মেখলিগঞ্জ: পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছে পুরোনো হিসেব মিটিয়ে নতুন খাতায় নতুন হিসেব শুরু করার দিন। এই উপলক্ষ্যে দোকানের গ্রাহকদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের বিভিন্নরকমের মিষ্টি খাওয়ানো বা তাঁদের হাতে মিষ্টির প্যাকেট ও বাংলা ক্যালেন্ডার তুলে দেওয়া। লাল মলাটের হালখাতা হল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সৌহার্দ্যের প্রতীক। তিন দশক আগেও কোচবিহার জেলার প্রান্তিক শহর মেখলিগঞ্জে পয়লা বৈশাখের দিন সব দোকানে ক্রেতারা হালখাতা করতে যেতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জৌলুস কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে।
একসময় পয়লা বৈশাখের সপ্তাহখানেক আগে থেকে দোকানে দোকানে তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ জানাতে ব্যবসায়ীরা কার্ড ছাপাতেন। যাঁরা দোকানে হালখাতা করতে আসতেন, তাঁদের বিনম্রভাবে মনে করানো হত বকেয়া পরিশোধ করার কথা।
বর্তমান সময়ে অনলাইন শপিং, শপিং মলের ভিড়ে হালখাতার সেই চেনা ছবি যেন অনেকটাই ফিকে। ব্যবসায়ীরাও এককথায় স্বীকার করে নিয়েছেন যে, আগে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটা আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে উঠত। তাই হালখাতার অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হত। কিন্তু বর্তমানে হাতে হাতে স্মার্টফোন চলে আসায় বেশিরভাগ মানুষ বিশেষত যুবসমাজ এখন বাড়িতে বসে জামাকাপড় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা করছে। ফলে বাজারের পুরোনো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁদের আর সেরকম সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না।
মেখলিগঞ্জের ব্যবসায়ী বিষ্ণুপদ ঘোষের কথায়, ‘এখন ক্রেতাদের একটা বড় অংশ অনলাইন শপিংয়ে নগদ টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কিনছে। যার প্রভাব আমাদের ব্যবসার ওপর পড়েছে। ফলে হালখাতা শুধু নিয়ম রক্ষার পর্যায়ে চলে এসেছে।’
শহরের প্রবীণদের একাংশের মতে, দোকানে গিয়ে দরাদরি করে কেনাকাটার মধ্যে দিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ক্রেতাদের সম্পর্ক মজবুত হয়। বর্তমান যুগে এসব আর দেখা যায় না বললেই চলে। মেখলিগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা সমীরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সে সময় একটা লাল রংয়ের বড় খাতা থাকত, যা লাল কাপড়ে বাঁধা থাকত। পয়লা বৈশাখের দিন গণেশপুজো হত। নিয়ন্ত্রিতদের বসিয়ে পাত পেড়ে লুচি, সবজি, মিষ্টি, জিলাপি খাওয়ানো হত। এখন সেসব আর নেই। ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এখন অনলাইনে শপিং করতে অভ্যস্ত। যার ফলে ব্যাবসায়ীরাও নিজেদের হালখাতার অনুষ্ঠানে অনেক কাটছাঁট করেছেন।’
মেখলিগঞ্জের ব্যবসায়ী শ্যাম মাহেশ্বরী জানান, আগে হালখাতার একটা অন্যরকম জৌলুস ছিল। ক্রেতাদের ডেকে বসিয়ে খাওয়ানোর পাশাপাশি বকেয়া মেটানোর কথোপকথন হত। বর্তমানে সম্পর্কগুলো কৃত্রিম হয়ে গিয়েছে। নিয়মরক্ষার জন্য মিষ্টির প্যাকেট করা হয়। কিন্তু ডাকলেও ক্রেতাদের একাংশ আসেন না।

