মৈনাক ভট্টাচার্য
‘সব কথা শুনব আপনার। আগে বলুন আপনি এই ঘরে এলেন কীভাবে!’,
নিজের চেম্বারে বসে, নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে ভবাবাবু কোনও রকমে কথাটুকু শুধু বলতে পারলেন।
‘আমার তো এখন আর অনুমতির দরকার পড়ে না।’, নির্লিপ্ত খেটু সরকার।
পাগল নাকি, বলে কী লোকটা? আশ্চর্য হন ভবানীচরণ। ডাকসাইটে বিখ্যাত পাক্ষিক ‘দশ দিক’ পত্রিকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ সম্পাদক তিনি। তিনি ভবানীচরণ সমাদ্দার।
অনধিকার প্রবেশ। তাই ইচ্ছে ছিল না, তবু আনকোরা লেখক খেটু সরকারকে ভবাবাবু আদর করেই বসালেন। আসলে ইচ্ছেগুলোও তো কখনো-কখনো তাঁর কবিতার লাইনেরই মতো- ইচ্ছেদেরও ইচ্ছেদের সাথে বিদ্রোহের অভ্যেস লুকিয়ে থাকে।
দু’এক কথার পরই দুম করে খেটুবাবুর এই রণমূর্তি দেখে অবশ্য ভবাবাবুর মাথা থেকে কাব্যটাব্য ফুড়ুত। বদলে অনেকদিন পর তাঁর শরীরটা আবার ঝনঝন করে উঠল। মুখ দিয়ে যেন কথাটুকু অব্দি বেরোতে চাইছে না।
সবাই জানে দুঁদে লেখকরা পর্যন্ত তাঁর কাগজে একটা লেখা ছাপানোর জন্য বিগলিতভাবে এই চেম্বারের বাইরে এসে হত্যে দিয়ে থাকেন, ভেতরে ঢুকতে পারলে তো একেবারে বর্তে যান। স্লিপ ছাড়া এই চক্রব্যূহে ঢোকার সাধ্যি কারও নেই, অথচ অজানা অচেনা কোথাকার এক স্বঘোষিত সাহিত্যিক খেটু সরকারের পাল্লায় পড়ে তখন সত্যিই তাঁর ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা। সিসিটিভি মনিটরে তো গেটের বাইরে মানুষটাকে দেখেননি। সিকিউরিটি গার্ড ব্যাটা রসিকলাল কি গেট ছেড়ে এদিক-ওদিক আড্ডা জমিয়েছে? তাই বা হবে কীভাবে, সে তো বসেই আছে। কোনও মতে টেবিলের গ্লাস থেকে কিছুটা জল খেয়ে সেই মনটাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করে বললেন, ‘সে যাক গে। আপনি উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আপনার লেখা কেন মনোনয়ন হয়নি, সে তো ফাইল দেখতে হবে।’
‘ফাইল! সেটা তো আপনার বানানো। যত সব সাপ ব্যাঙ লেখা ছাপছেন, আর আমার নিজের জীবন দর্শন থেকে খুঁড়ে বের করা সব লেখা। উত্তেজিত হব না মানে! আজ সব নেপোটিজমের হিসেব চুকিয়ে, তবে ছাড়ব।’ খেটু সরকার রীতিমতো ধমকে ওঠেন।
আবার সেই ভয়টা ভবাবাবুর শরীর অবশ করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সেই ডার্বি ম্যাচ, মাঠ ভর্তি দর্শকের কান ফাটানো চিৎকার- পেনাল্টি বক্সে একা গোলরক্ষক তিনি, আর সামনে বাঘা স্ট্রাইকারের পায়ে বল। এমন পরিস্থিতি হলে ভবাবাবু ভেতরে ভেতরে ঘামতে থাকেন।
লোকটা দেখছি ‘ছিনেজোঁক’ একটা। আবার গেল কোথায় মানুষটা? খেটুবাবুকে হঠাৎ সামনে দেখতে না পেয়ে নিজের মনেই বললেন। কী জানি বাবা, ধরবে না তো পেছন থেকে গলাটা টিপে? ভবানীচরণের কথা মাঝপথেই থেমে যায়, ‘দরকার হলে গলা টিপেই ধরব আজ। আমাকে একটু আগে পাগল বলেছেন, কিচ্ছু বলিনি। এখন আবার ছিনেজোঁক বলছেন? আপনার কি চোখের ব্যামো নাকি মশাই? আপনার সামনেই তো বসে আছি।’
