তাপস গিরি, কলকাতা: শিলিগুড়ি হোক বা মালদা, কোচবিহার কিংবা রায়গঞ্জ… সারাদিন হাড়ভাঙা খাটনির পর সন্ধেবেলা বসার ঘরে পরিবারের সঙ্গে নতুন কেনা ঝকঝকে স্মার্ট টিভিতে (Smart TV) বিনোদনের খোঁজ এখন মধ্যবিত্তের রোজকার অভ্যেস। ইদানীং বাজারে জলের দরে বিক্রি হচ্ছে বড় বড় পর্দার স্মার্ট টিভি। কখনও ভেবে দেখেছেন, টিভি কোম্পানিগুলো এত সস্তায় বিক্রি করছে কেন? উত্তর শুনলে শিউরে উঠবেন। এখানে পণ্য আসলে টিভি নয়, পণ্য আপনি নিজে! আপনি যখন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সিনেমায় বুঁদ, তখন ওই কালো স্ক্রিনটা আপনার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
আধুনিক স্মার্ট টিভি আর শুধু বোকা বাক্স নয়, আপনার ঘরের অন্দরমহলে সে এক ধুরন্ধর গুপ্তচর (Privacy Risks)। খাতায়-কলমে এই ভয়ংকর প্রযুক্তির নাম ‘অটোমেটিক কনটেন্ট রিকগনিশন’ (এসিআর)। সহজ কথায়, এমন এক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যা আপনি টিভিতে কী দেখছেন, তা অডিও এবং স্ক্রিনের পিক্সেল বিশ্লেষণ করে নিমেষে চিনে ফেলে (ACR Technology)।


ভাবছেন শুধু নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবে বোধহয় এই নজরদারি? একেবারেই না। পেনড্রাইভ লাগিয়ে বাড়ির পুরোনো ছবি দেখা হোক, কিংবা এইচডিএমআই কেবল দিয়ে ল্যাপটপজুড়ে ব্যাংকের কাজ বা অফিসের কনফিডেনশিয়াল মিটিং- যাই করুন না কেনও, এসিআর-এর নজরদারি থেকে কিছুই বাদ যাচ্ছে না। টিভির ভেতরের এই প্রযুক্তি আপনার স্ক্রিনের প্রতিটি পিক্সেল স্ক্যান করে আপনার রুচি, স্বভাব, আয় ও বিশ্বাসের রাজনৈতিক মতাদর্শের নিখুঁত ‘প্রোফাইল’ তৈরি করছে।
তারপর? তারপর সেই বহুমূল্য ডেটা কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে থার্ড পার্টি বা তথ্য-দালালদের কাছে। আন্তর্জাতিক স্তরে এই তথ্য চুরি নিয়ে তোলপাড় চলছে। আমেরিকায় গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া ডেটা হাতানোর অপরাধে ভিজিও সহ একাধিক নামী টিভি প্রস্তুতকারক সংস্থাকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে। ইউরোপেও কড়া আইন আনা হয়েছে।
কিন্তু আমাদের দেশে ছবিটা কেমন? অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, প্রথম সারির ব্র্যান্ডগুলোর স্মার্ট টিভিতে এই প্রযুক্তি প্রায়শ আগে থেকে ‘অন’ করা থাকে। প্রথমবার টিভি চালু করার সময় সফটওয়্যার আপডেটের নামে পাতার পর পাতা শর্তাবলি দেওয়া হয়। আমরা না পড়েই অন্ধের মতো ‘আই এগ্রি’ বোতামে চাপ দিই। সাইবার বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘কনসেন্ট ফ্যাটিগ’ বা সম্মতি দেওয়ার ক্লান্তি। এই ভুলেরই চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ইনটেক্সের মতো কিছু দেশীয় কোম্পানি অবশ্য দাবি করে, তারা সরাসরি নজরদারি চালায় না, প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাজারের তাবড় কোম্পানিগুলো নিজেদের ডেটা পলিসি নিয়ে একেবারে কুলুপ এঁটে থাকে। ভারতে সদ্য কার্যকর ‘ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী স্মার্ট টিভি প্রস্তুতকারকদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারা কেন তথ্য নিচ্ছে তা গ্রাহককে পরিষ্কার করে জানানোর। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম খাতায়-কলমে বন্দি।
তাহলে বাঁচার উপায় কী? সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিভির সেটিংসের গভীরে গিয়ে ‘ভিউয়িং ডেটা’ বা ‘ইন্টারেস্ট-বেসড অ্যাডভার্টাইজিং’ অপশনগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। খুব প্রয়োজন না হলে টিভিকে বাড়ির ওয়াই-ফাই বা ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, আধুনিক ড্রয়িংরুমে স্মার্ট টিভি এখন এক দ্বিমুখী আয়না। রিমোটের বোতাম টেপার আগে তাই অন্তত দু’বার ভাবুন- টিভির পর্দায় চোখ রাখার সময় আর কে কে নিঃশব্দে আপনার দিকে নজর রাখছে!

