তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: ভোর পাঁচটায় তখনও সূর্যের আলো ঠিকমতো ফোটেনি, সেসময়েই তাঁদের দিন শুরু হয়। ওঁদের কেউ পরিচারিকা, কেউ দিনমজুর। দিনভর বাইরের কাজ, বাড়িতে এসে সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পর শুরু হয় লড়াই। হাতে তুলে নেন লাল পতাকা। জ্যোৎস্না, নীলিমা, মুক্তি, পূজা, সাকিরাদের তৈরি ঝান্ডা লাগানো হয় শহরজুড়ে। মিছিলে লালঝান্ডা হাতে নিয়ে হাঁটেন সিপিএমের হাজারো কর্মী-সমর্থক। এই কাজের কোনও পারিশ্রমিক নেই, স্রেফ ভালোবাসার টানে আদর্শের স্বার্থে নীরবে কাজ করেন তাঁরা।
বিধানসভার ভোটের আগে স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ততা বেড়েছে জ্যোৎস্না, সাকিরাদের। শিলিগুড়ি (Siliguri) পুরনিগমের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জ্যোৎস্না সরকার গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির শিলিগুড়ি ২ নম্বর লোকাল কমিটির সদস্য। পরিচারিকার কাজের জন্য সকাল সকাল তাঁকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে হয়। বাড়িতে স্বামী থাকলেও তাঁর হাতে তেমন কাজ নেই। ছেলের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে সংসার সামলে তারপর কাজে বেরিয়ে যান। জ্যোৎস্নার কথায়,‘বহু বছর ধরে এই দলের সঙ্গে যুক্ত। আমরা যদি ঝান্ডা তৈরিতে হাত না লাগাই, তাহলে এই কাজগুলো কে করবে? চারটে বাড়িতে কাজ করে অনেকটা সময় চলে যায়। তাই অনেকসময় রাত জেগেও ঝান্ডা বানাই।’


দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার মুক্তি দাসের। তাঁর একার ওপরেই সংসারের দায়িত্ব। মেয়েরা স্কুলে পড়াশোনা করে। রান্নার কাজ করা মুক্তি দাস বললেন, ‘এটা আমাদের কাছে শুধু কাপড়ের টুকরো নয়, এটা হল অধিকার আদায়ের প্রতীক। সারাদিন কাজ শেষে যখন বাড়ি ফিরি, তখন এই পতাকা তৈরির কাজ করে মনে হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করছি।’
নির্বাচন মানে যখন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দাপট আর মোটা টাকার খেলা, তখন এই খেটেখাওয়া মহিলারাই সিপিএমের অন্যতম শক্তি। প্রার্থী যখন রাস্তায় নেমে দলের হারানো মাটি ফেরাতে দিনরাত প্রচার করছেন, সেসময়ে পিছনে থেকে আন্দোলনের ঝান্ডার জোগান দিচ্ছেন এই মহিলা বাহিনী।
তাঁদের তৈরি ঝান্ডাই স্থান পাচ্ছে সিপিএমের সভা, মিছিল বা সাধারণ মানুষের ঘরের চালে। স্বর্ণ স্কিমের এজেন্টের কাজ করেন সাকিরা রাম। ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ছে। বাড়িতে ছেলে, স্বামীর জন্য খাবার তৈরি করা থেকে ঘরের সব কাজ সামলে তিনি এই ঝান্ডা তৈরির কাজ করেন। তাঁর কথায়, ‘সারাদিন বাইরে কাজ করে রাতে ফাঁকা সময়ে এই ঝান্ডা তৈরির সময় নিজেদের খুব শক্তিশালী মনে হয়। অনেক সময় রাত দুটো-তিনটে বেজে যায়। কিন্তু শরীর ক্লান্ত হলেও হাল ছাড়ি না।’
দিনের শেষে তাঁরা যে শুধু শ্রমিক নন, লালঝান্ডার একজন কারিগরও। এরকম লড়াকু মহিলাদের জন্যই দলকে জিততে হবে বলে মন্তব্য শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু চক্রবর্তীর।

