শিলিগুড়ি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি নিয়ে সাগর বাগচীর প্রতিবেদন
নবীন কথা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তৃতীয় সিমেস্টারের ছাত্রী দিয়া দাসের গলায় প্রশংসার সুর, ‘কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয়। প্রতিটি ক্লাসে পড়ুয়াদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর রাখা হয়। তবে পুরো কলেজ সম্পর্কে বলতে গেলে আরও কিছুটা সময় এখানে কাটাতে হবে। এখনও পর্যন্ত অভিজ্ঞতা খারাপ নয়।’ একই বিষয়ের প্রথম সিমেস্টারের পড়ুয়া স্নেহা রায় মনে করেন, পড়াশোনার পাশাপাশি যদি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন কিংবা ফিল্ড ওয়ার্কের ওপর জোর দেওয়া যেত, তাহলে আরও ভালো হয়।
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসেন এই কলেজে। কলেজের আশপাশে পেয়িং গেস্টহাউস, মেসবাড়ি, ফ্ল্যাটে অধিকাংশের আস্তানা। তৈরি হয়েছে কোচিং সেন্টার, ইন্টারনেট ক্যাফে। কলেজ ও সংলগ্ন বাঘা যতীন পার্কের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবারের দোকানগুলোরও বড় ভরসা এই পড়ুয়ারা। স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান কম নয় তাঁদের।
এই যেমন মাইক্রোবায়োলজির পঞ্চম সিমেস্টারের পড়ুয়া দেবর্ষি বর্মন কোচবিহারের মাথাভাঙ্গার বাসিন্দা। বলছিলেন, ‘অনেকের মুখে সুনাম শুনেছি। পরে যখন পড়ার সুযোগ পেলাম, ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আমি কলেজে থাকাকালীন ৭৫ বছরের পূর্তি চলছে। তাই ভালো লাগছে। অন্য শহর থেকে এখানে এসে সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব কি না, সেই চিন্তা ছিল। কিন্তু প্রথম দিন থেকে স্যর, ম্যাডাম আর কলেজের সিনিয়ারদের থেকে সাপোর্ট পেয়েছি। ফলে বিষয়টা খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। ফ্রেশার্স, কলেজের সোশ্যালে আনন্দ হয়।’
দেবর্ষির আর্জি, ‘আমাদের আরও কিছু ক্লাসরুম দরকার। গরমে চাপাচাপি করে বসা যায় না। অসুস্থতা বোধ হয়, অধ্যাপকদের লেকচারে মনোযোগ দেওয়া মুশকিল হয়। এছাড়া এখনও পর্যন্ত তেমন সমস্যা নেই।’
ইংরেজি বিভাগের পঞ্চম সিমেস্টারের সৌমিলি চৌধুরীর কথায়, ‘আমার বাবা সহ বাড়ির বড়দের প্রায় সবাই এই কলেজে পড়তেন। তাই আমারও স্কুলজীবন থেকে ইচ্ছে ছিল ভর্তি হব। বহু কৃতী প্রাক্তনী রাজ্য, দেশ ও বিদেশে সুনাম অর্জন করছেন। এখানে পড়াশোনা করে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র শিলিগুড়ি নয়, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। তাই এই ক্যাম্পাস বৈচিত্র্যময়। তাঁদের সঙ্গে মেলামেশা করে নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারি, জানতে পারি। কলেজ লাইফের প্রতিটা দিন আমার কাছে মেমরেবল। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু বুঝেছি, কিছু ডিপার্টমেন্টে আরও অধ্যাপক প্রয়োজন। আশা করি, সেই সমস্যা তাড়াতাড়ি মিটে যাবে।’
বীজবপন
১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর স্থাপিত হয়েছিল শিলিগুড়ি কলেজ। দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে যে সমস্ত পরিবার এসে বাসা বেঁধেছিল এই অঞ্চলে, মূলত তাদের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার কথা চিন্তা করে এই প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমদিকে কলেজের পঠনপাঠন চলত শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলের ভবনে। পরে বর্তমান জায়গায় পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়। শুরুতে কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। ১৯৬২ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শিলিগুড়ি কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আসে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলা শুরু হয়েছিল এই কলেজের ক্যাম্পাস থেকেই। নবনির্মিত ভবনে ক্লাস হত।
