তৃণমূলের ঐতিহাসিক পতন : কাঠগড়ায় কে?

শেষ আপডেট:

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

চৈত্র-বোশেখের কাঠফাটা রোদ আর কালবৈশাখীর দাপট পেরিয়ে যখন বিধানসভা নির্বাচনের ফল সামনে এল, তখন বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় ভূমিকম্প ঘটে গিয়েছে। যে নবান্ন পনেরো বছর ধরে ঘাসফুলের অভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত ছিল, তা আজ কার্যত ধূলিসাৎ। তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল ও ঐতিহাসিক পরাজয় কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, এটি একটি সুসংগঠিত, আত্মতুষ্ট এবং অহংকারী সিস্টেমের অনিবার্য পতন। কিন্তু এই মহাবিপর্যয়ের দায় কার? শুধু কি পনেরো বছরের দীর্ঘ শাসনে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাই এই পতনের একমাত্র কারণ? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে দলের অন্দরের এক জটিল, আত্মঘাতী সমীকরণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু ইভিএমের বোতাম নয়, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মানসিকতা, নীতি এবং চরম ঔদ্ধত্যের ময়নাতদন্ত করা প্রয়োজন।

রাজনীতির কারবারিরা অনেক সময় দলের হারকে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’র সুবিধাজনক মোড়কে ঢেকে দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু তৃণমূলের এই হার কোনও সাধারণ হার নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক নেত্রী, যিনি এর আগে বহুবার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়াকে নিজের জনমোহিনী জাদুতে রুখে দিয়েছেন। তাহলে এবার কী হল? এবার যা হল, তা আসলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক আগ্নেয়গিরি, যার বিস্ফোরণ ঠেকানোর ক্ষমতা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো সফল জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেরও ছিল না। দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ, তোলাবাজি এবং স্কুল স্তরের নিয়োগ দুর্নীতির মতো ঘটনাগুলি সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। দলের নীচুতলার নেতাদের আকাশছোঁয়া ঔদ্ধত্য, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষকে কার্যত প্রজা মনে করার প্রবণতা তৃণমূলকে মাটি থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। রাজ্যের যুবসমাজ যখন কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের তকমা গায়ে মাখছে, তখন নেতাদের ফুলেফেঁপে ওঠা সম্পত্তি দেখে মানুষের মনে যে নীরব ঘেন্না তৈরি হচ্ছিল, তা এবার আছড়ে পড়েছে ব্যালট বক্সে।

তবে এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল আরজি কর মেডিকেল কলেজের মর্মান্তিক ঘটনা। অগাস্ট মাসের ওই ঘটনা এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজ্য প্রশাসনের নির্লজ্জ ভূমিকা বাংলার মধ্যবিত্ত, সুশীল সমাজ এবং সর্বোপরি মহিলাদের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যে মহিলারা ছিলেন তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক, তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে মাসিক দেড় হাজার টাকার অনুদান তাঁদের কন্যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বিচারের দাবিতে ‘রাত দখল’-এর মতো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে যখন রাজপথ উত্তাল, তখন শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের চরম অসংবেদনশীল মন্তব্য এবং পুলিশি দাদাগিরি পরিস্থিতিকে হাতের বাইরে নিয়ে যায়। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, দল হিসেবে তৃণমূল তার নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছে।

এই সার্বিক পতনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ওঠে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে। গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে অভিষেক নিজেকে কার্যত তৃণমূলের ‘সিইও’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাজ করার ধরনটি ছিল সুবিধাবাদী এবং চূড়ান্ত খামখেয়ালি। যখন দলের কোনও বড় সাফল্য এসেছে—তা সে একুশের বিধানসভা নির্বাচন হোক, পঞ্চায়েত ভোট হোক বা ‘নবজোয়ার’ কর্মসূচির ভিড় হোক—তিনি এবং তাঁর অনুগামীরা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সেই সাফল্যের কৃতিত্ব নিজেদের কর্পোরেট পিআর টিমের ‘সায়েন্টিফিক ম্যানেজমেন্ট’-এর খাতায় তুলে নিয়েছেন। সমস্ত আলো তিনি নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। কিন্তু যখনই দল কোনও চরম সংকটের মুখে পড়েছে, তখনই তিনি দায় এড়িয়ে রহস্যজনকভাবে নিজেকে আড়ালে সরিয়ে নিয়েছেন। আরজি কর কাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে যেখানে তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখানোর কথা ছিল, সেখানে তিনি হয় নীরব থেকেছেন, নয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কিছু হঠকারী মন্তব্য করেছেন যা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। চিকিৎসকদের আন্দোলনের জেরে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাঁর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট সাধারণ মানুষ এবং চিকিৎসক মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সাফল্য এলে বুক বাজিয়ে সামনে আসা, আর ব্যর্থতা বা বিতর্কের সময় নিজেকে সুকৌশলে গুটিয়ে নেওয়ার এই দ্বিমুখী ‘কর্পোরেট কৌশল’ দলের নীচুতলার কর্মীদের কাছে অত্যন্ত ভুল বার্তা দিয়েছিল। তিনি ক্ষমতার নির্যাসটুকু ষোলোআনা উপভোগ করেছেন, কিন্তু বিপদের দিনে নেতার আসল দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা নিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ভুলটি ছিল দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে তাঁর সর্বনাশা এক্সপেরিমেন্ট। তৃণমূল কোনও বহুজাতিক কোম্পানি নয় যে অ্যালগরিদম আর এক্সেল শিট দিয়ে তা চালানো যাবে। এই দল তৈরি হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ লড়াই, ঘাম আর রক্ত ঝরানো মাঠের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু অভিষেক রাজনীতিকে কর্পোরেট ছাঁচে ফেলতে গিয়ে দলের সেই আত্মাই শেষ করে দিলেন। ‘নবীন বনাম প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব কোনও সংবাদমাধ্যমের কল্পনা ছিল না, এটি ছিল অভিষেকের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক সুপরিকল্পিত কৌশল। দলের রাশ নিজের হাতে রাখতে তিনি বেছে বেছে সেইসব প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং পোড়খাওয়া নেতাকে কোণঠাসা করলেন, যাঁরা দলের দুর্দিনে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। তাঁদের জায়গায় তিনি এমন একদল নতুন মুখ, সেলেব্রিটি এবং ‘আমদানিকৃত’ নেতাদের সামনে আনলেন, যাঁদের না আছে রাজনৈতিক পরিপক্বতা, না আছে কোনও জনভিত্তি।

