শুভ্র মৈত্র
এর চেয়ে বেশি মতিন কিছু চাইতেই পারে না। মানে মজুমদারবাড়ির কাকু যখন ডেকে বললেন, ‘কী রে মতিন কেমন আছিস? মেয়ে কত বড় হল?’ মনে হল, নসিবে এমন দিনও ছিল! মতিনের আফসোস হল, আজকে ফজরেও ঘুম ভাঙল না, নইলে মসজিদে যাবে ভেবেছিল।
মতিন জানে ঘরের মানুষ ছাড়া ওর দিকে কেউ তাকায় না। পাড়াতেও না, কাজের জায়গাতেও না। ওখানে তো ওর একটা নম্বর আছে, সেই নম্বরেই পরিচয়। কয়েকবছর আগের কথা মনে পড়লে শুধু আফসোস হয় মতিনের। তখন সিলিন্ডার বুক করার পর সপ্তাহ কেটে গেলেও নতুন মিলত না। তাতে যেমন বাড়ত বৌদিদের উৎকণ্ঠা, তেমনি খাতিরও বাড়ত মতিনের। ‘বাবা, আমারটা দিয়ে যাও না, পরশু জামাইষষ্ঠী।’ অথবা ‘আমার পরে বুকিং করে রঞ্জনের মা পেয়ে গেল, আর আমারটা আসেনি? বললেই হল?’- এমন হাজারটা অভিযোগ অনুযোগ উপভোগ করত মতিন। খারাপ কথাও যে শুনতে হয়নি, তা নয়, ‘শালা বেশি টাকায় আমার গ্যাস অন্য কাউকে বেচে দিচ্ছে!’ বা ‘এত তাড়াতাড়ি শেষ হতেই পারে না, সিলিন্ডারে নিশ্চয়ই কম ছিল!’ তবু মাথা ঠান্ডা থাকে মতিনের, ওকে ঘিরে ধরা পুরুষ-মহিলাদের নির্লিপ্তভাবে বলে, ‘অফিসে বলেন’। আর খেয়াল করত, সবাই ওকে দেখছে, মনোযোগ পাচ্ছে সবার। ঠিক এইটাই ওর সবচেয়ে লোভের জায়গা।
শুধুই কি মনোযোগ? বকশিশও মিলত কুড়ি টাকা, তিরিশ টাকা, এমনকি পঞ্চাশ। সাদা বাড়ির মাসিমা তো বসিয়ে মিষ্টিও খাওয়াত। একটা কালো রঙের বোতাম টেপা আদ্যিকালের মোবাইল। মেয়ে আফসোস করে, ধুর, গানই শোনা যায় না। অথচ, কতজনের কাছে যে নম্বরটা আছে! মাঝে মাঝেই বেজে ওঠে। ভ্যান চালাতে চালাতে পকেট থেকে বের করে যন্ত্রটা কানে ঠেকালেই, ‘আমারটা আছে?’ উফফ, এই জন্যই ওটাকে আনতে চায় না!
কাজের শেষে ঘরে ঢুকলে বেটি বলত, ‘আব্বু, দু’টা লোক এসেছিল, তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।’ ক্লান্ত শরীরটা চৌকিতে এলিয়ে দিয়ে মতিন বলে, ‘ছাড়, ফের আসবে।’ আসলে ওই নির্লিপ্তিতেও একটা গর্ব ছিল, ঘরের লোকেরা জানতে পারছে, ওর গুরুত্ব। ওর খোঁজেও লোক আসে, নইলে তো ও নিজেই সবার দরজায় যায়।
এমনিতে মতিনকে এ পাড়ায় চেনে না, এমন মানুষ পাওয়া বিরল। আরও ভালো করে বলতে গেলে, এ পাড়ার মা-বৌরা। কারণ মতিনের সঙ্গে ওদেরই সম্পর্ক। দুপুরবেলা যখন পাড়ার বেটাছেলেরা কাজের দায়ে বাইরে থাকে, তখন মতিন আসে। একটা ধাতব শব্দ নিয়ে আসে। পাশাপাশি শুয়ে থাকা সিলিন্ডারগুলির একে অন্যের শরীর ছোঁয়ার শব্দ। ঘামে ভেজা কালো চেহারাটা ঘরের দরজায় এলে বৌদি’রা নিশ্চিন্ত হয়। গায়ে একটা বেমানান ইউনিফর্ম, কপাল থেকে ঘাম মোছার জন্য গামছা বের করে। আর তারপরেই দরজার কলিং বেল বাজিয়ে হাঁক দেয়, ‘গ্যাস।’
