Addiction | নেশা থেকে দূরে থাকুন

শেষ আপডেট:

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: মদ, গাঁজা, আফিম, কোকেন, সিগারেট, তামাক, বিভিন্ন ওষুধের পাশাপাশি মোবাইল, ইন্টারনেটও এখন নেশার (Addiction) মতো। কোনও ব্যক্তি নেশার জালে জড়িয়ে পড়লে তাঁর পছন্দের কাজগুলি না করে নিজের কাজকর্মের ক্ষতি করে, টাকাপয়সা নষ্ট করে, শরীরের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও তিনি নেশা করেই যান। এই অবস্থায় নেশা ছাড়ানোর উপায় কী, নেশাসক্তদের জন্য চিকিৎসা কী, নেশা করার কারণই বা কী, জানালেন বাঁকুড়া সম্মিলনি মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরিত্র চক্রবর্তী

বিভিন্ন অবস্থা

নেশা করার তীব্র বাসনাকে বলা হয় ক্রেভিং। ক্রমশ নেশা করার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। অর্থাৎ একই পরিমাণে নেশা করলে তাঁর আর নেশা হয় না। তাঁকে বেিশ পরিমাণে নেশা করতে হয়। এই ঘটনাকে বলে টলারেন্স। আর এরপরে দীর্ঘক্ষণ নেশা না করলে তাঁর অস্বস্তি হতে থাকে। ঘুম হয় না, গা-হাত-পায়ে যন্ত্রণা, উদ্বেগ ও বিভিন্ন অস্বস্তি হতে থাকে, যা আবার নতুন করে নেশা করা অবধি চলতে থাকে। এইসব লক্ষণকে বলে ‘উইথড্রয়াল সিম্পটমস’। এভাবে ওই ব্যক্তি ক্রমশ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন।

নেশা করার কারণ

জৈবিক মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা স্ট্রায়াটাম নামক এক জায়গায় ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিকের বৃদ্ধি আমাদের ভালো লাগাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই জায়গাকে ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’ বলা হয়। আমাদের পছন্দের খাবার খেলে যেমন ওই জায়গায় ডোপামিন বাড়ে, তেমনি নেশা করলেও ওই বিশেষ জায়গায় ডোপামিন বাড়ে। কিন্তু নেশা করার পরে ওই জায়গায় ডোপামিনের পরিমাণ অল্প সময়ে অনেকখানি বাড়ে। তাই খাবার খাওয়ার থেকে নেশা করা অনেক বেিশ আনন্দদায়ক হয় এবং ওই আনন্দ লাভের আশায় আমরা নেশা করার দিকে ঝুঁকে পড়ি। মদ, গাঁজা, আফিম, সিগারেটের মতো ইন্টারনেটের নেশাতেও একই ঘটনা ঘটে। নেশায় আসক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্ট্রায়াটামে ডোপামিন রিসেপ্টারগুলি কম পরিমাণে থাকে। তাই এদের ক্ষেত্রে বেিশ মাত্রায় নেশা করলে তবেই যথোপযুক্ত ডোপামিন বাড়ে এবং ভালোলাগার অনুভূতি তৈির হয়।

এছাড়া মস্তিষ্কের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ‘অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স’। এই অংশটি আমাদের সামাজিক আচরণ ও ন্যায়-অন্যায় বোধ নিয়ন্ত্রণ করে। নেশাসক্তদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এই অংশটি ঠিকমতো কাজ করে না এবং এঁরা সহজেই অনিয়ন্ত্রিত, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও নেশায় জড়িয়ে পড়েন। মানুষ সাধারণভাবে প্রথমে মদ, গাঁজা জাতীয় নেশা করা শুরু করেন। এইসব ড্রাগ পরবর্তীকালে আরও মারাত্মক নেশাগুলির গেটওয়ে হিসাবে কাজ করে।

সামাজিক  অনেকে আবার নিজের মন খারাপ, উদ্বিগ্নতা কাটানোর জন্য বিভিন্ন নেশাতে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখান থেকে আর বেরোতে পারেন না।

মানসিক – অনেকের মন খারাপ, উদ্বিগ্নতা, মনোযোগে ঘাটতি, হাইপার কাইনেটিক ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি সমস্যা থাকে। ফলে তাঁরা সহজেই নেশার শিকার হন।

