অনসূয়া চৌধুরী, জলপাইগুড়ি: নতুন সাইকেল কিনে দেওয়ার আবদার করেছিল মায়ের কাছে। মা আশ্বাসও দিয়েছিলেন কয়েকদিন পরেই দেবেন বলে। কিন্তু তাতেই অভিমান। মঙ্গলবার রাতে শোয়ার ঘর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হল শুভমের দেহ। পরিবারের তরফে জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন শুভম রায় (১৪)-কে। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের ধাপগঞ্জ এলাকায় এমন ঘটনায় পরিবারের সকলে তো বটেই, প্রতিবেশীরাও হতবাক।
পারিবারিক সূত্রেই জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে সরকারি ছুটি থাকায় সারাদিন বাড়িতেই ছিল শুভম। পড়াশোনা-খেলাধুলো, খুনশুটির মধ্যেই মায়ের কাছে আবদার করেছিল নতুন দামি সাইকেলের। মা কথা দিয়েছিলেন কিনে দেওয়ার। জেদ করলে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি ও শুভমের দিদি মিলে বাবাকে সাইকেল কিনে দেওয়ার বিষয়টি জানাবেন। তবে, কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলেছিলেন মা।
শুভমের বাবা পেশায় রাজমিিস্ত্র৷ নিম্নবিত্ত পরিবারের আর্থিক টানাটানি চলছিল। তাই সঙ্গে সঙ্গে দামি সাইকেল কিনে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ধৈর্য ধরতে পারেনি শুভম। পরিবার ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সেই রাতেই মায়ের ওড়না জড়িয়ে আত্মহত্যা করে সে।
বুধবার ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, শুভমের শোকে মূর্ছা যাচ্ছেন মা-বাবা, দিদি সহ পরিবারের সকলেই। শুভমের মা পম্পা রায় কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘আমি তো বলেছিলাম, তোকে সাইকেল কিনে দেব। কেন এমন করলি? কী নিয়ে থাকব এখন। ও চঞ্চল ছিল। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটাবে তা কী করে বুঝব? বাবা তুই ফিরে আয়।’
পরিবারের সকলেই জানান, মঙ্গলবার শুভম মায়ের কাছে সাইকেল কিনে দেওয়ার বায়না করার পর বিকেলে দিদির পুরোনো সাইকেল নিয়েই পাড়ায় খেলতে বের হয়৷ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেও সে স্বাভাবিকই ছিল। হাত-মুখ ধুয়ে পড়তেও বসেছিল। রাতে খাবার বেড়ে ভাইকে ডাকতে যায় দিদি৷ কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখে ভাইয়ের ঝুলন্ত দেহ। পরিবারের সকলে দরজা ভেঙে তড়িঘড়ি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয়নি।
এদিনও ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল শুভমের বইগুলো। বারান্দায় পুরোনো সাইকেল। শুভমের পিসেমশাই বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘একটু সময় দিল না। যেদিন চাইল সেদিনই সব শেষ। আমাদের মতো পরিবারের কাছে হঠাৎ করে নতুন সাইকেল কেনা অসম্ভব। ওর মাথায় এমন ভাবনা এল কোথা থেকে, ভাবতেই পারছি না।’
ধাপগঞ্জে শুভমের গোটা পাড়ায় এদিন শোকের ছায়া। বুধবার তার দেহ ময়নাতদন্ত করা হয়। এমন ঘটনা প্রসঙ্গে জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ স্বস্তিশোভন চৌধুরী বলেন, ‘অভিভাবকদের আরও দায়িত্ববান হতে হবে। কিছু চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে ছোটদের চাহিদার তালিকা বেড়ে চলেছে। তবে, এক্ষেত্রে এমন হতে পারে বাকি বন্ধুদের দামি সাইকেল দেখে ওই ছেলেটিরও ইচ্ছে জেগেছিল। কিন্তু পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
শুভমের পরিণতিতে আশপাশের সকলেই যতটা শোকস্তব্ধ, ততটাই বিস্মিত। সন্তানের চাহিদা ও তা না পেলে ভয়ংকর কিছু করে বসার প্রবণতা আশঙ্কা বাড়িয়েছে তঁাদের মনে।

