রূপায়ণ ভট্টাচার্য
এই বাংলা আর ওই বাংলা একটা জায়গায় এসে এখন একেবারে একাকার।
আপনার পক্ষে মতামত দিলে আমি সেরা বক্তা, সেরা লোক। আপনার বিপক্ষে মন্তব্য করলেই আমি নরকের কীট, বাজে লোক। দু’পক্ষেরই গুণ দোষ নিয়ে বললে আপনি নাকি মেরুদণ্ডহীন। তখন বলা হবে ঝাঁঝ নেই আপনার।
আরও একটা কথা। সবাইকে সব বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতেই হবে। করতেই হবে। নইলে আপনি এ সমাজের যোগ্য নন।
গোবরডাঙ্গায় তরুণীর ওপর হাওড়ার মদ্যপ সরকারি কর্মীর অশ্লীল আক্রমণ থেকে শুরু করে আমেরিকার ইরানে আক্রমণ… সব ব্যাপারেই সবাইকে বলতেই হবে কিছু না কিছু! প্রত্যেকেরই কিছু বলার আছে! টিভি দেখে শেখা অবশ্য। একই লোক রাজনীতি, সমাজচর্চা, সাহিত্য, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে বলে যেতে পারেন দিব্যি! এক্সপার্ট! এক্সপার্ট!
এবং প্রত্যেকেই হারার পাত্র নয়। হারলেও বলবে, আমি জিততাম। আমাকে জোর করে হারানো হয়েছে। বাংলাদেশে যেমন কচি ছাত্র নেতারা হেরে গিয়ে বলতে আরম্ভ করেছেন, তাঁদের নাকি জোর করে হারানো হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media) থাকার জন্যই যে যাঁর মন্তব্য করতে পারেন ইচ্ছেমতো। অদ্ভুত অদ্ভুত মন্তব্য শোনা যায়! ঢাকার এক ছাত্র নেতা যেমন হেরে গিয়ে বলেই দিয়েছেন, বিএনপি (BNP) এবং আওয়ামী লিগ (Awami League) মিলেই আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। ধর্মের ষাঁড়ের পিঠে বসে হেরেও কথা কমেনি জামায়াতে নেতাদের। এই বাংলার ভোটেও এমন মন্তব্য শোনার জন্য তৈরি থাকুন। সিপিএম থেকে অধীর চৌধুরী- দু’পক্ষই বলবেন আমাদের জোর করে হারানো হয়েছে!
আপনার মত আমার সঙ্গে না মিললেই মুশকিল। আপনি এখন আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ লোকদের একজন। ফেসবুকে কেউ কোনও পক্ষের হয়ে লাগামহীন বলে গেলে তাকে ধন্য ধন্য করবে কেউ। গালাগাল দেবে আরেক দল। উলটোটা করলে আরেকরকম প্রতিক্রিয়া। কিন্তু আপনি যদি ধীরেসুস্থে দু’পক্ষেরই হয়ে মন্তব্য করেন, দু’পক্ষেরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন, পাবলিক খাবে না। অনেকদিন ধরে এই জিনিস দেখছি। এখন সেটা আরও বেশি। এখন আপনার ছেলেবেলার বন্ধুও ফোনে আপনার সঙ্গে তর্ক করবে না। ফেসবুকে গিয়ে কমেন্ট বক্সে উলটো-পালটা লিখে দেবে।
লোকে এখন বেশি পড়াটড়ার দিকেও যায় না। টিভি দেখার দিকেও লোকের নজর কম হতে চলেছে।
আপনি হয়তো দু’বার মমতার কড়া সমালোচনা করে তৃতীয়বারে মোদির তীব্র সমালোচনা করলেন। মোদির ভক্তরা নেমে পড়বে মাঠে, আরে তুই তো চটি চাটা বলেই কথা বলিস। আপনি হয়তো দু’বার মোদির সমালোচনা করে তৃতীয়বার মমতার কড়া সমালোচনায় নামলেন। আপনাকে শুনতে হবে, তুই তো গোদি মিডিয়ার অংশ। দেশজুড়ে ঘৃণা ছড়াচ্ছিস শুধু।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তুইতোকারি কোনও ব্যাপার না। সম্পূর্ণ অচেনা লোককে তুইতোকারি করে চলে যাবে অনেকে। তাহলে আর গোবরডাঙ্গার অশ্লীল কথাবার্তা বলা লোকটার সঙ্গে কী থাকল ফারাকটা?
