সেবন্তী ঘোষ
ওই যে বেডের মধ্যে দেখছিস কমলা, বেগুনি, হলুদ, সাদা, মভ রঙা সন্ধ্যামালতী, ওরা একই জাতির ভিন্ন রঙের ফুল। ওদের নাম রেখেছি মিরো। গাঁদা, ডালিয়াগুলো কান্দিনস্কির ‘কালার্স স্টাডি’ ছবি থেকে উঠে এসেছে মনে হচ্ছিল। তাই ওদের নাম শিল্পীর নামে ভাসিলি। সূর্যমুখীর নাম যে ভ্যান গঘ হবে সেটা তো বুঝতেই পারছিস? আর পুরো বাগানটার ওই নীল, বেগুনি ফুলে ভরে থাকা, ক্লদ মোনের ছবির কথা মনে পড়িয়ে দেয়, তাই নাম রাখলাম মোনে। গোরুর জাবনা খাওয়ার চাড়ি কিনে ছোট পদ্ম বসিয়েছি, নাম রামচন্দ্রন। ওহো, তোরা তো আবার বিদেশি নাম না বললে, ছবি চিনতে পারিস না। একবার গিয়ে রামচন্দ্রনের অসাধারণ ছবিগুলো দেখে নিস। দিয়া একটানা কথাগুলো বলে থামল।
শ্রমণ এই এত বড় হাঁ করার বদলে বলল, অন্য কেউ এই নামকরণে চমকে যেতে পারে কিন্তু আমি এতদিনে তোদের গুষ্টিসুদ্ধ চিনি। তোর বাবা নিজের পার্টির এক নেতার নামে তোদের নেড়ি কুকুরের নাম রেখেছিল।
দিয়া প্রতিবাদ করে বলে, ওই কুকুরটা মোট ছ’জনকে কামড়েছিল। আর ওই লোকটার নামে তোলাবাজির মামলা ছিল। পার্টির মধ্যে গণতন্ত্র নেই বলে তখন ওটাই বাবার অস্ত্র হয়ে গেল।
শ্রমণ বলে, সুবিধাও হয়েছিল। খোকা, মিঠু, বুড়ো এমন নাম হলে ছেলেমেয়ে যে কাউকে মনে করা যেতে পারে। ওই নামে ডাকলে যে কেউ সাড়া দেবে ফলে ওই খোকা মিত্তির কিছু বলতেও পারেনি, তাই না? বাঙালির তো ঘরে ঘরে বুড়ো ধাড়িরাও খোকা!
দিয়া এবার একটু বিমর্ষভাবে হাসে। বলে, মুশকিল হয়েছিল রে। শুধু খোকা নাম দিলে ঠিক ছিল, কিন্তু কুকুরটার নাম ছিল খোকা মিত্তির। মানে সরাসরি পদবিসুদ্ধ নাম দিয়েছে বাবা। সেই কুকুর খোকা, মানুষ খোকাকেই ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিল।
এইবারে শ্রমণ হাঁ হয়ে গেল। বলে, ওরে বাবারে! এ তো একেবারে ওটিটি সিরিজ?
