বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

Orange | কমলার সুবাস কাঁটাতারের ওপারেও

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: কয়েকশো একরজুড়ে চা বাগান, সকালে ঘুম ভেঙে দেখা মিলছে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার; আর অসম্পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন করেছে কমলার (Orange) সুবাস। শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ি নয়, এ ছবি কাঁটাতারের ওপারের উত্তরবঙ্গের। ডিসেম্বরে যেন মিনি দার্জিলিং হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পঞ্চগড় বা ঠাকুরগাঁও। ভারতের উত্তরবঙ্গ আভিজাত্যে মোড়া। সে যেন তার উচ্চতা ও শীতল মেজাজ নিয়ে গর্বিত। তার গল্পে পাহাড়ি স্রোত আর বন্য হাতির ডাক। আর এক উত্তরবঙ্গ কাঁটাতারের ওপারে, বাংলাদেশে, সে মাটির কাছে ঋণী। তার অহংকার ফসলের মাঠে। সে কঠোর পরিশ্রমী, তার গল্প ধরলার বাঁকে আর শীতের তীব্রতায় লেখা। একজন হিমালয়ের ছায়ায় বিলাস খোঁজে, অন্যজন প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবন ফলায়। আপাতত দুই উত্তরবঙ্গকে মিলিয়েছে পাতলা চামড়ার রসালো সোনালি ফল। স্বাদে-গন্ধে হুবহু এক না হলেও দার্জিলিংয়ের প্রজাতির কমলা ফলিয়ে তাক লাগিয়েছে ওপার বাংলার উত্তরবঙ্গ।

শিলিগুড়ির কাছে বাংলাদেশের পঞ্চগড়, গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও, পীরগঞ্জ, নীলফামারি, চুয়াডাঙ্গার মতো অনেক এলাকাতেই মিলছে দার্জিলিংয়ের মান্দারিন। যে কমলার নাম শুনলেই পাহাড়ি ঠান্ডা আর কুয়াশার ছবি ভেসে উঠত, তা এখন সমতলের আঙিনায় দুলছে। শখে নয়, বাংলাদেশে কমলার চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবেই। সেদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পঞ্চগড় (বিশেষ করে তেঁতুলিয়া), ঠাকুরগাঁওতেই সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে দার্জিলিংয়ের মান্দারিন। সিলেট, মৌলভীবাজার, সাজেক, বাঘাইছড়ি, খাগড়াছড়ি অঞ্চলেও অল্প পরিমাণে চাষ করা হচ্ছে। ২০১০-এর শুরুর দিকে পরীক্ষামূলকভাবে দার্জিলিং কমলার উন্নত জাতের চারা নিয়ে গিয়ে চাষ শুরু করা হয়েছিল। ২০১৫ সালের পর পঞ্চগড়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কিছু কৃষকের চেষ্টায় বাণিজ্যিকভাবে চাষের এলাকার বিস্তার ঘটে।

টেলিফোনে ঠাকুরগাঁও-এর একটি কমলা বাগানের ম্যানেজার ওমর আলি বলেন, ‘‘প্রথম দিকে আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি যে দার্জিলিংয়ের কমলা সমতলে জন্মাতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান আর পরিশ্রম মিলে যখন প্রথম কয়েকটি গাছে টুকটুকে ফল এল, সবাই তো রীতিমতো অবাক। এখন গ্রামের বাজারেও আমাদের কমলাকে লোকে ‘দার্জিলিং কমলা’ হিসাবেই কিনছে।’’ পঞ্চগড়ের চাকলার হাট ইউনিয়নের বাগান মালিক মিজানুর সিদ্দিকীর কথা, ‘আমাদের চা বাগান আছে। তার পাশেই পরীক্ষামূলকভাবে দার্জিলিং কমলার বাগান করেছিলাম। গত বছর প্রথম ফলন এসেছিল। এবছর প্রচুর ফলন হয়েছে। ভবিষ্যতে কমলা বাগান আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা আছে।’

ওপার বংলার সমতলে দার্জিলিং প্রজাতির কমলা চাষে উৎসাহিত কৃষি বিজ্ঞানীরা। বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডিন সুভাষচন্দ্র রায়ের কথা, ‘দার্জিলিংয়ের মান্দারিনের মতো আন্তর্জাতিক আইন মেনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহু কৃষিজ প্রজাতির ফসল চাষ হচ্ছে। এক্ষেত্রে কলম কার্টিং সহ নানা পদ্ধতিতে কমলার চাষ হতে পারে। যদিও কোনও অবস্থাতেই হুবহু একরকম ফল পাওয়া যাবে না। খানিকটা আলাদা হবেই। তবে বাংলাদেশে যা হয়েছে তা কৃষি বিজ্ঞানীদের অবশ্যই উৎসাহ দেবে।’ বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক আধিকারিক টেলিফোনে জানিয়েছেন, পদ্ধতিগতভাবে সেদেশের মাটি এবং আবহাওয়াতে দীর্ঘজীবী এবং রোগ প্রতিরোধকারী অথচ স্বাদে টক প্রজাতির কমলার গাছের সঙ্গে দার্জিলিংয়ের সুগন্ধি এবং সুস্বাদু প্রজাতির কমলার গাছের মিলন ঘটানো হয়েছে। ফলে যে প্রজাতি পাওয়া গিয়েছে তার ফল স্বাদে, গন্ধে দার্জিলিং মান্দারিনের মতো অথচ সমতলের তুলনায় উষ্ণ এলাকায় গাছটি রোগ প্রতিরোধ করে টিকে থাকতে সক্ষম।

সব মিলিয়ে দার্জিলিংয়ের মান্দারিন এখন যেন দুই বাংলার অঘোষিত দূত। কাঁটাতার, পাসপোর্ট, ভিসার ঝকমারি এড়িয়ে পাহাড়ের ঐতিহ্যকে সমতলে নতুন দুনিয়া গড়ে দিয়েছে প্রকৃতি। সীমান্তের ওপারে দ্বিতীয় উত্তরবঙ্গ মজেছে সিটংয়ের মিষ্টি ঘ্রাণে।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

More like this
Related

Cooch Behar | ৫০ বছরেও চালু হয়নি বিজ্ঞান বিভাগ

দেবদর্শন চন্দ, কোচবিহার: কলাবাগান হাইস্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষ চলছে।...

Tufanganj Hospital | দু’দিন বন্ধ ইউএসজি, হয়রানি তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে

বাবাই দাস, তুফানগঞ্জ: চিকিৎসক দু’দিন ধরে ছুটিতে। আর তাই...

Uttar Dinajpur | ক্ষুদ্র আলুচাষিদের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ, প্রশাসনিক বৈঠকে হিমঘর নিয়ে সিদ্ধান্ত 

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: কিছুদিনের মধ্যেই জমি থেকে আলু তোলা...

Raiganj | বন্ধুকে ভিনরাজ্যে ‘বিক্রি’, অভিযুক্ত তরুণকে গণধোলাই গ্রামবাসীর 

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: বন্ধুকে ভিনরাজ্যে কাজ দেওয়ার নাম করে...