একাই একদিন সব ঠিক করে দেবে।

ওর চাওয়া আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক অনেকখানি বেড়ে গেলে বিশু আর হরির দোকানে লাল চা ডিম টোস্ট খেয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। ভোর থাকতে গঙ্গার ঘাটে চলে আসে। কাদামাটির ফাঁকে মানুষের ফেলে যাওয়া পয়সা কুড়ায়। সাবির বুকে যে ভয়ানক অসুখ জমেছে তার চিকিৎসার এক অংশও সেই কুড়ানো পয়সায় সম্ভব নয় জেনে আবার ডেনড্রাইটের নেশা করে সাট্টার ঠেকে যায়। ডাক্তার বলেছে,

-‘ব্রেস্ট ক্যানসার এখন সম্পূর্ণই সেরে যায়। তবে দেখতে হবে আর কী কী অসুখ জমেছে। খরচ আছে কিন্তু সেরে যাবে।’

কোথা থেকে পাবে বিশু খরচের টাকা?

বাগবাজার ঘাটে সন্ধ্যা আরতির পর বিশু তখন জলে নামতই না। সুবীরবাবু বকশিশের কথাটা নিজে মুখে বলায় ও নেমেছিল। লাশ খুঁজে দিয়ে বকশিশ ছাড়াও একটা কানের সোনার দুল ও পেয়েছিল। সেদিন সাবির ঘরে বসে লাল লাল খাসির মাংস দিয়ে ভাত মেখে খেতে খেতে ও সাবিকে নিয়ে ঘর বাঁধবে কথা দিয়েছিল। এমন আরও অনেক কথা ও সাবিকে দিয়েছে। ওকে চিকিচ্ছে করিয়ে সুস্থ করে তুলবেই। সাবি বাঁচতে চায়। আবার কাঁদেও।

সাবি মাথা নীচু করে। বিশু সেদিন ভাতের গরাস ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করে

-‘তোর এই রোগ আমি সারাবই। আর কিছু দরকার নেই। তুই পাশে থাকলেই আমার সুখ। আমার শরীর মন সব জেগে থাকবে।’

সাবি আবার হাসে। বলে,

-‘নন্দা বলছিল তুই আর বিশু এ যুগের রাধা আর কেষ্ট ঠাকুর।’

বিশু হাসে না। কেবল শুধরে দেয়,

-‘না। শিবগঙ্গা।’

বাগবাজার ঘাটের দিকেই প্রায় চলে এসেছে ও। আজ এত বেশি সাঁতার কেটেছে যে হাত-পাগুলো কেমন অবশ লাগছে। জলের বেশি তলায় চলে আসেনি তো ও?

বিশু জানে জলের তলায় চাপ এত বেশি যে নাক মুখ দিয়ে এখুনি রক্ত বেরাবে। ও অজ্ঞান হয়ে যাবে। আর চার মিনিটেই মারা যাবে। তাড়াতাড়ি উপরের দিকে চলে আসে। কীসে যেন পা ঠেকল। একটা ভারী কিছুই হবে। একটু ঝুঁকে পড়ে দেখল শক্ত কাঠ হয়ে যাওয়া একটা মানুষের পা। নীচের দিকে নয় ওর এখন উপরেই উঠে আসা উচিত। তবুও মানুষটার শরীর ওকে টানছে। বিশু প্রথমে বুঝতে পারল না এটা একটা মেয়ে মানুষের শরীর না ব্যাটাছেলের। মুখটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। চেনা যাচ্ছে না। সৌমিতবাবু সেদিন সন্ধ্যাবেলায় হরির চায়ের দোকানে এসে কান্নাকাটি করছিলেন। বলেছিলেন,

-‘ভাই, পুলিশ যেমন খুঁজছে খুঁজুক। তুমি পুলিশের তরফ থেকে কী পাবে আমি জানি না। বিদিশাকে খুঁজে দিলে আমি নিজে তোমাকে বাড়তি টাকা দেব। ওর বাড়ির লোক বলছে আমিই খুন করেছি বিদিশাকে। আমিই ওকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছি। সে যে যা বলে বলুক। থানা পুলিশ কোর্ট জেল যা হয় আমার হোক। বিদিশাকে খুঁজে পেতেই হবে। ও আমাকে বাপের বাড়ি যাবে বলে বেরিয়ে এরকম লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিল কেন এর উত্তর আমাকে জানতেই হবে।’

বিশু ভেবেছিল উত্তর দেয়,

-‘মরা মানুষের কাছে উত্তর কী করে পাবেন বাবু?’