এ যেন হ্যামলিনের বাঁশির ডাক, বেরিয়ে আসে মা-বৌদিরা, হাতের কাজ ফেলে রেখেই। কেউ কেউ মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে আসে, ‘দ্যাখো তো এখানেই নম্বর আছে বলল ওরা।’ মতিনকে সেটাও খুঁজে দিতে হয়। ভালোই লাগে। সবাই ঘরের লোক ভাবে। ছেলেরা থাকে না বটে, কিন্তু মতিন বুঝতে পারে ওদের আগ্রহও ছিল ওর প্রতি। মনে আছে, স্বপনের চায়ের দোকানে ওকে দেখে একজন পাশের লোককে বলেছিল, ‘বুঝলে হে, বাঙালির জীবন এখন শুধুই গ্যাস নির্ভর। জিনট্যাক আর সিলিন্ডারই হল আলটিমেট চাহিদা। এই দুটোর সাপ্লাই ঠিক থাকলেই আমরা খুশি’। হাসির রোল উঠেছিল দোকানে। না সেদিনও ওর দিকে তেমন তাকায়নি কেউ।
এ সুখ অবশ্য বেশিদিন থাকেনি। হঠাৎ করেই কবে যেন সহজলভ্য হল সিলিন্ডার। এখন আর কেউ তেমন আকুলিবিকুলি করে না, জানে একদিন-দু’দিনে চলে আসবে। শেষ না হলে বুক করে না। গুরুত্বও কমেছে মতিনের। এখন পুজোর আগে বকশিশের কথা মনে করিয়ে দিতে হয়, ইদের কথা অবশ্য বলত না কোনওদিনই। আরও নিষ্ঠুরভাবে মতিনের চোখে পড়ত, তেমনভাবে কেউ তাকায় না ওর দিকে। জিজ্ঞেস করে না, বৌ-বাচ্চার কথা।
মতিনের সঙ্গে এই বৌদিদের তেমন কোনও সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। ও শুধু জানে সিলিন্ডার, যা এখন একদিন-দুইদিনেই পাওয়া যায়, তার জন্যও আগ্রহ থাকে বৌদিদের। আগুনের জন্য হ্যাংলামি যেন মেয়েদের নিজস্ব, ও তো নিজের বিবিকেও দেখেছে। যতই সহজে পাওয়া যাক, চুলার জন্য প্রেম কমে না। আচ্ছা, মেয়েরা কি এমনই হয়? রান্না যা হবে তা হয় মতিনের পছন্দের নইলে আজকাল বেটি খেতে ভালোবাসে বলে, তবু ইসরাতের আম্মির এত আগ্রহ কেন? মনে আছে, একসময় কেরোসিন কমে এলে বা স্টোভের সলতে ফুরিয়ে গেলে, কেমন ঘ্যানঘ্যান করে মাথা খেত মতিনের। আর একটা জিনিসেও মাথা খারাপ হয় ওর বিবির। সেটা হল জল। কিন্তু জল যেহেতু নিজেই জোগাড় করে, কারও ওপরে নির্ভর করে না, রাস্তার পাইপ থেকে বালতিতে টেনে আনে, সেটার আঁচ মতিন তেমন পায় না। এখনও বোঝে না মতিন সব রহস্য, তবে জানে আগুনের রসদ পৌঁছে গেলেই মেয়েরা শান্তিতে থাকে।
*******************
ইদানীং আবার যেন সেসব দিন ফিরে এসেছে। কোথায় একটা যুদ্ধ লেগেছে, আর ওদের গ্যাসের অফিসে সেই সকাল থেকে ভিড়। ট্রাক থেকে সিলিন্ডার নামানোর আগেই মৌমাছির মতো মানুষ ছেঁকে ধরে, ‘আজকে কিন্তু আমারটা…’, ‘আমাকে এখানেই দিয়ে দিবি? রিকশা নিয়ে এসেছি’, ‘এই যে আমার ডিএসি…’
কাগজের স্লিপগুলি গুনে গুনে পকেটে ঢোকায় মতিন। এবারে ভ্যানে সিলিন্ডার লোড করার পালা। রোগা শিরা ওঠা হাতগুলো যে কীভাবে এই সময়টায় এত শক্তি পেয়ে যায়! মতিনের কানে আসে যুদ্ধের কথা, আমেরিকা…ইরান… জাহাজভর্তি গ্যাস। সবটা বুঝতে পারে না। জাহাজেও গ্যাস থাকে? ওর মতোই কেউ নিয়ে আসে সেগুলি? জাহাজের লোককে ফোন করে জিজ্ঞেস করে কেউ? জানে না। ওকে ঘিরে থাকা চোখগুলি ওকে সন্দেহের চোখে দ্যাখে। হাতছাড়া না হয়ে যায়। কারও কারও চোখে মিনতি, আমারটা আজকেই দিও প্লিজ।
