খাবারের ব্যবসা যেন কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে শিলিগুড়িতে। প্রায় দিনই নতুন নতুন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকান খুলছে। সৌজন্যে প্রশাসনের উদাসীনতা আর খাদ্যপ্রেমীদের চোখ বন্ধ রাখার অভ্যেস। আজ দ্বিতীয় কিস্তি
রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: বিরিয়ানির মাংসে পোকা মিলতেই শিলিগুড়িজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল (Siliguri)। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেব একটি যৌথ কমিটি গঠন করেন। তাতে স্বাস্থ্য দপ্তর, খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর, ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তর, পুলিশ, দমকল এবং পুরনিগমের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। পুরনিগমই ওই কমিটির পরিচালক। তারপর কিছুদিন শহরে লাগাতার অভিযান চলেছে।
ওই সময় যে ছবিগুলো দেখেছেন শহরবাসী, তাতে পিলে চমকে ওঠার জোগাড় হয়েছিল। মাশরুমে ছত্রাক, মেয়াদ উত্তীর্ণ সসেজ, নিম্নমানের মশলা- ঝুলি থেকে একের পর এক বিড়াল বেরিয়ে আসে। সেবক রোডের শপিং মলের ফুড কোর্টে একাধিক দোকানকে সতর্ক করা হয়। বাঘা যতীন পার্কে একটি দোকানে ঢুকে কমোডের পাশ থেকে মেলে বিরিয়ানি, মাংস। এমন দু’তিন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন দলের সদস্যরা। কিন্তু তারপর?
আচমকা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেন কমিটির সদস্যরা। কোথায় গেল সেই সংগৃহীত নমুনার ফলাফল? নমুনা পাঠানোর কথা ল্যাবরেটরিতে। সেখান থেকে আসা রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। রিপোর্ট প্রকাশ্যে এলে হয়তো সাবধান হতেন খাদ্যপ্রেমীরা। কিন্তু নমুনার হদিস সম্পর্কে স্পষ্ট উত্তরই দিতে পারলেন না খোদ স্বাস্থ্যবিভাগের মেয়র পারিষদ। দুলাল দত্তর কথায়, ‘ওটা সরাসরি স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে দেখা হয়। তাই আমার কাছে কোনও তথ্য নেই।’ রিপোর্ট প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিল দার্জিলিংয়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তুলসী প্রামাণিককে। তিনিও কিছু জানেন না। তুলসীর বক্তব্য, ‘আমাকে শুনতে হবে, কী হয়েছে। কত নমুনা পরীক্ষায় গিয়েছে, সে ব্যাপারেও খোঁজ নিতে হবে। নিশ্চয়ই রিপোর্ট এসেছে।’ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখে সতর্ক হওয়া ব্যবসায়ীরা আগের ছন্দেই ফিরেছেন। স্বাস্থ্যবিধি লাটে তুলে রমরমিয়ে বিক্রিবাটা চলছে।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের চম্পাসারিতে একটি দোকান থেকে বিরিয়ানি কেনার পর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্যাকেট খুলতেই মাথায় হাত পড়ে এক তরুণের। তিনি সঙ্গে সঙ্গে দোকানে এসে পোকা ধরা মাংস নিয়ে হইচই জুড়ে দেন। এরপর একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করে। তৎপর হন মেয়র। তড়িঘড়ি সমস্ত দপ্তরকে ডেকে বৈঠক করে কমিটি গড়ে দেন। পুরনিগমের নজরদারিতে থাকা ওই কমিটি প্রতি শুক্রবার করে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সরাসরি মেয়রকে রিপোর্ট দেওয়ার কথা। যদিও, কিছুদিনের মধ্যেই সেটা বন্ধ হয়ে গেল। কেন? সরাসরি জবাব এড়িয়ে মেয়র গৌতম দেব বলছেন, ‘আমি সব আবার শুরু করাচ্ছি।’
খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, অভিযান চালাতে স্বাস্থ্য দপ্তরের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের অনীহা ভীষণরকম। তিন থেকে চারবার রিকুইজিশন গেলে একবার অভিযানে বেরোচ্ছেন কর্মীরা। শহরের বিভিন্ন অংশ ঘোরার কথা থাকলেও বাঘা যতীন পার্ক ও আশপাশ ঘুরেই ক্ষান্ত হন তাঁরা। কার্যত দায়সারা গোছের কাজ চলা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল প্রশাসনের অন্দরেই।
সূত্রের খবর, বিষয়টি মেয়রের কানেও গিয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের এমন অনীহার কারণ কী, এতদিনেও নমুনার রিপোর্ট প্রকাশ্যে এল না কেন, যদিও বা এসেই থাকে তবে পরবর্তী পদক্ষেপ কবে করা হবে ইত্যাদি প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া গেল না সিএমওএইচ-এর কাছে। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বলছেন, ‘আমি জানি না। ডেপুটি সিএমওএইচ জানেন।’

