শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি: দিনকয়েক আগের কথা। গোষ্ঠ পাল মোড় সংলগ্ন একটি বার থেকে বেরিয়ে মদ্যপ দুই গোষ্ঠী রাস্তায় হাতাহাতিতে জড়ায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরে দারুণ তর্কাতর্কি। হুজ্জতির একশেষ। পুলিশের টহলদারি ভ্যান যখন এলাকায় পৌঁছায়, তখন হল্লাবাজদের বেশিরভাগই হাওয়া। আরও মাস চারেক আগে পিছিয়ে যাওয়া যাক। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাছড়া মাঠে দু’পক্ষের মধ্যে সেবারে ব্যাপক ঝামেলা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাল বটে। তবে ততক্ষণে ২০ মিনিট পেরিয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রেও আগের ঘটনারই ‘অ্যাকশন রিপ্লে’। প্রত্যক্ষদর্শী বিপিন দাস বললেন, ‘এটাই তো স্বাভাবিক। দুষ্কর্ম করার পর কেউ তো আর পুলিশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না।’
দিনেরবেলায় শহরে (Siliguri) গণ্ডগোল বা হোক কোনও অসামাজিক কাজ, অ্যাকশন নিতে পুলিশের সেভাবে দেরি হয় না। কিন্তু রাতেরবেলায়? সমস্যা সামাল দিতে পুলিশেরই রীতিমতো নাভিশ্বাস ওঠার জো। হওয়ারই কথা। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের বিভিন্ন থানার অধীনে টহলদারি ভ্যানের সংখ্যার যা পরিস্থিতি তাতে রাতেরবেলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের কাছে দিনকে দিন আরও মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শহরে রাতের টহলদারি ভ্যানগুলির হাল একবার দেখে নেওয়া যাক। প্রধাননগর থানা এলাকার চম্পাসারি মোড় থেকে গুলমা পর্যন্ত একটি, দার্জিলিং মোড় থেকে শালবাড়ি পর্যন্ত একটি আর শিলিগুড়ি জংশন থেকে গুরুংবস্তি সহ দার্জিলিং মোড় পর্যন্ত আরেকটি ভ্যান টহলদারি চালায়। ভক্তিনগর থানা এলাকার জন্য রাতে শুধুমাত্র দুটি টহলদারি ভ্যান রয়েছে। একটি পায়েল মোড় থেকে চেকপোস্ট সহ সংলগ্ন জ্যোতিনগর থেকে হায়দরপাড়া পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। অন্যটি চেকপোস্ট থেকে ভক্তিনগর থানা এলাকার শেষপ্রান্ত বেঙ্গল সাফারি অবধি ঘোরাফেরা করে। নিউ জলপাইগুড়ি থানার অধীনে ফুলবাড়ির জন্য একটি ভ্যান রয়েছে। আরেকটি ভ্যান ঠাকুরনগর বাড়িভাসা হয়ে স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকায় ঘোরে। তৃতীয়টি শক্তিগড়, লেকটাউন সহ আশপাশের জায়গা দেখে।
অন্যদিকে, শিলিগুড়ি থানার সুভাষপল্লি, ডাবগ্রাম ও আশিঘর পর্যন্ত একটি ভ্যান ঘোরাফেরা করে। একটি ভ্যান দেবাশিস কলোনি, মিলনপল্লি আর টিকিয়াপাড়ার দায়িত্ব সামলায়। পানিট্যাঙ্কি ও খালপাড়া ফঁাড়ির জন্য একটি করে ভ্যান রয়েছে। শুধুমাত্র হিলকার্ট রোডের জন্য একটি ভ্যান রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। খাতায়-কলমে রাতের শহরের জন্য ১৩টি টহলদারি ভ্যান রয়েছে। সংখ্যাটি অনেক বলে মনে হলেও এই শহর রোজকে রোজ যেভাবে বাড়ছে তাতে এই ক’টি ভ্যানে ঠিকমতো সককিছু সামাল দেওয়া দায়।
অয়ন দাস ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করেন। কাজের সূত্রে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় থাকতে হয়। তাঁর কথায়, ‘গভীর রাতে অনেককেই অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় রাস্তায় মারামারি করতে দেখি। পাশ দিয়ে ভয়ে ভয়ে যেতে হয়। সেই সময় পুলিশের ভ্যান রাস্তায় কিন্তু খুব একটা দেখা যায় না।’ বেসরকারি সংস্থার কর্মী বিমল দাসেরও একই অভিজ্ঞতা। বিপদে পড়ে কেউ ১০০ নম্বরে ডায়াল করলে কমিশনারেটের কন্ট্রোল রুমে ফোন যায়। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট থানাকে অবগত করা হয়। তারপর সেইমতো টহলদারি ভ্যানে খবর যায়। এতে যতটা সময় লাগে, দুষ্কৃতীদের হেসেখেলে এলাকা ছাড়তে কোনও সমস্যাই হয় না। টহলদারি ভ্যানের সংখ্যা পর্যাপ্ত হলে সমস্যা হত না বলে পুলিশেরই একাংশের দাবি। শিলিগুড়ির ডিসিপি (ইস্ট) রাকেশ সিংয়ের অবশ্য বক্তব্য, ‘যে ক’টা টহলদারি ভ্যান রয়েছে, সেগুলি দিয়েই আমাদের কাজ চালাতে হবে।’
শহরে সিসি ক্যামেরারও অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরায় শহরকে মুড়ে ফেলা হোক বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। তাতে নজর রেখে পুলিশকর্মীরা যাতে টহলদারি ভ্যানগুলিকে খবর দিতে পারেন সেই দাবিও উঠেছে। ডিসিপি’র (ইস্ট) অবশ্য বক্তব্য, ‘কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে রাতে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে টহলদারি ভ্যানকে জানানো হয়।’ আরও সিসি ক্যামেরা বসানোর বিষয়ে কথাবার্তা চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

