তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: ভোটের বাদ্যি বাজলেই একসময় যাঁরা দম ফেলার ফুরসত পেতেন না, ডিজিটাল যুগের দাপটে আজ তাঁদের অধিকাংশই ব্রাত্য। প্রার্থীর নাম আর প্রতীক আঁকার তুলি-রং এখন কার্যত বাক্সবন্দি। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে শিলিগুড়ির (Siliguri) দেওয়াল লিখনশিল্পী থেকে শুরু করে স্থানীয় ছোট প্রিন্টিং প্রেসের মালিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। প্রচারের ধরন বদলে যাওয়ায় কাজ হারিয়ে ধুঁকছেন আশিঘর বা দেশবন্ধুপাড়ার অভিজ্ঞ শিল্পীরা।
শিলিগুড়ির আশিঘরের বাসিন্দা সনাতন রায় দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দেওয়াল লিখনের কাজ করছেন। আগে ভোটের মাসখানেক আগে থেকেই দিনরাত এক করে কাজ আসত সব দল থেকে। অথচ এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সনাতনের আক্ষেপ, ‘এখনও পর্যন্ত বামপন্থী দল ছাড়া আর কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’ একই পরিস্থিতি ৩০ বছর ধরে এই পেশায় থাকা দেশবন্ধুপাড়ার সৌমেন বর্মনেরও। বেসরকারি সংস্থার কর্মী সৌমেনের কাছে নির্বাচনের মরশুম ছিল উপরি আয়ের বড় সুযোগ, যা এবার শূন্যই।
শিল্পীরা মনে করেন, ডিজিটাল প্রচার অনেক বেশি সাশ্রয়ী। দেওয়াল খুঁজে পাওয়া, শিল্পী ও রঙের খরচ এবং ভোট শেষে সেই দেওয়াল মুছে ফেলার ঝক্কি অনেক বেশি। সেই জায়গায় ফ্লেক্স বা ব্যানারে প্রচার অনেক সহজ।
কিন্তু বাস্তবে সমস্যা আরও গভীরে। স্থানীয় প্রিন্টিং প্রেসের মালিকদের অভিযোগ, তৃণমূল বা বিজেপির মতো বড় দলগুলির প্রচারসামগ্রীর সিংহভাগই এখন সরাসরি কলকাতা বা ভিনরাজ্য থেকে তৈরি হয়ে আসছে। ফলে স্থানীয় বাজারের ঝুলি শূন্যই থাকছে।
শিলিগুড়ি পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার এবং বিজেপি নেতা রথীন বসু- দুজনেই স্বীকার করে নিয়েছেন, পতাকা ও ফ্লেক্সের মতো সামগ্রী মূলত দলের রাজ্য দপ্তর থেকে পাঠানো হচ্ছে।
বিধান মার্কেটের ব্যবসায়ী অভিজিৎ দাস বা দেশবন্ধুপাড়ার দীপেন দত্তরা চাতক পাখির মতো অর্ডারের অপেক্ষায় থাকলেও বড় কাজ এখনও অবধি জোটেনি। গত নির্বাচনেও যেখানে ভিনরাজ্যের এজেন্সি মারফত কাজ আসত, এবার তা অধরা।
তবে ব্যতিক্রমী পথে হাঁটছে সিপিএম। জেলা কমিটির সদস্য শরদিন্দু চক্রবর্তীর দাবি, তাঁরা স্থানীয় শিল্পীদের প্রাধান্য দিয়ে স্থানীয়ভাবেই প্রচার সামগ্রী তৈরি করাচ্ছেন। ডিজিটাল বিপ্লব আর ‘সেন্ট্রালাইজড’ প্রচারের এই যুগে শিলিগুড়ির প্রান্তিক শিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব এখন সত্যিই সংকটে।