চোখের ব্যামোই হবে। আশ্চর্য সব কাণ্ড! তিনি তো বোধহয় নিজের মনেই বলেছেন কথাগুলো। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। বেল বাজিয়ে যে রসিকলালকে ডাকবেন তারও উপায় নেই। লোক জানাজানি হলে হোমগ্রাউন্ডেই প্রেস্টিজের একেবারে ফালুদা। তটস্থ হয়ে বার তিনেক একটু একটু করে জলের গেলাসে মুখ ঠেকালেন। জলপান তো নয় যেন জল গেলা। গেলা জলটাও যেন গলার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। আর হয়েছেও এক জ্বালা, এইসব বিপদ-আপদ এলেই হতচ্ছাড়া পুরানো সেই ফুটবলের ভূতটা যেন ভবাবাবুকে আরও ঘেটি চেপে ধরতে চায়। সে তো আজ থেকে নয়, এই পত্রিকার ব্যবসায় আসার আগে যখন ফুটবলের পেশাদারি কোচের চাকরিটা বিদেয় হল, তারপর থেকে দেখা দিয়েছে এই উপসর্গ। কপালের নাম গোপাল। যখন একটু একটু করে ফুটবল মাঠে সুনাম পেতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হল। সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলির কথা ভাবলেই এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। অগত্যা পারিবারিক এই চালু ব্যবসাটাতেই ঝুলে পড়তে হল। কোচিংয়ের পেশাটায় অবশ্য থ্রিলও ছিল। সব সময় একটা পজিটিভ চ্যালেঞ্জ, ব্ল্যাক শ্যাডোও ছিল- অমুক কর্তার শালির ছেলে বা তমুক কর্তার ভাইপোকে খেলাতেও হবে, আবার টিম হারলেই কর্মকর্তাদের চোখরাঙানি, অকথ্য গালিগালাজ। প্রথম প্রথম না পারতেন ওগরাতে না পারতেন গিলতে। গুরুমশাইরাই তো শিখিয়েছেন- ‘যে গোরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়া দোষের নয়’। স্কুলশিক্ষার এই আদর্শ বচন মনে করে মেনে নিতেও শিখে ফেলেছিলেন, পেশা বলে কথা।
পেটের দায়ে যখন এই পাচন সত্যি সত্যিই রক্তে মিশিয়ে ফেলেছেন, একদিন ক্লাবের এক মেজোকত্তা চুপি চুপি রফা করতে এলেন, ‘ভবাবাবু আজ কিন্তু আমাদের পেয়ারাতলাকে জাগরণী সংঘের কাছে দুটো গোল হজম করতে হবে। এমনভাবে টিম খেলাবেন যেন কাকপক্ষী টের না পায়। আমি আর আপনি ছাড়া কথাটা যেন পাঁচকান না হয় সেটা আপনি দেখবেন, আর- আমি আপনাকে দেখব।’ একেবারে মিলিটারি কায়দায় হুকুম দিয়ে গটগট করে চলে গেলেন তিনি।
বড়কর্তা না হোক, কত্তা তো। মনে না নিতে পারলেও মেনে নিতে হয়। মুখে তাই চুপটি করেই ছিলেন ভবানীচরণ। প্রথম হাফ অব্দি বেশ চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কী যে হল, গুরু পাচনের অন্য এক ডোজ ভবানীচরণের চোয়া ঢেঁকুরের মতো উঁকি দিতে শুরু করল যার নিমক খাব, তার সাথে নিমকহারামি? দু’তিনটে প্লেয়ার পালটে জাগরণীকেই উলটো দু’দুটো গোল মেরে বসলেন। খেলা শেষে ক্লাব হাউসে তাঁকে সবাই বীর বিক্রমে বরণ করে নিল, প্রশংসাও করল তাঁর প্লেয়ার পালটানো স্ট্র্যাটেজির। মেজোকর্তাটি কিন্তু ভবানীচরণকে ছাড়লেন না। কিছু দিনের মধ্যেই দল ভাঙানোর পরিকল্পনায় মদতের অপবাদে একেবারে ভরা সভায় কিল চড় ঘুসির ককটেল, ফলোড বাই ‘চাকরি নট’। সেই থেকে বিপদ দেখলেই ফুটবলের এই ভূতটা এসে ফিচিং করতে থাকে। নিস্তার পাওয়ার জন্য পাড়ার রসিক ডাক্তারকে অব্দি দেখাতে হয়েছিল। সব শুনে টুনে ডাক্তারবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, ‘হুঁ, কেস অফ ‘সকারফোবিয়া’। এ রোগের ওষুধ নেই। ‘খাও পিয়ো আর মস্তি করো’। ভাবনা থেকে মনটাকে দূরে রাখুন, সেরে যাবেন।’ খুব বিনয়ের সাথে পরামর্শ চেয়েছিলেন ভবানীচরণ, ‘ভাবনাটাই আমার ক্যাপিটাল স্যর। বরং কোনও ওষুধ দিয়ে দিন।’