নেশার সঙ্গে অন্যান্য মানসিক রোগের সম্পর্ক

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব মানুষ নেশা করেন, তাঁদের প্রায় ৫০ শতাংশের কোনও না কোনও মানসিক রোগ আছে। যেসব মানুষ দীর্ঘদিন নেশা করেন তিনি ক্রমশ অন্য মানসিক সমস্যা যেমন সাবস্টেন্স ইনডিউসড সাইকোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। অনেকে মানসিক অবসাদ, উদ্বিগ্নতা, অনিদ্রা প্রভৃতি কাটানোর জন্য নেশার আশ্রয় নেন। অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষজন সহজেই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা অনেক সময় উপসর্গ কমাতে নেশার আশ্রয় নেন। যদিও এতে রোগ উলটে বেড়ে যেতে পারে এবং ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। বাইপোলার ডিসঅর্ডার নামক রোগে আক্রান্ত রোগীরা ম্যানিক পর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত নেশা করে ফেলেন।

পরিসংখ্যান

সাধারণত নেশা করার সূত্রপাত হয় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সে। তামাকের নেশা আরও আগে শুরু হয়। ভারতে প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ তামাকের নেশা করেন। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ৭৫ বছর বয়সি বয়স্কদের মধ্যে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মদ্যপান, ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে গাঁজা, ২ শতাংশ ক্ষেত্রে আফিম জাতীয় নেশা, ৩.৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্যান্য নেশা, ২২.৩ শতাংশ ক্ষেত্রে অনেকগুলি নেশা একসঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল।

চিকিৎসা

কোনও ব্যক্তি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হাসপাতালে এলে তাঁর চিকিৎসা একরকম, আবার নেশা কয়েকদিন বন্ধ রাখলে উইথড্রয়াল সিনড্রোমের চিকিৎসা আরেকরকম হয়। অনেক সময় বিভিন্ন মানসিক রোগের সঙ্গে নেশা করার সমস্যা জড়িয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সেই মানসিক রোগ ও নেশা- উভয়েরই চিকিৎসা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি নেশা করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাঁর সেই মুহূর্তে কিছু চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। আবার নেশা করার ইচ্ছে কমানোর জন্যও কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। নেশা থেকে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা যেমন- মদের নেশা থেকে লিভারের সমস্যা, পেটে জল জমা, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ ইত্যাদি হলে সেসবেরও চিকিৎসা প্রয়োজন। সাধারণভাবে সাইকিয়াট্রিস্টই নেশার চিকিৎসা করে থাকেন। এছাড়া কিছু সাইকোথেরাপি, গ্রুপ থেরাপি ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সর্বোপরি রোগীর বাড়ির লোকজনকে নেশার লক্ষণগুলো সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করা গেলে তাঁরা চিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা করতে পারবেন।

অন্য কাজে ব্যস্ত থাকুন

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনও ব্যক্তি কিছুদিন নেশামুক্ত থাকার পরে আবার নেশা শুরু করছেন। তাই নেশা করার বন্ধুবান্ধব ও নেশা করার জায়গাগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। হঠাৎ নেশা করার ইচ্ছে হলে নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। সাধারণত প্রথম ৩০ মিনিট এই ইচ্ছা তীব্র হয়। তারপরে ইচ্ছা ক্রমশ কমতে থাকে।

সতর্কতা

‘গোপনে নেশা ছাড়ানোর’ মতো বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে অনেকে অনেক প্রাণঘাতী ওষুধ রোগীকে খাইয়ে ফেলেন। ওই জাতীয় ওষুধের ওপর কোনও সরকাির নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেগুলি স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

ORS | প্যাকেটবন্দি ওআরএস কি সবার জন্য? সুস্থ থাকতে জেনে নিন এর সঠিক নিয়মবিধি

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: গরমের দাপট বাড়তেই ওষুধের দোকানগুলোতে...

Yogurt | ভুল উপায়ে দই খাচ্ছেন না তো? বদহজম ও অ্যাসিডিটি রুখতে মেনে চলুন এই টিপস

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে...

Health Benefits | হাড়ের সুরক্ষা থেকে রক্তাল্পতা দূর, সুস্থ থাকতে পাতে রাখুন ‘মহৌষধ’ মানকচু

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: বাঙালির রান্নাঘরে এক সময় মানকচুর...

CM Suvendu Adhikari | হিমন্তের শপথে আমন্ত্রিত শুভেন্দু, আগামীকালই অসমে যাচ্ছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী!

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য অসমে (Assam)...