Tea Garden Wage Hike | চা বাগানে পদ্ম-ঝড়! ৫০০ টাকা মজুরির স্বপ্নে বুঁদ ডুয়ার্স-তরাই

শেষ আপডেট:

শুভজিৎ দত্ত ও মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, নাগরাকাটা ও বীরপাড়া: প্রত্যাশার পাহাড়! ৫০০ টাকার বেশি মজুরি (Tea Garden Wage Hike)। খোদ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস। যাতে বিশ্বাস করেছিলেন চা শ্রমিকরা। ঢেলে ভোট দিয়েছেন পদ্ম প্রতীকে। ডুয়ার্স-তরাইয়ে চা বাগান আছে ১৬টি বিধানসভা আসনে। ১৬টিতেই বিরাট জয় এসেছে বিজেপির। কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ কেন্দ্রেও কিছু বাগান আছে। সেখানেও ধরাশায়ী তৃণমূল। দ্বিতীয় ফ্ল্যাশের উৎপাদন চলাকালীন সবুজ চা বলয়ে পতপত করে উড়ছে গেরুয়া পতাকা।

পাল্লা দিয়ে উড়ছে প্রায় তিন লক্ষ চা শ্রমিকের আশার নিশান। ৫০০ টাকা মজুরি নিশ্চয়ই সময়ের অপেক্ষা! খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন! নিশ্চয়ই একলাফে ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হবে মজুরি। ডুয়ার্সে (Dooars) গ্যারগান্ডা বাগানের শ্রমিক প্রতাপ ওরাওঁ বলেন, ‘চা শিল্পে বছরের পর বছর মজুরি নিয়ে সমস্যা চলছে। এজন্যই আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত পরিবর্তন হল।’

প্রতাপের এখন বিশ্বাস, ‘আশা করছি, নতুন সরকার আমাদের দুর্দশা ঘোচাবে।’ সন্দেহ নেই, দেড় দশকের তৃণমূল শাসনে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে চা শ্রমিকের। এই সময়কালে একটি বেতন চুক্তিও হয়নি। অথচ তিন বছর অন্তর বেতন চুক্তি হওয়া ছিল চা শিল্পের দস্তুর। ন্যূনতম মজুরি চুক্তি নির্ধারণের জন্য কমিটি গড়ে সেই চুক্তিকে সেই কবে হিমঘরে পাঠিয়ে রেখেছে তৃণমূল সরকার।

বেতন চুক্তিও হয় না। ওই কমিটির বৈঠকও হয় না অনেকদিন। শুধু মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেেশ দু’বার অ্যাড হক মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে। তাতে শ্রমিকের জীবনযাপন কঠিন। চা বাগানের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়া এখন তাই দস্তুর। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। চা বাগান থেকে নারী পাচার সেকারণে বাড়ছে। ডুয়ার্সে বীরপাড়া চা বাগানের শ্রমিক কমল ওরাওঁ জানালেন, ওই বাগানের অনেকে ভিনরাজ্যে দিনমজুরি করছেন।

সমস্যা তৈরি হয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ওই বাগানে শ্রমিকদের বেশ কিছুদিনের মজুরি বকেয়া পড়ে যাওয়ায়। বেশ কিছুদিন আন্দোলন, অনশনের জেরে বকেয়ার কিছু অংশ মেটানো হলেও শ্রমিকরা আর্থিক সংকটে পড়েন। তারপরই শুরু হয় বাইরের রাজ্যে যাওয়ার হিড়িক। কমলের কথায়, ‘২৫০ টাকা মজুরিতে সংসার চলে না।’ তাঁর আশা, ‘আশা করছি এবার মজুরি বাড়বে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন ওরা তো সরকারে আসছে।’

বিজেপি প্রভাবিত চা শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তথা আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা বলেন, ‘আমাদের সংকল্পপত্রে যা যা বলা হয়েছিল, সেটা মাথায় রেখেই চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বন্ধ ও রুগ্ন চা বাগানের সমস্যা মেটানো, শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড আদায় ইত্যাদি সমস্ত কিছুর ওপর জোর দেওয়া হবে।’

