ডিলিটেড নামের তো ভবিষ্যৎ নেই-ই। ট্রাইবিউনালে আরও ৩৪ লক্ষেরও বেশি আপিলে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তাতে জল ঢেলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ওই ৩৪ লক্ষের বেশি আবেদনের জটিলতা কেটে গেলেও আশার আলো নেই। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ওই বিরাট সংখ্যক মানুষ বাংলায় ভোট দিতে পারবেন না। ভবিষ্যতেও পারবেন কি না সন্দেহ। কেননা, সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে, আপিল জানানো মানেই ভোটাধিকার ফেরত পাওয়ার অধিকার জন্মানো নয়।
যাঁদের জট কাটবে, তাঁদের ভোটারের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জানানো আবেদন সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের যুক্তি, এতে ট্রাইবিউনালের ওপর চাপ বাড়বে। এমনিতেই প্রতিটি ট্রাইবিউনালের ঘাড়ে লক্ষ লক্ষ আপিল ঝুলে আছে। ট্রাইবিউনালকে স্বস্তি দেওয়া হল বটে। কিন্তু ট্রাইবিউনাল নিয়ে গয়ংগচ্ছ পরিস্থিতি চলছে, তাতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেনি।
হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, ট্রাইবিউনাল কাজ শুরু করে দিয়েছে। সেই কাজ শুরু করার রিপোর্টের পর ইতিমধ্যে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাইবিউনালের কাজের পদ্ধতি ঠিক করতে হাইকোর্ট তিন প্রাক্তন বিচারপতির যে কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেটা কাজ শুরু করল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কাজ শুরু করে থাকলে পদ্ধতি ঠিক হল কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর নেই।
প্রাথমিক খবর অনুযায়ী ট্রাইবিউনালগুলি জেলা স্তরে নয়, কেন্দ্রীয় স্তরে কলকাতায় বসে কাজ শুরু করবে। এতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবেদনকারীদের সশরীরে ট্রাইবিউনালে হাজিরা দিতে হবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি আছে। যদি সবাইকে কলকাতা দৌড়াতে হয়, তাহলে যে অকল্পনীয় গণভোগান্তি হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। একে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনাজনিত উদ্বেগ, অন্যদিকে, সেই হয়রানির ভয় ছড়িয়ে পড়ছে।
তাছাড়া এই ট্রাইবিউনালগুলির মেয়াদ কতদিন, সেই মেয়াদের মধ্যে সমস্ত আপিল বিবেচনা করা না গেলে আবেদনকারীদের পরিণতি কী, ইত্যাদি যথেষ্ট ভাবনার বিষয়। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে ট্রাইবিউনালের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়। কারও আপিল ট্রাইবিউনাল খারিজ করে দিলে, অর্থাৎ কারও নাম পাকাপাকিভাবে ভোটার তালিকা থেকে ডিলিটেড হয়ে গেলে, তাঁর নাগরিকত্বের অধিকার থাকবে কি না, তাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি। না সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে, না নির্বাচন কমিশনের তরফে।
যদিও শীর্ষ আদালতের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী যথার্থ বলেছেন যে, কোনও দেশে জন্মগ্রহণ করলে সেদেশে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু সাংবিধানিক নয়, আবেগের বিষয়ও বটে। এই মন্তব্য সত্ত্বেও ট্রাইবিউনালে বিচারাধীনদের সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য কঠোরই। তাঁর কথায়, যতক্ষণ না বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ছেন এবং তাতে ভোটে বাস্তবিক কোনও প্রভাব পড়ছে, ততক্ষণ নির্বাচন বাতিল করা সম্ভব নয়।
একজন বৈধ নাগরিককেও ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সাংবিধানিকভাবে অনুচিত। কিন্তু যে ৩৪ লক্ষেরও বেশি মানুষ ট্রাইবিউনালের দরজায় মাথা ঠুকছেন, তাঁদের মধ্যে একজনও বৈধ নাগরিক নেই- সেকথা কিন্তু হলফ করে বলা সম্ভব নয়। সেই বিরাট সংখ্যক মানুষকে প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়েই কিন্তু ভোট হতে চলেছে বাংলায়।
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত। আঙুল তুলেছে নির্বাচন কমিশনের দিকে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধানের কোনও পথ বাতলে দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত মনে করছে, ভোটার তালিকার বিশেষ িনবিড় সংশোধনী (এসআইআর) বিহারে হলেও নির্বাচন কমিশনের লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নিয়মে বাংলার সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে। কমিশনের এই আচরণকে দ্বিচারিতা পর্যন্ত বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু আখেরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির গেরো থেকে সাধারণ মানুষের রেহাই পাওয়ার কোনও পথ এখনও মেলেনি।