বিরক্ত হয় না মতিন। সবাই ওকে দেখছে, মন দিয়ে দেখছে, ওর গুরুত্ব বেড়েছে, এটাই স্বস্তি দেয় মতিনকে। কোথায় একটা যুদ্ধ লেগেছে, কারা যুদ্ধ করছে জানতে চায়নি মতিন, ও শুধু বোঝে গ্যাসের টানাটানি হলে ওর দিকে নজর পড়ে ভদ্রলোকদের। মজুমদারকাকু ডেকে জিজ্ঞেস করে বাড়ির খবর, বেটির খবর। ভোটের সময় নেতারা যেমন করে। উপভোগ করে মতিন।
ও জানে টিভির চকচকে মুখগুলি থেকে বেরিয়ে আসা ভরসার শব্দগুলির প্রতি নয়, ওদের অনেক বেশি আগ্রহ থাকে ভাঙাচোরা মতিনের কালো ভাঁজ পড়া মুখটার প্রতি। এই ক’বছরে বয়স বেড়েছে মতিনের। কিন্তু এখনও মানুষের চোখ টানতে পারেনি। এখনও ওকে ‘গ্যাসওয়ালা’ বলেই ডাকে সবাই। নামটাও জানে না। শুধু কি ও নিজে, ছোট ইসরাত, ওর আম্মি- সবাই তো ওই গ্যাসওয়ালার মেয়ে বা বৌ।
সাব্বির, আসরাফ ওরাও ওর মতোই ভ্যান নিয়ে যায় রোজ। মতিন দেখেছে, ওরা ইদানীং গুজগুজ করে কী সব, কয়েকটা লোককে আলাদা করে ডেকে কোনায় নিয়ে যায়। মতিন কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না। এটুকু স্পষ্ট হয়, ওরাও অপেক্ষায় ছিল যুদ্ধের, এই টানাটানির। এই মওকায় যদি কিছু…
কিন্তু মতিনের সেসবে আগ্রহ নেই, বলা ভালো সাহস নেই। ও শুধু এই মানুষগুলির কথা ভাবে, যারা ওর নামটা জেনে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, যারা জেনে ফেলেছে, তারা নাম ধরে ডাকছে আত্মীয়র মতো। হয়তো কখনও জিজ্ঞেস করেও ফেলতে পারে, তোমার বাড়িতে কীসে রান্না হয়? গ্যাস আছে? উত্তর না দিলেও অনেক কথা বলছে।
এমনিতে বাড়ির পুরুষদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হয় না, এখন কিন্তু রাস্তায় ছেলেরাই বেরিয়ে এসেছে। ক্রমশ ভিড় বাড়ছে, টোটোতে চাপিয়ে, রিকশায় করে, সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বেঁধে সিলিন্ডার আনছে সবাই। আদৌ বাড়িতে যাবে কি না সেই ভরসা করছে না। কারও কারও তীব্র ক্ষোভ ঝরে পড়ছে ডিলারের উপর। কেউ বা আরও অনেক দূরের কাউকে গাল দিচ্ছে। আর প্রত্যেকের কাছেই নিজেদের সংকটটা সবচেয়ে তীব্র, অন্যেরটা অনেক কম। তবে মুখের সামনে অন্তত মতিনকে কেউ গালিগালাজ করছে না। সব কথা কানে যাচ্ছে না, কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। যে মানুষগুলির এত রাগ সবার ওপর, মতিনের দিকে তাকাতেই ওদের চোখ কেমন ভিজে আসে। অসহায় একটা আর্তি আছে যেন।
মতিন বোঝে, এটাই সময়। উদ্বিগ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে ছুড়ে দিতে হবে, ‘আপনারটা নাই।’ তারপর মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়, তাকাতে নেই ওই মুখের দিকে। ও জানে ওর দিকেই তাকিয়ে থাকবে ওরা। মতিন ওদের চোখের জন্য নিজেকে তৈরি করে, ঘাম মোছে মুখের। ভ্যানের প্যাডেলে পায়ের চাপ দিয়ে চিৎকার করতে চায়, ‘যুদ্ধ মাঈ কি…’