প্রাক্তনীর পরামর্শ
ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল (ন্যাক)-এর মূল্যায়নে শিলিগুড়ি কলেজ বি প্লাস প্লাস গ্রেড পেয়েছে। ভাটনগর পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ডঃ পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী একজন প্রাক্তনী। পার্থ বর্তমানে আইআইটি খড়্গপুরের সেন্টার ফর ওসিয়ান, রিভারস, অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড সায়েন্স বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ‘নয়ের দশকে যখন পড়াশোনা করেছি, তখন কলেজের সুনাম ছিল রাজ্যজোড়া। এখন কিছু কারণে হয়তো ভরসা কমছে। অবশ্যই বহু মেধাবী, পরিশ্রমী ছেলেমেয়ে এখনও পড়ে। তবে একজনের ভরসা হারানোও কিন্তু ভাবনার বিষয়। আমাদের সময়েও কলেজে রাজনীতি ছিল, তবে তার জন্য সার্বিক পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ত না। সেই দিকটি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’
তাঁর পরামর্শ, ‘গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনার মানোন্নয়ন করতে হলে আরও বেশি পরিমাণে আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন। সরকারি সাহায্য দরকার। তাহলে কলেজ স্তর থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে গবেষণা নিয়ে আগ্রহ বাড়বে।’
২০১২ সালের অলিম্পিক্সে অংশগ্রহণকারী টেবিল টেনিস খেলোয়াড় অঙ্কিতা দাস এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন পড়ুয়া। তাঁর কথায়, ‘আমি যখন অলিম্পিক্সে যাই, তখন শিলিগুড়ি কলেজেই পড়তাম। যখন খবরটা জানাজানি হল, তখন সবাই অনেক অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। খেলার সঙ্গে পরীক্ষার দিন ওভারল্যাপ করেছিল একবার। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আমি পরে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিই।’ মহাবিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে তাঁর পরামর্শ, ‘খেলাধুলো ও পড়াশোনা থেকে রাজনীতিকে সবসময় আলাদা রাখা উচিত। কলেজ পলিটিক্স যেন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, মান নষ্ট করতে না পারে- সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। লেখাপড়ার বাইরে খেলাধুলো সহ অন্য অ্যাক্টিভিটিতে উৎসাহ দিতে হবে পড়ুয়াদের। যেন ওরা নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বোঝার ও তা মেলে ধরার সুযোগ পায়।’
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষদিকে ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হবে। তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন প্রাক্তন, বর্তমান পড়ুয়া ও অধ্যাপকরা। সংস্কৃতির উদযাপনে মেতে উঠতে প্রস্তুত সবাই।
স্মৃতিসুখ
‘আমরা যাতে লেখাপড়ায় মন দিই, সেজন্য এক অধ্যাপক লজেন্স খাওয়ানোর লোভ দেখাতেন। সাধারণত স্কুলে বাচ্চাদের এমন লোভ দেখানো হয়। আমরা সেই লোভের বশে রাতদিন পড়াশোনা করতাম। পরীক্ষায় ভালো ফলও হত। যতদূর মনে পড়ছে, সালটা ১৯৯৭। তার বছর চারেক আগে শিলিগুড়ি কলেজে পদার্থবিদ্যা পড়ানো শুরু হয়েছিল’, বলছিলেন ১৯৯৭ ব্যাচের পড়ুয়া ডঃ বিকাশচন্দ্র পাল। বর্তমানে তিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। শিলিগুড়ি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন নিজের কলেজ লাইফে।
