সদ্য সংসদে অপারেশন সিঁদুর সম্পর্কে আলোচনায় বিরোধীরা কার্যত ভারত সরকারকে ভীতু, কাপুরুষ বলে নিন্দা করেছে। তিনদিনের মাথায় যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়াকে একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের কাছে নতিস্বীকার বলেছে, অন্যদিকে পাক অধিকৃত কাশ্মীর পুনর্দখলের সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার জন্য সরকারের সৎসাহসের অভাব বলে তীব্র সমালোচনা করেছে। এটা ঘটনা যে ট্রাম্প বারবার যুদ্ধবিরতিতে তাঁর কৃতিত্ব জাহির করলেও কেন্দ্র কখনও তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেনি।
তৎসত্ত্বেও বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপ শেষ কথা নয়। অনেক ভেবেচিন্তেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পথে হাঁটেনি ভারত। যত দিন যাচ্ছে, সেই সত্যটা তত স্পষ্ট হচ্ছে। সেই পিছিয়ে আসার কারণ কিন্তু যুক্তিসংগত। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অর্থ শুধু সীমান্তে গোলাগুলি কিংবা হঠাৎ একদিন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা আচমকা ড্রোন পাঠিয়ে পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটি ধূলিসাৎ করে দেওয়া নয়। যুদ্ধ মানে দুই বা ততোধিক দেশের সার্বিকভাবে গোটা ভূখণ্ডকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলা।
ঠিক যেমন হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন বা প্যালেস্তাইন-ইজরায়েলে। অন্যদিকে, আমেরিকা কিন্তু একদিন ইরানে বোমা ফেলেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলল। ভারতের বিজেপি জমানা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই দল পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার সার্বিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে খুব আগ্রহী নয়। ভোটের অঙ্কে জাতীয়তাবাদ উসকে দিতে যতটুকু না করলে নয়, তার বেশি পদক্ষেপ করতে নারাজ মোদি সরকার।
নাহলে নিশ্চয়ই ২০২২ সালে গলওয়ানে ভারতের ২০ জন সৈনিককে চিন মেরে ফেলার পর নয়াদিল্লি যুদ্ধ না করলেও অন্তত যুদ্ধের হুংকার দিত। পুলওয়ামার পরে সুযোগ তৈরি হলেও ভারত শেষপর্যন্ত সর্বাত্মক যুদ্ধে যায়নি। কেন বারবার সার্বিক যুদ্ধ এড়াচ্ছে মোদির সরকার? প্রথমত, প্রকৃত অর্থে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক ফিরে আসা অসম্ভব। যুদ্ধ তখন রাশিয়া-ইউক্রেন, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইনের মতো দীর্ঘস্থায়ী হতে বাধ্য।
যুদ্ধ করতে করতে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে গেলে (পহলগামের পর যে প্রত্যাশা দেশবাসীর বড় অংশের ছিল) সেই সংঘাত থেকে ফিরে আসা তখন কঠিন হত। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ মানে বিপুল অঙ্কের অর্থব্যয়। ২০২৪ সালে মস্কো প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে রাশিয়ার রোজ খরচ ছিল ২৮. ৯ কোটি ডলার। তার আগে আফগানিস্তান যুদ্ধে আমেরিকার ২০ বছর ধরে প্রতিদিন খরচ হয়েছে ৩১.৬ কোটি ডলার।
যুদ্ধে জড়ালে এই বিপুল খরচের কথা ভারতের মাথায় ছিল। এমন নয় যে, ভারতের কোষাগারের হাল খারাপ। সেই টাকার জোগান একেবারে অনিশ্চিত নয়। বরং বিশ্বব্যাংকের ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি আর্থিক বছরে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার ৭ শতাংশ। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অর্থনীতির অগ্রগতি ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব। বরং পাকিস্তানের অর্থনীতি বেহাল।
সেদেশের প্রধান সংবাদপত্র ‘ডন’-এর গত এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী পাকিস্তান প্রায় পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডারের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া তেহরিক-ই তালিবান ও বালোচ লিবারেশন ফ্রন্টের সুবাদে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। এই সময় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ মানে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। ইসলামাবাদের যা কিছু আস্ফালন, তা হয় চিন, না হয় আমেরিকার হাত মাথার ওপর আছে বলে।
এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির অনুকূল নিশ্চয়ই। নরেন্দ্র মোদি সেই কাজটিই করছেন। হুংকার দিয়ে একদিকে চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে দেশে জাতীয়তাবাদী বোধকে উসকে ভোটের অঙ্ক কষছেন। শুধু যুদ্ধে জড়িয়ে অহেতুক বিপুল খরচ বাড়িয়ে দেশের সর্বনাশ করার মতো আহাম্মকি নয়াদিল্লি করবে না বলেই এই সতর্ক পদক্ষেপ। কারও প্ররোচনাতেই যে সেই অবস্থান থেকে কেন্দ্র নড়বে না, তা সদ্য সংসদে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আলোচনায় আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।