দিয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। বলে, খোকা কাকু ভোট প্রচারে তখন বাড়িতে একটা দলবল নিয়ে আড্ডা মারতে এসেছে। হেভিওয়েট নেতা, ফলে বাবা কিছু বলতেও পারছে না। এ বাড়ির কুকুরের নামকীর্তন শুনেই এসেছিল মনে হয়। প্রথমটা ঠিক ছিল, কিন্তু পাকামো মেরে ‘খোকা খোকা’ করে ডাক দিল। খোকা আসে না। এবারে বাবা হঠাৎ করে ডেকে বলেছে, ‘খোকা মিত্তির’ বলে ডাকুন। মা প্রায় লাফিয়ে মুখ চাপতে যায় কিন্তু ওর মধ্যেই মানুষ খোকা মিত্তির, কুকুর খোকা মিত্তিরকে দাঁড়িয়ে উঠে নাটকীয় ভঙ্গিতে ডাকতে শুরু করল। দলের লোক তটস্থ। বাইরের লোক বিশেষ করে একেবারে অচেনা লোকের কমান্ড পোষা কুকুর পছন্দ করে না। তায় খোকা কাকু হাতে একটা বিস্কুট নিয়ে ওপরে নীচে দোলাচ্ছে। ধারণা নেই, নেড়ি কুকুরও মানমর্যাদা পেলে মানুষের চেয়ে নির্ভীক। কুকুর খোকা মিত্তির এবারে সোজা এসে চার্জ করল মানুষ খোকাকে। খোকা কাকু শক্ত কাপড়ের প্যান্ট পরে ছিল। কুকুরে মানুষে মোটা প্যান্ট ধরে সে এক অদ্ভূতুড়ে টানাটানি! একটা সময় দুজনেই গোল হয়ে ঘুরছে। মা আর বাবা, ‘এই যে খোকাদা, এই যে খোকা মিত্তির, এই যে খোকা, ওই যে মিত্তির’- এইসব করে যাচ্ছে। টেনশনে গুলিয়ে যাচ্ছে কাকে কোন নামে, কেমন সম্বোধনে ডাকবে। বহুকষ্টে কচি কুকুর খোকা, ধেড়ে মানুষ খোকাকে ছেড়ে দিল। মানুষ খোকা হালকা মতো কামড় তো খেলই, সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে ওর এক চ্যালা বাবার নামে কেস ঠুকল। সম্মানহানি, ভাবমূর্তির অবমাননা! বাবা গজরাচ্ছে, লম্পট, মাতাল! নর্দমার ধারে পড়ে থাকত, পাব থেকে বাউন্সার মেরে বের করে দিয়েছে, তার আবার সম্মান!
প্রথমে খানিকটা গম্ভীর হয়েছিল, কিন্তু এবারে শুনতে শুনতে হাসছিল শ্রমণ। বলল, কতদিন চলল কেস? তারপর কাকুকে সাল্টানো হল কীভাবে?
দিয়া বলে, তারপরে বাধ্য হয়ে বাবা জবাফুল পার্টিতে ঢুকল, উপায় কি? মা অনেক বুঝিয়েছিল আপস করে নিতে। শুনবেই না। ওদিকে বাবার এলাকায় যে রকম নামডাক, একবার যদি ইলেকশনে দাঁড়িয়ে পড়ে, তাহলে লম্পট খোকার বিপদ। তাই সে প্রস্তাব দিল কেসটা তুলে নেওয়ার। কুকুর একটু আঁচড়েছে মাত্র। কামড় তো নয় পুরোপুরি। তবে ওর তরফে একটা শর্ত আছে। কুকুরের নাম রাখতে হবে জুবের শিকদারের নামে। বাবা প্রস্তাব শোনা মাত্র রেগে আবার আগুন! আরেক বিরোধীদলের নেতা হলে কী হবে, বাবার জুবের আঙ্কল ছোটবেলার বন্ধু। যথেষ্ট ভদ্রলোক।
এ তো ক্যাডাভারাস ঘটনা! একেবারে ছেতরে গেছে। বলে শ্রমণ।
দিয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। বলে, এবারে মা মাঠে নামল। মা-দের মহিলা সমিতিতে সব পার্টির বাড়ির মেয়েরা ছিল। সমাজসেবার কাজ তো। সেখানেই মানুষ খোকা মিত্তিরের বোন মিনতি সমাদ্দার যুক্ত। বড়ি, আচারের ব্যবসা। বাড়িতে রট হুইলার। মা মিনতি সমাদ্দারকে ধরে পড়ল। ‘আপনি তো বোঝেন, একটু দাদাকে বোঝান। জুবেরের সঙ্গে এক ওয়ার্ডে থাকি। অমন নামে কুকুরকে ডাকলে এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাবে। আর সবচেয়ে বড় মুশকিল যে আপনিও জানেন, আপনার ট্যামিকে কাল থেকে সরিৎশেখর বললে সে কি আর সাড়া দেবে বলুন? দিদি, কুকুরের তো অ্যাফিডেভিট করে বেশি বয়সে নাম পরিবর্তন করে ভিন্ন পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। এই এতদিনের অভ্যেস, ওকে খোকা মিত্তির বলে না ডাকলে..’
