শমিত বিশ্বাস
স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) জন্মদিন এলেই আমরা অভ্যাসমতো আলো জ্বালাই, মঞ্চ সাজাই, স্মরণসভা করি। বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা যেন নিজেদের দায় শেষ করি। পরদিন আবার স্বস্তির জীবনে ফিরে যাই—যেখানে প্রশ্ন নেই, অস্বস্তি নেই, কেবল চলমান অভ্যাস। কিন্তু এই স্মরণ কি সত্যিই স্মরণ? নাকি এটি আত্মতুষ্টির এক নীরব আয়োজন, যেখানে আমরা মানুষটিকে স্মরণ করি, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাই?
যাঁর নামের মধ্যেই আছে ‘বিবেক’, তাঁকে স্মরণ করতে হলে আগে নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আর এই মুখোমুখি হওয়াটাই মানুষের কাছে সবচেয়ে কঠিন। কারণ বিবেক প্রশ্ন করে, আর প্রশ্ন মানুষের আরামের শত্রু। বিবেকানন্দ কোনও উৎসবের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন অস্বস্তির মানুষ। যেখানে সমাজ নিশ্চিন্তে নিজেকে সঠিক বলে ধরে নেয়, সেখানে তিনি আয়নার মতো দাঁড়িয়ে বলতেন— নিজের মুখটা একবার ভালো করে দেখো। তিনি ঈশ্বরকে আকাশে বসাননি। রেখেছিলেন মানুষের ভেতরে। তাই তাঁর দর্শন (Philosophy) এত কঠিন, এত নির্দয়ভাবে সত্য। আকাশের ঈশ্বরকে অস্বীকার করা যায়, ধর্মগ্রন্থের ঈশ্বরকে নিয়ে তর্ক করা যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের ঈশ্বরকে অস্বীকার করলে নিজের কাছেই অপরাধী হতে হয়। আর মানুষ নিজের কাছে অপরাধী হতে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় নীরবতা, আপস আর ভণ্ড শ্রদ্ধা।
আজ আমরা কোন সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি? রাষ্ট্র শক্তিশালী—এই দাবি জোরালো। উন্নয়নের গল্প চারদিকে ছড়িয়ে আছে। অর্থনীতি সংখ্যায় বড় হচ্ছে, পরিসংখ্যান বলছে আমরা এগোচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হল—মানুষ কি এগোচ্ছে? তার আত্মবিশ্বাস কি বেড়েছে? তার মর্যাদা কি সুরক্ষিত হয়েছে? নাকি সে কেবল আরও নিখুঁতভাবে টিকে থাকার কৌশল শিখে নিয়েছে? এই প্রশ্নগুলো বিবেকানন্দের প্রশ্ন। কিন্তু আজকের সমাজ সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার বদলে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াকেই নিরাপদ পথ বলে মেনে নিয়েছে। আমরা উন্নয়নের কথা বলতে ভালোবাসি, কিন্তু সেই উন্নয়নের ভেতরে মানুষের চোখের দিকে তাকাতে ভয় পাই। কারণ সেই চোখে আছে ক্ষুধা, আছে অপমান, আছে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।
বিবেকানন্দ বলেছিলেন—‘আগে মানুষ হও, তারপর সবকিছু।’ কিন্তু আমরা উলটো পথ বেছে নিয়েছি। আমরা আগে ব্যবস্থা বানিয়েছি, তারপর মানুষকে সেই ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকিয়ে তাকে যন্ত্রের একটি অংশে পরিণত করেছি। ফলে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু উন্নয়ন মানুষের ভেতরে ঢোকেনি। শিক্ষা বেড়েছে, কিন্তু জিজ্ঞাসা কমেছে। প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু সংবেদনশীলতা কমে গিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি এখানেই—আমরা আর লজ্জা পাই না। ক্ষুধার্ত মানুষ দেখে আমাদের অস্বস্তি হয় না। বেকার তরুণ আমাদের কাছে একটি পরিসংখ্যান মাত্র। অসুস্থ মানুষকে আমরা বোঝা বলে ভাবতে শিখেছি। এই অনুভূতিহীনতাই বিবেকানন্দের দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তিনি শক্তির কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই শক্তি ছিল আত্মিক—আত্মসম্মান থেকে জন্ম নেওয়া শক্তি। আজ আমরা শক্তি বুঝি দখল হিসেবে, ক্ষমতা হিসেবে, নিয়ন্ত্রণ হিসেবে। কিন্তু যে শক্তি অন্যকে ছোট করে, যে শক্তি ভয় দেখিয়ে টিকে থাকে—সে শক্তি নয়, সে দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ। বিবেকানন্দ যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে ভারত ভিক্ষা করে বাঁচবে না। সে ভারত মাথা তুলে দাঁড়াবে—মর্যাদায়, আত্মবিশ্বাসে, মানবিকতায়।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)

