ভোটারদের অধিকার সুরক্ষায় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম নির্বাচন কমিশনারের আদর্শই পাথেয়।
শেখর সাহা
সম্প্রতি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বাতিল ভোটারদের অধিকার নিয়ে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তা আমাদের গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকে নতুন করে সামনে এনেছে। শীর্ষ আদালত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছে যে, ভোটাধিকার শুধু একটি প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়, বরং তা নাগরিকত্বের মর্যাদা ও সমানাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে নির্বিচারে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, তা সরাসরি সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবেই বিবেচিত হবে। অনেকের মতে, বর্তমান সময়ে কমিশনের কিছু পদক্ষেপে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের পক্ষে যথেষ্ট উদ্বেগজনক। গণতন্ত্রের মূল শক্তিই মানুষের অংশগ্রহণ, সেই অধিকার খর্ব করার পদক্ষেপ অনুচিত।
আজ যখন নির্বাচনকে ঘিরে নানা বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন উঠছে, তখন ইতিহাসের দিকে তাকালে অনন্য ব্যক্তিত্ব ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের কথা মনে পড়ে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারতবর্ষ ছিল এক কঠিন ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশভাগের ক্ষত তখনও তাজা, কোটি কোটি উদ্বাস্তু এপার-ওপার ছুটে বেড়াচ্ছেন। অর্থনীতি অত্যন্ত দুর্বল, প্রশাসনিক কাঠামোও নতুন করে গড়ে উঠছে। ঠিক এমন এক পরিস্থিতিতে একটি বিশাল দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন করা ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো একটি কাজ। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুকুমার সেনকে।
১৯৫০ সালে যখন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনিই হন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন দেশের নির্বাচন আয়োজন করা, যেখানে অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর, যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত, আর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা প্রায় নেই বললেই চলে। ১৯৫১-’৫২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ। তখন প্রায় ১৭ কোটি ভোটারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিলেন নিরক্ষর। এই পরিস্থিতিতে ভোটদানের ব্যবস্থা করতে তিনি প্রতীকের ধারণাকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেন। আজ নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রতীক ব্যবহারের যে ঐতিহ্য, তার সূচনা তখনই হয়েছিল।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছিলেন এক অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অপরিসীম। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাজে তিনি কোনও হস্তক্ষেপ করতে পারেননি, কারণ সুকুমারবাবু ছিলেন একেবারেই নির্ভীক ও নীতিবান। সেন পরিষ্কারভাবে বুঝতেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের প্রভাবাধীন হয়ে পড়লে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে। তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কখনও দ্বিধা করেননি। রাজনৈতিক চাপ দূরে রেখে তিনি কাজ করেছেন কেবল সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছিল। ভারতের নির্বাচন এতটাই সুসংগঠিত হয়েছিল যে, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ চেয়েছিল।
ভারতের মতো বিশাল দেশে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা মোটেই সহজ নয়। নানা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতের মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। এই বহুত্ববাদী সমাজে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন মানুষের আস্থা হারালে তার ক্ষতিকর প্রভাব গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর পড়বে। ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানকে দেখলে বোঝা যায় একজন সৎ ও সাহসী প্রশাসক কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। ভারতের গণতন্ত্রের প্রথম অধ্যায়ে সুকুমার সেন প্রমাণ করেছিলেন, নির্বাচন কমিশনার নিরপেক্ষ হলে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রও সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। আজকের ভারত সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। এখন প্রশ্ন একটাই— আমরা কি সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারব?
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)