এতক্ষণ মিনতি সমাদ্দার মন দিয়ে শুনছিল কিন্তু যেই খোকা মিত্তির নামটা চলে এল অমনি কটকট করে তাকিয়ে বলল, ‘দাদার নামটা যখন কুকুরের নামে দিলে তখন মনে ছিল না?’
মা এটার সম্ভাব্য উত্তর বাড়ি থেকে তৈরি করে এনেছিল। বলল, ‘আপনিও যদি বারবার কুকুর কুকুর বলেন, কেমন লাগে না, শুনতে? আপনার ট্যামি তো আপনার ছেলে। ওর শীতের সোয়েটারটা যেখান থেকে বুনে আনলেন আমারটাও সেখান থেকেই আনা। তারপরে ওই বিধান মার্কেটের ভিতরে ডগ পাবে জন্মদিন পালন হল। আমরাও সেখানেই। ফলে নিজের ছেলের নাম দেওয়াটা কিন্তু খুব একটা অপরাধ নয়। তাকে শুধুমাত্র কুকুর বলে দাগিয়ে দেওয়া কেমন যেন লাগছে দিদি।’
মিনতি সমাদ্দার এবারে আর কথা বলতে পারল না। তার চরম দুর্বল জায়গায় ঘা দিয়েছে মা। কিন্তু তা-ও ভাঙে তো মচকাবে না। বলল, ‘এত বড় অপরাধ করেও তুমি আবার কথা বলতে এসেছ! অন্তত একবার চেষ্টা করো, দেখো যদি নতুন নামটায় অভ্যস্ত হতে পারে।’
মা ঘাড় নেড়ে বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন খোকা মিত্তিরকে ‘জুবের জুবের’ বলে ডেকেছিল। তাতে কান খাড়াও করেছিল। কিন্তু তারপরে আশপাশে ওই নামে সাড়া দিতে পারে এমন অন্য কাউকে দেখতে না পেয়ে ভোম্বল হয়ে রইল। নাকের উপর ভনভন করা দুটো মাছিকে খানিক তাক করে হাউ হাউ করে ডেকে থাবায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
মা হাল ছেড়ে দিয়ে মিনতি মাসিকে বলল, ‘খোকা মিত্তির কিছুতেই জুবের শিকদার হতে চাইছে না। বরঞ্চ বাড়ির বাইরের নেমপ্লেটে মার্বেল ব্লকে জুবের নামটা অ্যাড করে দেব।’
এবারে শ্রমণ একেবারে হাঁ! বলে, মরেছে! এত ওটিটি থেকে মার্কেজে চলে গেল!
দিয়া বলে, আরে মাঝখানে কথা বলিস না। পুরোটা মন দিয়ে শোন। এবারে মানুষ খোকা তাতে আপত্তি জানাল, কারণ পাবলিকের ভুল বোঝার বিষয় হয়ে যাবে। লোকে ভাববে জবাফুল দলের প্রমোদ ঘোষালের সঙ্গে বাল্যবন্ধু, সিংহ দলের জুবের শিকদারের এমন প্যাক্ট হয়েছে যে বাড়ির ফলক অবধি বদল হয়ে গেছে! অন্যদিকে আমার বাবা আপত্তি জানাল, কারণ ওই কুকুর খোকা মিত্তির জুবের হয়ে গেলে বাড়ির সদস্য হিসেবে তার একটা ধর্ম সংক্রান্ত অস্তিত্ব সংকট তৈরি হবে। এটাতে আর কেউ না হোক, আমার ঠাকুমার পুজোর ঘরে আর প্রবেশ অধিকার থাকবে না। কারণ কুকুর খোকা মিত্তির ঠাকুমার পুজোর সন্দেশ আর কাটা ফল রোজ খেয়ে থাকে। এবারে তার নাম বদলে গেলে সে ঠাকুরের সন্দেশ নাও পেতে পারে। নব্বই বছরের ঠাকুমাকে এসব বোঝানো কঠিন।
শ্রমণ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। বলে, এত বড় একজন ব্যক্তির অমন মর্মান্তিক পরিণতিতে আমি সত্যিই মর্মাহত।
