রাহুল দাস
কোনও সমাজের নৈতিক শক্তি পরিমাপ করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা প্রশাসনের দিকে তাকালে পুরো ছবি পাওয়া যায় না, দেখতে হয় শিক্ষক সমাজকে- যারা আগামী প্রজন্মের বিবেক, যুক্তি ও ন্যায়বোধ গড়ে তোলে। সেই হিসেবে ‘হীরক রাজার দেশে’-র উদয়ন পণ্ডিত কেবল এক চরিত্র নন; তিনি সত্য, প্রতিবাদ ও মূল্যবোধের এক প্রতীক। অত্যাচারী রাজশাসনের মুখোমুখি হয়েও যিনি নির্ভয়ে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, শিশুদের শিখিয়েছিলেন স্বাধীনভাবে ভাবতে। রাজ-রোষের পরোয়া তিনি করেননি। কিন্তু আজকের বাস্তবে দাঁড়িয়ে মনে হয়- এই উদয়ন পণ্ডিতরা যেন ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। গল্পের প্রতীকী প্রতিবিম্ব যেন সত্যি হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক–প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে।
২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি তার সর্বাধিক জ্বলন্ত উদাহরণ। সুপ্রিম কোর্ট পুরো প্যানেল বাতিল করে দেওয়ার পর রাতারাতি প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী চাকরি হারান। মিলেমিশে যায় ‘যোগ্য-অযোগ্য’-র খেলা। চতুরতার সঙ্গে পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা কোনও উপন্যাসের কায়দায়। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, যোগ্যতার সার্টিফিকেট-সবই মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যায় যোগ্যদের। আন্দোলনের মাঝে, ব্রেনস্ট্রোকে সুবল সোরেনের মৃত্যু যেন সেই অবিচারের সবচেয়ে নির্মম দলিল। কিন্তু এঁদের পাশে দাঁড়ালেন কতজন সহকর্মী শিক্ষক-শিক্ষিকা? যাঁরা চাকরি হারালেন না, তাঁরা কি খুব বেশি সংখ্যায় তাঁদের সহকর্মীদের হয়ে সোচ্চার হলেন? অভিজ্ঞতা বলছে- না! দাঁড়ালেন না। মুখ খুললেন না।
এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সমাজের মেরুদণ্ড বলে যাদের চিহ্নিত করা হয়, সেই শিক্ষক সমাজের এক বড় অংশের নীরবতা প্রশ্ন তোলে-তাদের নৈতিক অবস্থান কি সত্যিই তা-ই, যা আমরা ধরে নিতে ভালোবাসি? নাকি বাস্তবের চাপ, সুবিধা ও নিজস্ব নিরাপত্তাবোধ তাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, সত্য উচ্চারণের শক্তিটুকুও ক্ষয়প্রাপ্ত?
এই প্রেক্ষাপটে এই রাজ্যে এসআইআর নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা যেন আরও একটা দ্বিচারিতার প্রতিচ্ছবি। দেশের বহু রাজ্যে একই প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চললেও পশ্চিমবঙ্গে দেখা যাচ্ছে আতঙ্ক, অভিযোগ, অসন্তোষের বিচিত্র মিশ্রণ। অধিকাংশ বুথ লেভেল অফিসাররা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নিজেদের কাজ সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু কিছু বিএলও অসুস্থ হলে দাবি উঠছে-দায়িত্বের চাপ তাঁদের ভেঙে দিচ্ছে, যেন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হন না। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কিছু জায়গায় যেসব বিক্ষোভ হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে, সেখানে অংশগ্রহণকারীদের এক বড় অংশই স্বীকার করছে- তারা বিএলও নয়! তাদের যুক্তি, ‘সহকর্মীদের জন্য পথে নেমেছি।’
সহানুভূতির এই প্রদর্শন অবশ্যই ভালো, তবে প্রশ্নটা তখনই তীব্র হয়ে ওঠে- যখন সহকর্মীরা দুর্নীতির চাপে চাকরি হারালেন, সুবল সোরেনের মতো মানুষ প্রাণ হারালেন-তখন এই সহানুভূতি কোথায় ছিল? যেখানে প্রয়োজন ছিল ন্যায়বোধের, সেখানে নীরবতা। যেখানে প্রয়োজন ছিল প্রতিবাদের, সেখানে নিরাপদ দূরত্ব। অতএব, প্রশ্ন উঠতেই পারে- এই শিক্ষক সমাজই কি আগামীর সচেতন নাগরিক তৈরির দায়িত্ব বহন করবে? যারা নিজেরাই অন্যায় দেখেও নিশ্চুপ, তারা কি নতুন প্রজন্মকে সাহস, যুক্তি আর নৈতিকতার শিক্ষা দিতে পারে? উত্তরটা বোধহয় জটিল নয়।
সবশেষে বলতে দ্বিধা নেই যে আরজি করের নিকৃষ্টতম ঘটনায় ডাক্তারবাবুরা, নার্সরা যে সাহস দেখিয়েছিলেন, জোট তৈরি করেছিলেন, কর্মবিরতির মতো পদক্ষেপ করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক সমাজ তার সিকিভাগও করতে পারল না। অথচ শিক্ষক সমাজের অবদান হওয়া উচিত ছিল আরও বেশি তীব্র।
(লেখক অক্ষরকর্মী। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা।)

