রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি, নাকি অনিয়মের পানশালা- গ্লেনারিজ পানশালা বন্ধ করে দেওয়ার পিছনে কোনটা আসল কারণ, তা নিয়ে সরগরম পাহাড়।
ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন গ্লেনারিজের (Glenary’s) মালিক, ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্টের আহ্বায়ক অজয় এডওয়ার্ড। অজয় এদিনও দাবি করেছেন, ‘গোর্খাল্যান্ড ব্রিজ তৈরি করার জন্যই আমার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ক্ষতির মুখে ফেলার চক্রান্ত চলছে। এভাবে চললে পুরো ব্যবসাই বন্ধ করে দেব।’ প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে যাবেন বলেও এদিন জানিয়েছেন।
আর প্রশাসন বলছে, অনেক আগে থেকেই অজয়কে এই বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি সবকিছু জেনেও ব্যবস্থা না নিয়েই পানশালা চালাচ্ছিলেন। তাঁর পানশালা, ক্যাফেটারিয়া এবং বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর অনিয়ম ধরা পড়েছিল। সেই জন্যই প্রশাসন পানশালা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
দার্জিলিং জেলা প্রশাসন এবং আবগারি দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৩০ অক্টোবর গ্লেনারিজের পানশালায় অভিযান চালানো হয়। আবগারি আধিকারিকদের সেই অভিযানে সেখানে বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রথমত, ওই পানশালা কর্তৃপক্ষ আয়ব্যয়ের হিসেব দেখাতে পারেনি। কোনও রেজিস্টার সঠিকভাবে মানা হচ্ছিল না। দ্বিতীয়ত, পানশালায় বিক্রির জন্য অবৈধভাবে মদ মজুত করা ছিল। অর্থাৎ যেভাবে নির্দিষ্ট গুদামে মদ মজুত রাখার কথা, সেটা ছিল না। ক্যাফেটারিয়া, বাড়ির বিভিন্ন ঘরেও প্রচুর মদের বোতল ভর্তি প্যাকেট পাওয়া গিয়েছিল। তৃতীয়ত, যেখানে পানশালার সম্প্রসারণ করা হয়েছে, সেটারও অনুমতি নেওয়া হয়নি। চতুর্থত, পানশালায় বিনা অনুমতিতে নাচ এবং গানের আয়োজন করা হত।
এই অনিয়মগুলি নজরে আসার পরে ৩১ অক্টোবর আবগারি দপ্তর জেলা শাসককে রিপোর্ট দেয়। তার ভিত্তিতে ১৪ নভেম্বর আবগারি আইনে এই পানশালার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। ৪ ডিসেম্বর মামলার শুনানিতে খোদ অজয় এডওয়ার্ড আবগারি দপ্তরে হাজিরা দেন। আবগারি দপ্তর সূত্রের খবর, সেখানে তিনি সমস্ত অনিয়মের কথা স্বীকার করে দ্রুত সব নথিপত্র তৈরি করে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, তার পরেও গ্লেনারিজ কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ করেনি, বরং আগের মতোই পানশালা চলছিল। তবে অজয় কিন্তু বলেছেন, ‘আমার কাছে সমস্ত নথিপত্র রয়েছে। শীঘ্রই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছি।’
মঙ্গলবার আবগারি দপ্তরের আধিকারিকরা ফের ওই পানশালায় গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সেটি সিল করে দিয়েছেন। তিন মাসের মধ্যে নথিপত্র তৈরি হয়ে গেলে আবার পানশালা চালু করা যাবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা নিয়েই পাহাড়ের রাজনীতিতে বিস্তর জলঘোলা শুরু হয়েছে। কারণ, তার দু’দিন আগেই, রবিবার, জোড়বাংলো সুখিয়াপোখরি ব্লকের তুংসুং নদীর ওপরে একটি সেতুর উদ্বোধন করেছেন অজয়। মূলত তাঁরই উদ্যোগে গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় ওই সেতুটি তৈরি হয়েছে। সেতুটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘গোর্খাল্যান্ড ব্রিজ’। অজয়ের দাবি, ‘প্রশাসন নিজের দায়িত্ব পালন না করায় আমাদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হচ্ছে। পাহাড়ের রাস্তাঘাট, সেতু এসব প্রশাসন তৈরি করে দিলে আমাদের আর কিছু করতে হত না।’ তিনি বলেছেন, ‘গ্লেনারিজের আয়ের একটা অংশ ওই সেতু তৈরির জন্য খরচ করা হয়েছে। পাহাড়ের মানুষের আবেগকে মাথায় রেখে সেতুটির নাম গোর্খাল্যান্ড রাখা হয়েছে। আর সেই কারণেই আমার ব্যবসার ওপরে আঘাত হানা হয়েছে।’
গ্লেনারিজে ২৫০ জন কর্মী কাজ করেন। প্রতিদিন গড়ে ১২-১৩ লক্ষ টাকার ব্যবসা হত। কিন্তু পানশালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৫০ শতাংশ রোজগার কমে গিয়েছে। হতাশ অজয়ের উক্তি, ‘এতগুলো কর্মীর বেতন, বিদ্যুতের খরচ, শীতকালে চিমনির অতিরিক্ত খরচ সামলে কতদিন টানতে পারব জানি না। শুধু বেকারি চালিয়ে দিনের পর দিন ক্ষতির পরিমাণ যদি বেড়ে যায়, তবে পুরো ঝাঁপ বন্ধ করে দেব।’

