রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: বিধানসভা ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাজেটে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী পর্যন্ত হাইস্পিড রেলওয়ে (Siliguri-Varanasi High Speed Rail) করিডর ঘোষণার সিদ্ধান্ত ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিজেপি কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে ব্যাখ্যা করলেও, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল এমন ঘোষণাকে গিমিক বলে দাবি করেছে। উত্তরবঙ্গের বণিক মহল মনে করছে, এই রেল করিডর মূলত চিকেন নেক এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই করা হচ্ছে। এর বাস্তবায়ন হলে উত্তরবঙ্গের কিছুটা লাভ হতে পারে। এই বাজেট পর্যটনশিল্পকেও হতাশ করেছে। শুধুমাত্র একটা হাইস্পিড রেল করিডরের ঘোষণা দিয়ে উত্তরবঙ্গের পর্যটনে সেভাবে কোনও লাভ হবে না বলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করেছেন।
রবিবার কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হাইস্পিড রেলওয়ে করিডর তৈরির ঘোষণা করেছেন। যা বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি ও বারাণসীর মধ্যে চলাচল দ্রুততার হবে। তবে, কেন্দ্রের এই ঘোষণা উত্তরবঙ্গের বণিক মহলকে খুব বেশি খুশি করতে পারেনি। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সতীশ মিত্রুকার বক্তব্য, ‘হাইস্পিড রেল করিডর উত্তরবঙ্গের জন্য বড় প্রাপ্তি। এর বাস্তবায়ন হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে উত্তর ভারতের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। তবে, এই রেল করিডর ছাড়া উত্তরবঙ্গের মানুষকে খুশি করার জন্য বাজেটে কিছু নেই।’ বাজেট নিয়ে হতাশা উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ী মহলেও। ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, নর্থবেঙ্গলের (ফোসিন) সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাসের বক্তব্য, উত্তরবঙ্গের গুরুত্ব অনুযায়ী হাইস্পিড ট্রেন এখানে একদিন দিতেই হত। এতে নতুন কিছু নেই।
প্রাক বাজেট প্রস্তাবে আমাদের দাবি ছিল, শিলিগুড়ি থেকে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি হয়ে আলুয়াবাড়ি পর্যন্ত চক্ররেল চালুর। যা হলে এখানকার অর্থনীতি আরও উন্নত হত। কিন্তু বাজেটে তার কোনও প্রতিফলন নেই। ফলে সাধারণ, মধ্যবিত্ত মানুষের কোনও লাভই হল না।’
কেন্দ্রের বাজেটে (Union Budget) অবশ্য উল্লসিত বিজেপি (BJP)। দার্জিলিংয়ের সাংসদ তথা বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র রাজু বিস্টের বক্তব্য, ‘শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হাইস্পিড রেল করিডর বাস্তবে দিল্লির সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ আরও সহজ এবং দ্রুততম হবে। এই রেল করিডর একটা ঐতিহাসিক ঘোষণা। এর ফলে উত্তরবঙ্গ শুধু নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য রাজ্যগুলির মানুষের যাতায়াত এবং পর্যটনশিল্পের উন্নতি ঘটবে।’
রেল করিডরের ফলে পর্যটনশিল্পের কিছুটা যে সুফল মিলবে তা স্বীকার করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের (এইচএইচটিডিএন) সম্পাদক সম্রাট সান্যাল মনে করেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত হবে, পর্যটনের ক্ষেত্রে ততই সুফল মিলবে। সেদিক থেকে শিলিগুড়ি-বারাণসী রেল করিডর উত্তরবঙ্গের পর্যটনের জন্য ভালো খবর। তবে, এর বাইরে পর্যটনশিল্পের জন্য বাজেটে কিছু নেই। বুদ্ধিস্ট সার্কিটে অরুণাচল, মণিপুরের উল্লেখ থাকলেও দার্জিলিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি হিমালয় সংলগ্ন কিছু পর্যটনস্থলে হাইকিং, ট্রেকিং, বার্ড ওয়াচিংয়ের উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে উত্তরাখণ্ড, তামিলনাডু, গোয়া, জম্মু-কাশ্মীরের উল্লেখ থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে দার্জিলিং নেই। অথচ এখানে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’
হাইস্পিড রেল করিডরের ঘোষণাকে গিমিক বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের দার্জিলিং জেলা চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রুয়ালের বক্তব্য, ‘উত্তরবঙ্গের মানুষকে বোকা বানানোর জন্য বাজেটে রেল করিডরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের পর্যটনের জন্য বাজেটে কোনও উল্লেখ নেই। এই বাজেটে আমরা হতাশ।’
প্রাক্তন পুরমন্ত্রী সিপিএমের অশোক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হাইস্পিড রেলওয়ে করিডরের ঘোষণা হয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু বাজেটে উত্তরবঙ্গ কী পেল? উত্তরবঙ্গ এত সাংসদ ও বিধায়ক দিয়েছে বিজেপিকে, কিন্তু এখানকার বেসিক সমস্যার সমাধানের প্রতিফলন নেই বাজেটে।’

