উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে ফেরার প্রচ্ছন্ন আমন্ত্রণ। ২০২৬-এর শুরুতে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ফের সেই পরিচিত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা চরম চাপের কৌশলে ফিরলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন নৌবহর যখন পারস্য উপসাগরের দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই তেহরানকে পরমাণু চুক্তির নতুন এক প্রস্তাব দিলেন তিনি।
রণতরীর গর্জনের মাঝে শান্তির বার্তা?
বৃহস্পতিবার জনৈক ঘরোয়া পরিবেশে—ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের প্রিমিয়ারে—বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে মুখ খোলেন ট্রাম্প। সেখানে তাঁর গলায় শোনা গেল এক অদ্ভুত দ্বৈত সুর। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন-সহ এক বিশাল ‘আর্মাদা’। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সংযোজন, “আশা করি ওগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হবে না। আমরা চাই পরমাণু চুক্তি নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হোক।”
ট্রাম্পের এই কৌশলী অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি যুদ্ধের চেয়ে বেশি আগ্রহী একটি ‘বেটার ডিল’ বা তাঁর পছন্দের শর্তে চুক্তিতে পৌঁছাতে। তবে নিজের সামরিক শক্তির মহড়া দিতেও তিনি পিছপা নন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর প্রথম মেয়াদে সেনাবাহিনী যে শক্তি অর্জন করেছে, তা যে কোনো মুহূর্তে লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
তেহরানের প্রতিক্রিয়া: ‘ট্রিগারে আঙুল’
মার্কিন চাপের মুখে ইরানও যে নতিস্বীকার করতে রাজি নয়, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশটির বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি। তাঁর সোজাসাপ্টা হুঁশিয়ারি—ইরানি সামরিক বাহিনীর ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’। অর্থাৎ, কোনো রকম উস্কানি বা সীমিত হামলা হলে ইরান তার ‘যোগ্য জবাব’ দিতে মুহূর্ত দেরি করবে না।
আরঘচি আলোচনার পথ একেবারে বন্ধ না করলেও শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। তেহরানের দাবি, আলোচনা হতে পারে কেবল ‘পারস্পরিক মর্যাদা’ এবং ‘পক্ষপাতহীন’ পরিবেশ তৈরি হলে। চাপের মুখে বা হুমকির পরিবেশে কোনো চুক্তিতে সই করবে না খামেনেই প্রশাসন।
অন্দরে বিক্ষোভ, বাইরে অবরোধ
মার্কিন এই সামরিক সক্রিয়তার পেছনে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি ইরানে সরকার বিরোধী যে গণবিক্ষোভ দানা বেঁধেছে, ট্রাম্প প্রশাসন তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা চাইছে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করতে—ভিতর থেকে জনরোষ আর বাইরে থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ।
এখন কোন দিকে জল গড়াবে?
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এখন পশ্চিম এশিয়ার সমুদ্রসীমায় মোতায়েন। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্ট: তেহরানকে পরমাণু অস্ত্র ত্যাগের চূড়ান্ত মুচলেকা দিতে বাধ্য করা। অন্যদিকে, ইরানের লক্ষ্য সেই চুক্তিতে নিজেদের অধিকার ও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখা।
‘চাবুক আর চিনি’র এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কে কাকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করে, নাকি পারস্য উপসাগরের নীল জল আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে ওঠে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।