দেড় দশকে তৃণমূল সরকার চা শিল্পে মজুরি সমস্যার দিকে নজর না দেওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিলই। সেই ক্ষোভের আগুনে জল ঢালতে ভোটের আগে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হঠাৎ চা শ্রমিকের মন বুঝতে বৈঠক শুরু করেন। আলিপুরদুয়ারের কাছে মাঝেরডাবরি বাগানে গিয়ে সব সমস্যা শুনে প্রতিকারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ভোটের প্রচারে এসে তাঁর আশ্বাস ছিল, তৃণমূল ফের সরকারে এলে চা শ্রমিকের মজুরি ৩০০ টাকা করে দেওয়া হবে। শ্রমিকদের মধ্যে সেই আশ্বাস নিয়ে তখন সংশয় ছিল।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদির (PM Narendra Modi) ৫০০ টাকারও বেশি মজুরির আশ্বাস শ্রমিকদের মনে আশা জাগিয়েছিল। চা বলয়ের ভোটে ইভিএম-এ গেরুয়া ঝড় নিঃসন্দেহে সেই আশার প্রতিফলন। শেষপর্যন্ত তৃণমূলকে রাজ্যে তো বটেই, চা বলয়ে পুরোপুরি ধরাশায়ী করে রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিজেপির। চা শ্রমিকের এখন বুকে আশা, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন সফল হবে এখন।

চা বাগানের শ্রমশক্তির সিংহভাগই মহিলা। এমন বাগানও আছে, যেখানে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের ৭০ শতাংশ। চা পাতা তোলা বা ফ্যাক্টরিতে কাজ তো বটেই, সংসার সামলানো থেকে সন্তান লালনপালনের গুরুদায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। গেরুয়া শিবির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় বাড়তি মজুরির স্বপ্নে এখন তাঁরা বিভোর। ভগতপুর চা বাগানের সীতা মাহালি মঙ্গলবার কাজের ফাঁকে বললেন, ‘শুধু কি খাই-খরচ। ছেলেপুলেদের লেখাপড়ার খরচ কি কম! আশা করছি, বিজেপি কথা রাখবে।’ ভুটান সীমান্তের ক্যারন চা বাগানের শ্রমিক সুনীতা ওরাওঁয়ের ভাষায়, ‘‘২০১৪ সালের পর ‘ডাবলি’ও (নির্দিষ্ট পরিমাণের অতিরিক্ত চা পাতা তোলা) এক পয়সা বাড়েনি। সেটা হলেও না হয় কম মজুরির আক্ষেপ কিছুটা পুষিয়ে যেত।’’ রুগ্ন ধরণীপুর চা বাগানের শ্রমিকরাও বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখছেন। মামণি সাঁওতাল বলেন, ‘আগের সরকার চা বাগানের সমস্যার গভীরে পৌঁছাতেই চায়নি। বিজেপি যেভাবে সবকিছু বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছিল, তাতে স্বপ্ন দেখাই যায়।’

গ্যারগান্ডা বাগানের কৈলাস ওরাওঁ আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘মালিকরা যাতে ইচ্ছেমতো বাগান বন্ধ করে চলে যেতে না পারেন, সেটাও নিশ্চিত করা দরকার সরকারের। মজুরি তো বাড়াতেই হবে। তবে নিয়মিত মজুরি নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।’

Sushmita Ghosh
Sushmita Ghoshhttps://uttarbangasambad.com/
Sushmita Ghosh is working as Sub Editor Since 2018. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Digital. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Balurghat | বালি পাচারের গাড়িতে গেরুয়া পতাকা! সিন্ডিকেটের ‘রংবদল’ ঘিরে শোরগোল

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: এ যেন এক অভিনব রং বদল।...

Buniadpur | চিনা ভাষায় স্ত্রীর নাম! বুড়িমায়ের পুজোয় বুনিয়াদপুরে ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশল আধুনিকতার ছোঁয়া

অনুপ মণ্ডল, বুনিয়াদপুর: শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য আর লোকবিশ্বাসকে ঘিরে সোমবার...