ওই লোকটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে বলছে, অন্যায় হয়ে গেছে। মদ খেয়ে নেশার ঘোরে কী বলেছি মনে নেই। মৌচাক সিনেমায় উত্তমকুমারের লিপের গানের মতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজেবাজে কথা বলে, পুলিশি চক্করে না পড়লে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই নেই। এখানে বরং বলা হবে, বেশ করেছি বলেছি। মৌচাক সিনেমাতেই মিঠু মুখার্জির লিপে বিখ্যাত গানের মতো।
বাংলাদেশে দাদুর বয়সি একটি লোক বছর পাঁচেকের বালিকাকে খুন করেছে ধর্ষণ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম দাদুর হয়েও বলার জন্য কিছু লোক গজিয়ে গেছে পদ্মাপারে। পৃথিবী আজকাল কত ‘সুন্দর’ এই সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে!
সোশ্যাল মিডিয়ায় রিচ বাড়ানোর জন্য ক্যালিফোর্নিয়া থেকে হালিশহরে এসে দিদি বৌদিরা তাঁর শাশুড়ির শেষযাত্রার লাইভ বর্ণনা দেন। সেটা নিয়ে আবার প্রচুর মিডিয়া স্টোরিও করে। সন্তান মারা যাওয়ার পরেও বাবা-মা লাইভ রেকর্ডিং-এর জন্য স্টুডিওতে চলে আসছেন। প্রচারের লোভ সামলাতে পারছেন না।
বাঙালির আর নতুন আইকন নেই বলে খেলা ছাড়ার ১৮ বছর পরেও অর্ধেক বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং-এ এখনও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মুখ। শিলিগুড়ির স্থানীয় বিজ্ঞাপনেও গুরুত্ব পান না রিচা ঘোষ বা ঋদ্ধিমান সাহা। বাঙালি নতুন মেগাস্টার ফুটবলার তুলতে পারে না, ক্রিকেটার তৈরি করতে পারে না, অভিনেতা-অভিনেত্রীও নয়।
ওপার বাংলাতেও একই অবস্থা। নতুন সংস্কৃতিমন্ত্রী এসে বলেছেন, ‘আমাদের লতা মঙ্গেশকর, সোনু নিগম ও নেহা কক্কর তৈরি করতে হবে। যারা গান গেয়ে কোটি কোটি টাকা রোজগার করবে।’ সোনু নিগম পর্যন্ত তাও ঠিক আছে, তাই বলে রুনা লায়লা-সাবিনা ইয়াসমিনদের দেশে নেহা কক্কর? সোশ্যাল মিডিয়ায় সংস্কৃতিমন্ত্রী তোপের মুখে। তিনি আবার একমাত্র হিন্দু মন্ত্রী!