বিকাশের কথায়, ‘পরে সেই অধ্যাপকের কাছ থেকে লজেন্স না পেলেও দু’হাত ভরা আশীর্বাদ পেয়েছিলাম। সবসময় অধ্যাপকরা সাহায্য করতেন। উৎসাহ দিতেন। যে কোনও সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় তাঁদের বলতে পেরেছি। অনায়াসে স্যরদের বাড়িতেও চলে যেতাম আমরা।’ তবে তাঁর মতে, কোভিডকালের পর থেকে কলেজের সার্বিক পরিবেশ কিছুটা বদলেছে।
মহীরুহ
শিক্ষার আলো ছড়ানোর মহৎ উদ্দেশ্যে রোপণ করা সেই বীজ আজ মহীরুহে পরিণত। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তার ছায়ায় শিক্ষাগ্রহণ করেছে এবং করে চলেছে। বর্তমানে পড়ুয়া সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার। স্থায়ী অধ্যাপক (সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক পদ মিলিয়ে) ৬২ জন। স্টেট এইডেড কলেজ টিচার পদে রয়েছেন ৩৮ জন। বিজ্ঞান ও কলা বিভাগ মিলিয়ে ২২টি বিষয়ে পড়ানো হয়। ৭ জন অধ্যাপকের পদ খালি রয়েছে। এরমধ্যে পদার্থবিদ্যা, ইংরেজি, নেপালি ও বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে।
মহাবিদ্যালয়ে ভূগোল, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা ও কম্পিউটার ইত্যাদি একাধিক বিষয়ের ল্যাব রয়েছে। সেখানে রয়েছে আধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। শিক্ষানীতি মেনে যেখানে সংস্কার প্রয়োজন, তা করা হবে।
তবে স্থায়ী শিক্ষাকর্মীর অভাব ভাবাচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। গ্রুপ-সি ও ডি মিলিয়ে মাত্র নয়জন স্থায়ী কর্মী রয়েছেন। সেখানে অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ৩৮।
কলেজেরই প্রাক্তনী বর্তমান অধ্যক্ষ ডঃ সুজিত ঘোষ বলছিলেন, ‘আগে আন্তঃকলেজ ও আন্তঃস্কুল পর্যায়ের বিভিন্ন খেলাধুলো হত আমাদের কলেজ মাঠে। তখন যদিও চারদিকে সীমানা প্রাচীর ছিল না। পরবর্তীতে সেই আয়োজন সরিয়ে নেওয়া হয় কাঞ্জনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গনে। কলেজের এনএসএস ও এনসিসি বিভাগ বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। এনএসএস ইউনিট ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছিল।’
খেলাধুলোতেও সুনাম কুড়িয়েছেন বহু পড়ুয়া। দৌড়ে ইন্টার কলেজ কম্পিটিশন থেকে রাজ্য স্তর অবধি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন প্রাক্তনী রমজান আলি। আশরাফ আলি গতবছর এই কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করে বেরিয়েছেন। তিনি হাইজাম্পে ‘খেলো ইন্ডিয়া খেলো’-তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ইন্টার কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের দলে কলেজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বরাবর টেবিলে টেনিসে শিলিগুড়ি মহাবিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে ও মেয়েদের টিমের হয়ে প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। অনেকে চাকরিও পেয়েছেন। অতীতে বহুবার বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন অফ চ্যাম্পিয়নসের শিরোপা পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। ক্রিকেট টিমের ঝুলিতেও প্রচুর খেতাব এসেছে।
শিলিগুড়ি কলেজের গ্রন্থাগার বইপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্যও। বর্তমান অধ্যক্ষের দাবি, প্রায় ৪২ হাজার বই রয়েছে সেখানে। পড়ুয়াদের উৎসাহ দিতে এবছর থেকে চালু হয়েছে বিশেষ পুরস্কার। সারাবছরের ‘এনগেজমেন্ট’-এর বিচারে ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্য থেকে একজন করে বেছে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের তরফে এবার আর্থিক বরাদ্দ মিলেছে। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী আরও বই আনা হবে।
(ছবি: সূত্রধর ও তথ্য সহায়তা: অনিকেত রায়)