এই চরম অহংকারী এবং একনায়কতান্ত্রিক নীতির সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে। দলের পুরোনো এবং বিশ্বস্ত নেতাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে অভিষেক নিজের পছন্দমতো প্রার্থীদের টিকিট বিলি করলেন। উদাহরণস্বরূপ জলপাইগুড়ির স্বপ্না বর্মনের কথা বলা যায়। একজন সফল অ্যাথলিট হিসেবে তাঁর সম্মান প্রশ্নাতীত, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তিনি একেবারেই আনকোরা। রাজগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে স্থানীয় সংগঠন এবং পোড়খাওয়া নেতাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাঁকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত কতটা হঠকারী ছিল, তা আজ প্রমাণিত। রাজনীতি কেবল মুখের পরিচিতি দিয়ে হয় না, এর জন্য প্রয়োজন হয় বুথ স্তরের মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ।

একইভাবে শিবশংকর পাল বা পবিত্র করের মতো নামগুলোর ক্ষেত্রেও একই ভুল করা হয়েছিল। প্রবীণ নেতাদের সরিয়ে এই ধরনের নতুন বা অন্য দল থেকে আসা নেতাদের টিকিট দেওয়াটা দলের অন্দরে আক্ষরিক অর্থেই বোমার মতো ফেটেছিল। পবিত্র করের মতো প্রাক্তন বাম ও বিজেপি নেতাকে দলে টেনে এনে সরাসরি টিকিট দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলি স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের আত্মসম্মানে প্রবল আঘাত হেনেছিল। যে কর্মীরা বছরের পর বছর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাঁদের ঘাড়ের ওপর আচমকা বহিরাগতদের চাপিয়ে দেওয়া হলে ক্ষোভ তো তৈরি হবেই। অভিষেক ভেবেছিলেন তাঁর পিআর এজেন্সির তৈরি করা ডেটা এবং চকচকে সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেনই এই নেতাদের জিতিয়ে আনবে। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, বাংলার রাজনীতি আজও বুথ স্তরের ‘দাদা’দের ওপর নির্ভরশীল।

এর ফল যা হওয়ার ঠিক তা-ই হয়েছে। প্রবীণ নেতারা এবং তাঁদের অনুগামীরা হয়তো প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁরা এমন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন যা দলের পক্ষে আরও বেশি মারাত্মক প্রমাণিত হল। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই নিষ্ক্রিয় হয়ে বাড়িতে বসে গেলেন। বাংলার রাজনীতির ভাষায় যাকে বলে ‘ভিতরে ভিতরে সাবোতাজ’। ভোটের দিন সকালে যে বুথভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট, ভোটারদের বাড়ি থেকে বুথে নিয়ে আসা এবং স্থানীয় স্তরে বিরোধীদের মোকাবিলা করার যে বিশাল নেটওয়ার্ক তৃণমূলের ছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। কর্পোরেট এজেন্সির ল্যাপটপধারী এগজিকিউটিভরা এসি ঘরে বসে ডেটা অ্যানালিসিস করতে পারেন, কিন্তু রোদে পুড়ে বুথের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মেজাজ বুঝতে পারেন না। প্রবীণদের নিষ্ক্রিয়তা আর অভিষেকের চাপিয়ে দেওয়া আনকোরা প্রার্থীদের অসহায়তা—এই দুইয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে তৃণমূলের ভোটব্যাংক সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেল।

তৃণমূলের এই পরাজয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলির কাছে একটি বড় শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে দিল যে, শুধুমাত্র বিপুল পরিমাণ অনুদান ছড়িয়ে এবং পুলিশের সাহায্যে ভয় দেখিয়ে চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। মানুষের ক্ষোভ যখন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে, তখন কোনও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ই ঢাল হিসেবে কাজ করে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা এবং আবেগ হয়তো এখনও কিছু মানুষের মনে বেঁচে আছে, কিন্তু তাঁর ভাইপোর চরম ঔদ্ধত্য, জবাবদিহিহীনতা এবং কর্পোরেট স্টাইলে দল চালানোর জেদ তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে। সাফল্যকে নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির করা এবং ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার যে রাজনীতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছর ধরে চর্চা করে এসেছেন, বাংলার মানুষ এবার ইভিএমে তার কড়া জবাব দিয়েছেন।

ছাব্বিশের এই বিধানসভা নির্বাচন প্রমাণ করে দিল যে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই পতন বিরোধীদের শক্তির চেয়েও বেশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ পচন এবং নেতৃত্বের দেউলিয়াপনার ফসল। মাটি থেকে উঠে আসা একটি দল যখন কর্পোরেট অহংকারে বুঁদ হয়ে নিজের শিকড়কেই কেটে ফেলে, তখন তার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তৃণমূলের এই ঐতিহাসিক বিপর্যয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে রইল।

(লেখক সাংবাদিক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...