এখন তো দুই বাংলায় কোনও সমস্যা হলেই ‘কীসের কুসুম’ বলে লাফ দিয়ে পড়ে টিভি অ্যাঙ্কর থেকে দোকানদার, জমাদার। সব একাকার। সব বিতর্কেই চলে আসে হিন্দু-মুসলমান। চলে আসে মানে জোর করে নিয়ে আসা হয়। ধর্মের ষাঁড়েরা গুঁতোগুঁতি করেই চলে। এসবের মধ্যেই সবে একুশে ফেব্রুয়ারি গেল বলে ভাষাপক্ষের রেশ যায়নি। তাই বাংলা ভাষা নিয়েও কিছু বলা দরকার, না? যে ভাষা হয়ে উঠেছে খিল্লিবাজির একটা অংশ।
এককালে বাঙালি বানান ভুল করলে লজ্জায় মাথা নীচু করত। আর এখন? এখন বানান ভুল করাটা একটা ‘স্টাইল’। ঠিক যেমন ধনতেরাস, রামনবমী পালন হয়ে উঠেছে বাঙালির স্টাইল। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ‘লক্ষ্মী’ হয়ে গেছে ‘Laxmi’, আর ‘খুব ভালো’ হয়েছে ‘kb vlo’। যুক্তাক্ষর তো এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। আমাদের কিবোর্ডে এখন ‘অ-আ-ক-খ’র চেয়ে ‘LOL’, ‘OMG’ আর ‘ROFL’-এর দাপট বেশি। এসব চলবে আবার পাশাপাশি ভুল খবর ছড়ানোর খেলাও চলবে। কখনও অনিচ্ছাকৃত, কখনও ইচ্ছাকৃত। হোয়াটসঅ্যাপ প্রাইমারি স্কুল, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে ঘোরাঘুরি করা ভুল খবরও বিবিসি’র খবর হিসেবে দেখেন অনেকে। চেক-রিচেকের বালাই নেই কোনও।
এর মধ্যে আবার সব আবেগ আটকে গেছে নানা ইমোজির বৃত্তে। কেউ মারা গেছে ফেসবুকে খবরটা জেনে লোকে শুধু ইমোজি বা আরআইপি দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। বিস্তৃতভাবে শোকপ্রকাশ করছে না। অবস্থা এমন যে, কোনওদিন হয়তো শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণপত্রেও লোকে ‘ওম শান্তি’র পাশে একটা কান্নার ইমোজি দিয়ে দেবে।
বাঙালির প্রিয় শব্দ এখন ‘কনটেন্ট’। কেউ রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে তোলার আগে লোকে ভাবে, ‘ভিডিওটা করলে ভাইরাল হবে তো?’ ভাষার মধ্যে এখন ঢুকে পড়েছে ‘রিচ’, ‘এনগেজমেন্ট’ আর ‘অ্যালগরিদম’।
সবাই বলছে, ফেসবুকের কমেন্ট বক্স এখন আধুনিককালের কুরুক্ষেত্র। সেখানে শুদ্ধ ভাষার চেয়ে ‘বাঁশ’ দেওয়া বা ‘রোস্ট’ করার ভাষাই বেশি চলে। নামী লেখকও নিজের ওজন ভুলে নেমে পড়েন হাস্যকর মন্তব্যে। কেউ হয়তো খুব কষ্ট করে একটা কবিতা লিখল, নীচে কেউ এসে কমেন্ট করল— ‘ভাইটু কি গাঁজা খাও?’
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোথাও একটা পড়েছিলাম, ‘আজকের ওয়েদারটা খুব ক্লাউডি, মনটা ভীষণ স্যাড-স্যাড লাগছে’- এই বাক্য শুনলে বঙ্কিমচন্দ্র নির্ঘাত আবার বিষবৃক্ষ লিখতেন, তবে এবার বিষটা নিজে খাওয়ার জন্য!
সোশ্যাল মিডিয়া বাঙালির অত্যাধুনিক, হাল ফ্যাশনের ভাষাকে হয়তো একটু পালটে দিয়েছে, তাকে রংচঙে করেছে, স্মার্ট করেছে- কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে ভাষার সেই মায়া আর গাম্ভীর্যকেও কিছুটা ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’-এর ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছে। তবে দিনশেষে বাঙালি তো, একটু আধটু বিবর্তন না হলে ঠিক জমে না!
ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসার লেখক শিবরাম চক্রবর্তী বেঁচে থাকলে আজ লিখতেন অন্য বই! ধর্ম সত্য-অসত্য সোশ্যাল মিডিয়া!