ওর উত্তর দেওয়ার আগেই সৌমিতবাবু বললেন,

-‘পাঁচ বছরে ওকে আমি ছেলেপুলে দিতে পারিনি। দুজনেই কতবার পরীক্ষা করালাম। ডাক্তার বলছে, দুজনেরই সব ঠিক। বিদিশা বলল, ওর বাচ্চাকাচ্চার প্রয়োজন নেই। শুধু আমি থাকলেই ওর সব। আমিও কি একইভাবে ভাবতে পারতাম না? অফিসে পারমিতা কত রকমের ইশারা করত। কোনওদিন সাড়া দিইনি। সেবার আমার অন্যমনস্কতায় লেজারে বিরাট ভুল করে ফেললাম। পারমিতাই সব ঠিক করল। বসের সঙ্গে ওর অন্যরকম সমঝোতা। পারমিতা আমার চাকরিটা বাঁচিয়ে দিল। তাই ওর চাহিদা পূরণ করতেই সেদিন দুপুরে বাড়িতে ডেকেছিলাম ওকে। সৌমিতা এই সময়ে স্কুলে থাকে। ও যে হঠাৎ করে ফিরে আসবে আর ওর কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ওই দৃশ্য…’

দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে সৌমিতবাবু বলেছিল অনেক কথা।

বিশু লাশটার গায়ে জমে থাকা শ্যাওলা দেখতে পেল। ওর মনে পড়ল, সেদিন সৌমিতবাবুর হাবভাব ভালো লাগছিল না। বিশুর সঙ্গে খুঁজবে বলে জলে নামতে চাইছিল বারবার। বুকে সাহস আনতে ওর থেকে একটা পুরো বাংলার বোতল কিনে নিয়েছিল। বোতলটা অবশ্য ধারে হরির কাছ থেকে ওর নেওয়া।

সেদিন সাবি আর সৌমিতবাবুকে একইরকম অসহায় মনে হচ্ছিল বিশুর। দুজনেই পেটের জন্য…

বিশু দেখতে পেল লাশটার হাতে ওর দেওয়া সেই বাংলার খালি বোতল! ও চমকে উঠল। আর নীচে নামতে পারছে না ও। এবার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। উপরে ওকে উঠে আসতেই হবে। বিশু অনুভব করল ওর নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।

জ্ঞান ফিরলে দেখল, ও বাগবাজার ঘাটের মেঝেতে শুয়ে। ওকে ঘিরে যারা আছে তাদের মধ্যে ভোলা হরি সুবীরবাবু ও আরও অনেককেই ও চিনতে পারল। কিন্তু নিমেষে মুখগুলো সব ঘোলাটে লাগছে। পেটের ভেতরটা কেমন গুলিয়ে আসছে। বমি করতে পারলে ভালো হত। চোখ দুটো প্রাণপণ খোলার চেষ্টা করছে ও। দু’চোখের পাতায় যেন আঠা জড়ানো। সৌমিতবাবু আর ওঁর বৌয়ের লাশ দেখেও ও তোলেনি। সে কি কেবল সৌমিতবাবুর বৌয়ের গলার সোনার হারটুকুর লোভে? হ্যাঁ, লোভ ওর আছে। কিন্তু হারটা নিলেও ওর লোভ হারের প্রতি নয়। সাবিকে ভালো করে তুলবে বলে লাশ দুটো না তুলে কেবল হারটাই টেনে তুলতে অত নীচে ও ডুব দিয়েছিল।

চোখের পাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার আগে সাবির মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে ওর। অথচ ওর চোখের সামনে একটা শ্যাওলা মাখা পোকায় খাওয়া লাশ আর তার গলায় চকচক করছে একটা সোনার হার। বিশে ডুবুরি আর কিছুই দেখতে পেল না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Sabyasachi Bhattacharya
Sabyasachi Bhattacharyahttps://uttarbangasambad.com/
Sabbyasachi Bhattacharjee Reporter based in Darjeeling district of West bengal. He Worked in Various media houses for the last 23 years, presently working in Uttarbanga Sambad as Sr Sub Editor.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...