সুপ্রিম কোর্টের সময়সীমা ছিল সাতদিন। কিন্তু মাত্র দু’দিনের মাথায় ২০১৬ সালে নিযুক্ত শিক্ষকদের প্যানেলের মধ্যে অযোগ্যদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করে দিল স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)। ১৮০৪ জনের নামের সেই তালিকা রয়েছে কমিশনের ওয়েবসাইটে। এটাই যখন অনিবার্য ছিল, তখন ২০২২ সালে হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় ২৬০০০ জনের চাকরি বাতিল করায় তখনই তো অযোগ্য শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করা যেত।
সেক্ষেত্রে একসঙ্গে এতজনের চাকরি হয়তো যেত না। রাজ্যের স্কুল শিক্ষায় এমন বিপর্যয় হয়তো আসত না। অভিষেক মনু সিংভি, কপিল সিবালদের মতো আইনজীবীদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতে হত না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে। এতগুলো পরিবারকে এত বছর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাতে হত না। সর্বোপরি সুবল সোরেনের মতো বেশ কিছু চাকরিহারার জীবন অকালে ঝরে যেত না।
মানসিক অবসাদ, আতঙ্কে আত্মঘাতীও হয়েছেন কেউ কেউ। জামাইয়ের চাকরি নেই শুনে শ্বশুরের ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। আবার এমনও ঘটনা আছে যে, ছেলে-বৌমা, দুজনেরই চাকরি চলে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বাবা কিংবা মায়ের। পুরো ব্যাপারটাই অনভিপ্রেত। চাইলে বহু আগেই এই পালার যবনিকাপাত হতে পারত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি প্রথম থেকে একটার পর একটা মিথ্যা আড়াল করার চেষ্টা না করে স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাজে গলদ ও সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিতেন, তাহলে রাজ্যের শিক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে দেশজুড়ে এত শোরগোল হত না। কথায় কথায় সিবিআই, ইডিকে দিয়ে তদন্ত করানোর দরকার হত না আদালতের।
তবে দেরিতে হলেও যে রাজ্য সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে, এটা বড় কথা। কেননা, সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ নির্দেশের বিরুদ্ধেও নতুন করে আইনি লড়াইয়ের ভাবনাচিন্তা রাজ্য সরকারের মাথায় যে একবারের জন্যও আসেনি, তা নয়। নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষার মাত্র দশদিনের আগে শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের কারণ, এপ্রিল মাসে এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার সময়েই বলা হয়েছিল, দাগি বা অযোগ্য চিহ্নিত শিক্ষকরা নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় বসতে পারবেন না।
কিন্তু এসএসসি তালিকা প্রকাশ করায় স্পষ্ট যে, আগামী ৭ ও ১৪ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত পরীক্ষার জন্য প্রচুর অযোগ্য শিক্ষকের আবেদন জমা পড়েছিল। বিষয়টি শীর্ষ আদালতের নজরে আনা মাত্র ২৮ অগাস্ট দুই বিচারপতির বেঞ্চ তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিল। রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে দাবি করেন, অযোগ্য তালিকা কমিশন আগেই জমা দিয়েছে। কিন্তু বিচারপতিদের ধমক খেয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে তিনি কথা দেন, কমিশন সাতদিনে ওই তালিকা প্রকাশ করবে। তবে সাতদিন নয়, কমিশনের তৎপরতায় মাত্র দু’দিনে সেই তালিকা প্রকাশ্যে এল।
৭ ও ১৪ সেপ্টেম্বরের নিয়োগ পরীক্ষায় যাঁদের বসার কথা, তাঁরাও পড়েছেন আতান্তরে। এত বছর চাকরি করার পর পরীক্ষা দেওয়ার মতো মানসিকতা তাঁদের অনেকের নেই। স্কুলের চাপ, সংসারের ঠেলা সামলে ফের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সেই জেদ এখন আর নেই। যোগ্যদের বক্তব্য, ভুল বা দুর্নীতি যদি কেউ করে থাকে, সেটা তো কমিশন করেছে, রাজ্য সরকার করেছে। তাহলে শাস্তি কেন তাঁরা পাচ্ছেন? এই বয়সে তাঁদের কেন নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে?
সত্যিই তো অন্যায় কিছু বলছেন না তাঁরা। সেজন্যই চাকরি ফিরে পেতে দাগিদের তালিকাকে হাতিয়ার করে তাঁরা ফের আইনি লড়াইয়ে নামতে চলেছেন। তাঁদের যুক্তি, অযোগ্য বাছাই যখন হয়েই গিয়েছে, তখন যোগ্যদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আবার অযোগ্যরাও আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। এই আইনি লড়াইয়ের শেষ কোথায়, কেউ জানেন না।