দিয়া ছলছল চোখে বলে, সত্যিই রে একেবারে আমার নিজের ভাই হয়ে উঠেছিল। এত কিউট, এত রেসপন্সিবল, এত প্রোটেকটিভ, ভাবতে পারবি না। তবে তুই যে আমাকে সহানুভূতি জানাতে এসে এতটা বাংলা মুখস্থ বলতে পারলি, এটাতেই আমি অবাক।
শ্রমণ লাজুক হেসে বলে, ওটা মা ফোনে টাইপ করে দিয়েছিল। লোকে কত ইংরেজি নাম রাখে। তোদের ‘খোকা’ নামটায় আমার মা খুব খুশি হয়েছে তো। তবে এই দুর্ঘটনায় অল্প বয়সে চলে যাওয়া খুবই দুঃখের।
দিয়া ফোঁস করে ওঠে। দুর্ঘটনা মানে? ওকে মানুষ খোকা মিত্তিরের গাড়ি চাপা দিয়ে মেরেছে। বাবা কেস করতে গেছিল। নেয়নি। ভাবতে পারিস বলছে, দুধের গাড়ি মেরেছে? আরে, কে না জানে ওই গাড়ির আসল মালিক খোকার ডান হাত চন্দন মাল।
এবারে হাই হাই করে ওঠে শ্রমণ। বলে, থাম দিয়া। গল্পে আর গল্প জড়াস না। এবারে আবার চন্দন মালের মালকড়ির মালামাল শুরু হবে। নমস্কার তোকে। আর গাছপালার বৃত্তান্ত দিতে হবে না। এই কাকুরই তো মেয়ে তুই। আবার ওই মিরো, কান্দিনস্কি, হুসেন, মাতিসের মধ্যে গোলমাল লাগিয়ে দিবি!
দিয়া গাছপালা ফুলে ভরা বাগানের মাঝে কাঠের টুলে বসে পা দোলায়। তার সাড়ে তিন বছরের ভার্চুয়াল বন্ধু শ্রমণ প্রথম তাদের বাড়িতে এসেছে। ভার্চুয়াল ব্যাপারটা এখন এমন, বাড়ির আবর্জনা ফেলার জায়গাটুকু অবধি সবাই জানে। তবে আরেকটা মজার বিষয় আছে, যদি কেউ কোনও কিছু লুকোতে চায় সেটা লুকিয়েও রাখা যায়। এক টুকরো ছাদবাগানে ভোঁ ভোঁ করে মৌমাছি উড়ছে। পায়রা এসে ঠুকরে খাচ্ছে কচি চারা। শুকনো মাটি নখ দিয়ে খুঁড়ে ধুলো ওড়াচ্ছে চড়াই। ময়ূরকণ্ঠী রঙা মৌটুসি পাখা কাঁপিয়ে এক জায়গায় স্থির থেকে, কলকে ফুলের ভিতর ঠোঁট ঢুকিয়ে মধু নিচ্ছে। গরুর জাবনা খাওয়ার পাত্রের ভিতর পদ্ম পাতা শুয়ে আছে। মধ্যে মধ্যে দিনের আলোয় চোখ বোজা দুটি একটি ফুল।
দিয়া উদাস ভঙ্গিতে বলে, ঠিক এই কারণেই আমি ফুলগুলোর এমন নাম রেখেছি। ওইসব বইপত্র পড়ে সিনেমা দেখে দেখে মনে হত শিল্পীরাই শুধু নিজেদের মধ্যে মারপিট করে। এখন দেখছি উলটো। এই গাছপালা, ফুল, ছবি আঁকিয়ে, এখন সব শান্ত। এখন ঝাড়পিট, টোটাল বিনোদন দেবে খোকা মিত্তির। মানে মানুষ খোকা! যে আর কোনওদিন বড় হবে না। সিনেমা আর্টিস্টদের থেকেও ওর টিআরপি এখন হাই!
শ্রমণ এতক্ষণে স্বস্তির হাসি হাসে। এতক্ষণ যেন একটা কুটকুটে অনুভূতি হচ্ছিল। দিয়ার মাথার ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল তার। এবারে দিয়ার কথাগুলো ভারী স্পষ্ট। এখন একটাই কৌতূহল, দিয়াদের কুকুরের নাম আদৌ খোকা মিত্তির কি না।