সুসময় বলে কথা, উপদেশ আর ওষুধের কম্বোপ্যাকেই বোধহয় কাজ হয়েছিল। কাগজের ব্যবসায় অবশ্য অন্য মজা। সভাসমিতিতে সরকারি আমলাদের মতো খাতির যত্ন। দেওয়ালি নববর্ষের উপঢৌকন, স্কচ পার্টির জম্পেশ খাওয়াদাওয়া। কচি, মাঝ বয়সি সব লেখিকারা বেশ ঢলে পড়ে একটু সেলফির জন্য, মনটা চনমন করে দুলতে থাকে। নতুন উদ্যম তৈরি হয় প্রতিদিনের কাজে। এত মজা, এত মজা। এ সব আগে জানলে কে আর ফুটবলের ল্যাঠায় যায়? কিন্তু বাবা-কাকার উপদেশ, কেরিয়ার ধরে রাখতে গেলে বদনাম যেন শরীর ছুঁয়ে না যায়। তাই খেলোয়াড় সুলভ এই মনটাকেও তো তৈরি করতে হয়েছে দিনে দিনে। সবকিছু করছেন সেটা যেন তাঁর শরীর করছে। মনটা ড্রোন ক্যামেরার মতো সব দেখে চলেছে। সবই অভ্যাস, ‘শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়ানো যায় তাই সয়’। আহা, চলছিলও বেশ রসেবশে। ভালোই ছিলেন কয়েক বছর। কিন্তু নাটের গুরু খেটু সরকারটাই যত গণ্ডগোলের মূল। আবার ঘা খোঁচানোর মতো মনে করিয়ে দিলেন যন্ত্রণাটা।
খেটুবাবু তখনও ভবানীচরণের উপর রাগে গজগজ করে চলেছেন।
গোলে বল না মেরে বক্সে ড্রিবিল করলে স্ট্রাইকারকে যে ভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় ঠিক সেইভাবেই খেটু সরকারকে রুখে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলেন ভবানীচরণ ‘আপনি আমার কথাটা শুনবেন, না হইহই করতে থাকবেন?’
খেটুবাবু একটু ঠান্ডা হতেই ভবাবাবু যেন পরিত্রাণের রাস্তা আবিষ্কার করে ফেললেন।
-আচ্ছা, শেষ কোন লেখাটা পাঠিয়েছিলেন বলতে পারবেন?
খেটু সরকার খুব উৎসাহ নিয়ে বলেন, ‘তা-ও বছর খানেক আগে, ‘সিংহের হিংসার সারকথা’। মিষ্টি প্রেমের গল্প, তার সাথে আমার…।’
‘বুঝেছি বুঝেছি। জীবন দর্শন খুঁড়ে আনা তো?’, মাঝপথে খেটুবাবুর মুখ থেকে কথা কেড়ে নেন ভবাবাবু।
-হ্যাঁ।
-পড়েছি। যত লেখা আসে নিজেই সব পড়ি। কোথায় কোন অমূল্য রতন লুকিয়ে আছে। আমাদের কাছে লেখকরা সবসময় দেবতুল্য। তেনাদের সৃষ্টির উপর ভর করেই তো সম্পাদকের যত যশ প্রতিপত্তি।
‘দেবতুল্য! যতসব জামাই ঠকানো কথাবার্তা। এই আপনার দেবভক্তি? বলুন তো কী ছিল গল্পটায়?’, আবার নতুন করে খেঁকিয়ে ওঠেন খেটুবাবু।
এইরে! আবার সেই ফুটবলের ভূতটা…। ভবানীচরণ প্রমাদ গোনেন। ততক্ষণে অবশ্য ভবানীচরণ নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন। গা ছমছমে ভাবটাও নেই। ফরোয়ার্ড কাটানোর ভঙ্গিতে বললেন, ‘আরে মশাই আপনি তো শুনতেই চাইছেন না। আর মাঝে মাঝে কেমন যেন ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছেন। মাথা ঠান্ডা করুন। আপনি তো লেখক। বলুন না, এই যে এত, হাজার হাজার দেবদেবী, তার কতজনকে আপনি আরাধনা করতে পেরেছেন?’
