গৌতম সরকার
বলেছিলেন বটে রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। বরং ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ নীতিতে এখন আত্মঘাতী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষ করে কূটনীতিতে, রাজনীতিতে। নিঃসঙ্গতাকে সাধারণত সামাজিক সমস্যা মনে করা হয়। তবে সমস্যাটা রাজনীতিতে আছে, আছে কূটনীতিতেও। ব্যক্তিজীবনে কেউ কেউ নিঃসঙ্গতা উপভোগ করেন বটে, আবার কেউ কেউ ডিপ্রেশনেও চলে যান নিঃসঙ্গতায় ভুগে।
রাজনীতি বা কূটনীতির নিঃসঙ্গতা আরও ভয়ংকর। অস্তিত্বের সংকটও ডেকে আনতে পারে। রাজনীতি আজকাল সঙ্গী নির্ভর। বলা হয় জোট রাজনীতির যুগ এখন। এজন্যই এনডিএ কিংবা ‘ইন্ডিয়া’। অতীতে যেমন ছিল ইউপিএ। বামফ্রন্টও বাম দলগুলির যৌথ মঞ্চ। জোট শুধু দলের সঙ্গে নয়, জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও হয়। তবে অলিখিত বোঝাপড়া। দেওয়া আর নেওয়ার শর্তে সেই সমন্বয়। মূলত জনগোষ্ঠীকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ভোট আদায়ের বন্দোবস্ত।
তখন সেই জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গী। যেভাবে অতীতে দেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ছিলেন কংগ্রেসের ভোটব্যাংক। যেখান থেকে তোষামোদের রাজনীতি বা হালে বিজেপির মুখে ‘তুষ্টিকরণ’ শব্দটির জন্ম। এই শর্তাধীন বোঝাপড়া চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। কিংবা জনগোষ্ঠীর সবাই সেই বোঝাপড়ার শরিক হবেন- এমন নিশ্চয়তাও থাকে না। বাম রাজত্বেই সংখ্যালঘু ভোটে কংগ্রেসের একাধিপত্য ভেঙে ছিল বামফ্রন্ট।
আবার এখন মুসলমান সম্প্রদায় নিরেট আঠার মতো সেঁটে আছে ঘাসফুল প্রতীকের সঙ্গে। পিরিতি কাঁঠালের আঠা, লাগলে পরে ছাড়ে না…। সেই পিরিতি ভাঙা অসম্ভব বুঝেই তো বাংলায় ‘জাগো হিন্দু জাগো’ নীতি আঁকড়ে ধরছেন শুভেন্দু অধিকারীরা। বাম শাসনের শেষদিকে মতুয়া সম্প্রদায়কে কাছে টানতে পেরেছিল তৃণমূল। মতুয়া ভোট সঙ্গে থাকলে বাংলার বেশ কয়েকটি আসনে যে তুড়ি মেরে কিস্তিমাত করা যায়, তা প্রমাণিত।
ক্ষমতায় আসার পর মতুয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে তৃণমূলের বোঝাপড়া আরও নিবিড় হয়েছিল প্রথমদিকে। কিন্তু মতুয়া ঠাকুরবাড়ির অভ্যন্তরীণ কলহের পরিণতিতে এই সম্প্রদায়ের ঘাসফুল প্রীতি চিরস্থায়ী হল না। সম্প্রদায়টির গুরুত্ব বুঝে বিজেপি দখল করে ফেলল মতুয়া ভোটের একাংশ। আপাতত দুই ফুলে ভাগাভাগি করে আছে মতুয়া ভোট।
ভোটে সমর্থনের নিরিখে উত্তরবঙ্গের গোষ্ঠীগত বিন্যাস অনেকটা সেই রসিকতার মতো- যখন যেমন তখন তেমন বন্দে মাতরম। অথবা যেদিকে বৃষ্টি আসছে, সেদিকে ছাতা ধরো। মোদ্দা কথায় ক্ষমতার সঙ্গে লেপটে থাকা। সে কারণেই তো বাম জমানা উলটে যেতেই রাজবংশী, আদিবাসী, নস্যশেখ জনগোষ্ঠীগতভাবে তৃণমূলের সঙ্গী হয়েছিল। বামফ্রন্ট রাজত্বেই অবশ্য বামেদের নেপালি, গোর্খা সমর্থনে চিড় ধরেছিল। আত্মপরিচয়ের বোধ উসকে তৈরি হল গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন।
একই কারণে বাম শাসনের শেষ কয়েক বছরে কামতাপুর আন্দোলনে উত্তাল হয়েছিল উত্তরবঙ্গ। আদিবাসী বিকাশ পরিষদ কার্যত চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে বামেদের একাধিপত্য উৎখাত করে দিয়েছিল। বামফ্রন্টের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঙালি ভোটের স্বার্থে জনগোষ্ঠীগত স্বশাসনের দাবিকে আমল দেননি। যে কারণে তিনিও একসময় জনগোষ্ঠীগত সঙ্গী হারিয়েছেন। যে বিমল গুরুং একসময় মমতাকে ‘পাহাড়ের মা’ সম্বোধন করেছিলেন, তিনি হয়ে গেলেন শত্রু।
