বিদায়ের প্রাক্কালে রঙের শেষ আর্তি  

শেষ আপডেট:

রমেন্দ্রনাথ ভৌমিক

শীতের রুক্ষতা সরিয়ে প্রকৃতিতে রঙের যে উচ্ছ্বাস এনে দিয়েছিল বসন্ত, চৈত্রের অন্তিম লগ্নে এসে সে আজ যেন বিদায়ের সুরে মৃদু বিষণ্ণ। সময়ের স্রোতে দাঁড়িয়ে এই বসন্ত আর কেবল আগমনের উল্লাস নয়, বরং ফুরিয়ে যাওয়ার এক নীরব সৌন্দর্যও বয়ে আনে।

চৈত্রের শেষপ্রহরে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতিতে কান পাতলে এখনও শোনা যায় বসন্তের ক্ষীণ স্পন্দন। দার্জিলিং পাহাড়ের ঢালে, তরাইয়ের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কিংবা ডুয়ার্সের শাল-সেগুনের বনভূমিতে বসন্ত তার রঙের শেষ আঁচড় রেখে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে গ্রীষ্মের দিকে। ক’দিন আগেও যে পলাশ-শিমুলের আগুনরাঙা দাপট চোখে পড়ত, আজ তা একটু মলিন, একটু ক্লান্ত— তবু অপার সুন্দর। রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে থাকা ঝরা পাপড়ি যেন বলে দেয়, রঙের এই উৎসব এখন শেষের পথে।

বসন্ত মানেই নবীনতার মায়াবী স্পর্শ, প্রাণের এক অনন্ত জাগরণ—এই চিরন্তন ধারণা আজও অটুট। তবে, এই সময় দাঁড়িয়ে বসন্তকে অনুভব করা মানে কেবল তার আগমনের উচ্ছ্বাস নয়, বরং তার বিদায়ের সৌন্দর্যকেও উপলব্ধি করা। প্রকৃতির এই রূপান্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য কখনও স্থায়ী নয়; আর সেই অস্থায়িত্বের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার গভীরতম তাৎপর্য।

উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে এখন নতুন পাতার আভাস স্পষ্ট। শ্রমিকের ঝুড়িতে জমতে শুরু করেছে কচি সবুজের সম্ভার, যা আগামীদিনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। নদীর ধারে, মাঠের প্রান্তে কিংবা গ্রামীণ পথের ধুলোমাখা প্রান্তরে বসন্তের এই শেষলগ্ন এক অদ্ভুত স্থিরতা তৈরি করে— যেখানে প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে আগত ঋতুর জন্য। গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, তবু বসন্তের মৃদু স্পর্শ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।

যুগ যুগ ধরে বসন্তকে প্রেম ও সৃষ্টির ঋতু বলা হয়েছে। কোকিলের কুহুতান এখনও ভেসে আসে, যদিও তার সুরে মিশে গিয়েছে একটুখানি বিষাদ। ফুরফুরে বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ আছে, তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক অদ্ভুত নীরবতা। এই মিশ্র অনুভূতিই বসন্তের অন্তিম সুর— যেখানে আনন্দ আর বেদনাকে আলাদা করা যায় না। সাহিত্যেও এই দ্বৈততাই ধরা পড়েছে— উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যে খুঁজেছেন চিরন্তনতা, আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে দেখেছেন সৃষ্টি ও মুক্তির অনির্বাণ প্রবাহ হিসেবে।

বসন্ত কেবল প্রকৃতির নয়, মানুষের অন্তর্জগতেও এক গভীর সঞ্চার ঘটায়। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর যেমন প্রকৃতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, তেমনি মানুষের মনেও জেগে ওঠে নতুন ভাবনা, নতুন স্বপ্ন। শিল্পী তুলি ধরেন, কবি শব্দ খুঁজে পান, সুরকার সৃষ্টি করেন নতুন সুর। বসন্ত যেন নীরবে বলে— সবকিছু ফুরিয়ে গেলেও সৃষ্টির সম্ভাবনা কখনও শেষ হয় না। এই ঋতু আমাদের শেখায়, প্রতিটি পূর্ণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ফুরিয়ে যাওয়ার বীজ, আর প্রতিটি শেষের ভিতরেই জন্ম নেয় নতুন শুরুর সম্ভাবনা। ঝরা পাতা তাই কেবল পতনের প্রতীক নয়, বরং নবজন্মের পূর্বভূমিকা। প্রকৃতির এই চক্রই জীবনের চক্র— যেখানে ক্ষয় আর সৃষ্টি একে অপরের পরিপূরক। চৈত্রের এই শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বসন্তকে নতুনভাবে অনুভব করা জরুরি। এটি কেবল রঙের ঋতু নয়, বরং সময়ের স্রোতে পরিবর্তনের এক গভীর প্রতীক। বসন্ত বিদায় নেয় ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া রং, গন্ধ আর অনুভব আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবনও এমনই, ক্ষণস্থায়ী অথচ অপার সুন্দর; আর সেই সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে চিরন্তন নবজাগরণের বীজ।

(লেখক শামুকতলা সিধো কানহো কলেজের সহকারী অধ্যাপক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

শুধু ‘গভীর উদ্বেগ’: মৃত্যুশয্যায় রাষ্ট্রসংঘ

শুভময় মুখোপাধ্যায় বিশ্বজুড়ে যখন বোমার ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়ে আসে,...

যুদ্ধাপরাধী ট্রাম্প এবং নীরব বিশ্ব

জয়জিৎ বণিক যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মাটি, গুঁড়িয়ে যাওয়া একটি স্কুলবাড়ি,...

হালখাতা থেকে পরব : অনন্য নববর্ষ

শহুরে হালখাতার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী গ্রামগুলিতেও নিজস্ব ঐতিহ্যে পালিত...

স্মার্টফোন হাতে আমরা সবাই বিচারপতি!

সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে খাপ পঞ্চায়েত। পরে সম্পূর্ণ ভুল...