-মানে!
-সেটাই তো, লেখকরাই আমাদের ভগবান। তবে, সব দেবতা কি ডাক পায়? যাঁর যেমন ‘টার্গেট রেটিং পয়েন্ট’ মানে আমাদের ‘টিআরপি’ আর কী, তার কদরও তেমন। বাজারেও তো ওই দেবতার মতোই হাজার লেখক। পুজো করার আগে দেবতার এই ‘টিআরপি’-জেনুইনিটি এগুলো দেখবেন না?
খেটু সরকারের মাথাটা এবার সত্যিই গুলিয়ে যাচ্ছে, ‘কী বলতে চাইছেন, সোজাসুজি বলুন তো মশাই।’
খুব ধীর স্থিরভাবে ভবাবাবু বলেন, ‘আপনার কাছে বারেবারে ‘ওটিপি’টাই তো চেয়ে পেলাম না। কেস প্রসেস করব কীভাবে?’
-ওটিপি! মানে?
-প্রুফ অফ জেনুইনিটি, ডিজিটালের যুগে ওটা ছাড়া লেখা মনোনয়ন করা যায়? কাল যদি আপনি দাবি করেন এটা আপনার লেখাই নয়। এটা এখন আমাদের সিস্টেম জেনারেটেড ব্যাপার। সে যাক গে, আমি ফাইল দেখে আবার ‘ওটিপি’ পাঠাব, দিন তারপর দেখছি।
খেটু সরকার গভীর সমস্যায়। চুপ মেরে যায়।
-চুপ করে থাকবেন না, প্লিজ। জবাব দিন।
ঘাঘু সম্পাদক, ঠিক বুঝে ফেলেছেন সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল। বল নিজের পায়ে। এবার একটু বেশ রসিয়ে চা খাওয়া যাবে।
-চা খাবেন? পুরানো কাসুন্দি না ঘেঁটে বরং একটা নতুন গল্পই না হয় পাঠিয়ে দিন। আর হ্যাঁ, আপনার নামটা কিন্তু পালটাতে হবে।
-নাম পালটাতে হবে! মানে?
-আরে মশাই, ‘খেটু’ কোনও লেখকের নাম হয়? লেখকের নাম হবে- নেইপাল, গ্রিন্সবার্গ, অস্টেন, হুগো, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, অরুন্ধতী। নামেই তেজ, নামেই বিক্রম। নাম শুনলেই চড়চড় করে বাজারদর বাড়তে থাকবে।
-কেন ঝুম্পা, নেরুদা, লোরকা- এসবও তো আছে!
-সে আছে। তবে তাঁদের লেখা যাঁরা ছাপেন তাঁদের সাথে আমার তুলনা চলে না।
এবার শিকার বধের সুর পালটে ভবাবাবু আবার বলেন, ‘আমাকে তো আমার কাগজের টিআরপি-টা দেখতে হয় মশাই।’
-কিন্তু, এখন কি আর নাম পালটাতে পারব?
-কেন পারবেন না, ছদ্মনাম তো।
-সে যে নামই হোক। আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না।
ভবানীচরণ এবার স্বমূর্তিতে সিরিয়াস, ‘আর হ্যাঁ, কোনও প্রেম ট্রেম নয়, বেশ জম্পেশ গা-ছমছমে একটা ভূতের গল্প দেবেন। ওটিপি-টা কিন্তু পাঠাতে ভুলবেন না। ডিজিটালের যুগে ওটাই…।’
খেটুবাবু চিন্তিতভাবে বলেন, ‘খুব মুশকিলে ফেললেন স্যর। ভূতের গল্প তো না হয় লিখে দেব, আমার জীবন দর্শনের বাইরে তো আমি কোনওদিন কিছু লিখিনি, তবে…’
ভবানীচরণ সমাদ্দার মুচকি মুচকি হাসছেন, তবে আবার কী?
-ওই নাম আর ‘ওটিপি’।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভবানীবাবু তখন ভাবছেন, আহা, ওটিপির কী অসীম মহিমা।