অথচ জিটিএ চুক্তি কিংবা জিটিএ’র ক্ষমতায় গুরুংয়ের অভিষেকের পেছনে মমতার অবদান কম নয়। সেই গোর্খা, নেপালি জনগোষ্ঠীর সখ্য পাকাপাকিভাবে হারিয়ে ফেলেছে তৃণমূল। বাম শাসন থেকে মুক্তি পেতে রাজবংশী, আদিবাসীরা একসময় ঢেলে ভোট দিয়েছিল ঘাসফুল প্রতীকে। রাজবংশী ও কামতাপুরি ভাষা আকাদেমি, রাজবংশী উন্নয়ন পর্ষদ ও রাজবংশী ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে সেই অনুগ্রহের ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন মমতা।
শেষরক্ষা হয়নি। ভাবনার ঐক্য, নিদেনপক্ষে ভাবনার বোঝাপড়া বা আদর্শগত বন্ধন না থাকলে এধরনের বন্ধন খুবই পলকা হয়। তৃণমূলের সঙ্গে বন্ধন ঢিলে হতেই বিজেপি নতুন সঙ্গী বানায় রাজবংশী জনগোষ্ঠীকে। উত্তরবঙ্গ থেকে তৃণমূলকে উচ্ছেদ করার মরিয়া চেষ্টায় বিজেপি নেতাদের অনেকে আলাদা রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন। পৃথক রাজ্যের প্রবক্তা স্বঘোষিত মহারাজ অনন্ত থুড়ি নগেন রায়কে রাজ্যসভা সাংসদ বানিয়ে দেয়।
একই কারণে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের টোপ দিয়ে কেএলও প্রধান জীবন সিংহকে মায়ানমারের জঙ্গি ডেরা থেকে টেনে এনেছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কিন্তু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বোঝাপড়ার শর্ত পূরণ বাস্তবে কঠিন। পাহাড় সমস্যা সমাধানের আশ্বাসের গাজর ঝুলিয়ে বছরের পর বছর দার্জিলিং লোকসভা আসনটি বিজেপি জিতে চললেও নেপালি, গোর্খা জনগোষ্ঠী ক্রমশ হতাশ হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর। দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্ট লাগাতার চেষ্টা করলেও গোর্খা জনগোষ্ঠীর আশাপূরণে ব্যর্থ।
পাহাড় সমস্যা ঝুলে থাকার পাশাপাশি রাজ্যের দাবি ছেড়ে জীবন সিংহ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রাজি হলেও তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অনেকবার জীবনের মুখে দিন-তারিখ আর হুংকার শোনা গিয়েছে মাত্র। আবার মাথার ওপর কেন্দ্রে বিজেপি আছে ভেবে চা বাগানের দুর্দশা লাঘবের যে স্বপ্ন আদিবাসী শ্রমিকরা দেখেছিলেন, তাতেও ধাক্কা লেগেছে। বাগান ছেড়ে শ্রমিকরা এখন দলে দলে ভিনরাজ্যে মজুর হয়েছেন।
উত্তরবঙ্গে তাই বিজেপির নিঃসঙ্গতা বাড়ছে। বিজেপির রাজবংশী বন্ধন যে আলগা হতে শুরু করেছে, তা গত লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার হাতছাড়া হওয়ায় ইঙ্গিত মেলে। তেমনই আদিবাসী সমর্থনে ভাটা পড়ায় আলিপুরদুয়ারে বিজেপির ভোট কমেছে। জনগোষ্ঠীর কিছু কিছু নেতার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জনগোষ্ঠীগত আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বোঝাপড়ায় সন্দেহ, অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয়। উত্তরবঙ্গেও তাই হওয়ায় জনগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বে ভাটা পড়ার যে প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তাতে লাগাম না পরালে পরিস্থিতি বিজেপির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।



