অন্তর্ঘাতের খেসারতও

শেষ আপডেট:

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া ছিল। মেরুকরণের ধাক্কা অতি বাস্তব। তবে তৃণমূলের চরম বিপর্যয়ের আরও একটি কারণ আছে। সেকারণটির বীজ রয়েছে দলের মধ্যে। অসন্তোষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ডুবিয়ে দিয়েছে তৃণমূলকে। দলের নির্বাচনি সাফল্যের চেয়েও তৃণমূলের একাংশে বড় হয়ে উঠেছিল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ। সেই স্বার্থের পিছনে কোথাও ছিল সাংগঠনিক ক্ষমতা। কোথাও ছিল জনপ্রতিনিধির পদ নিয়ে আঁকচাআঁকচি। কোথাও বাস্তব ছিল বেআইনি কারবারের যোগসাজশ।

খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শত চেষ্টা করেও সেই দ্বন্দ্বকে সামাল দিতে পারেননি। কোথাও কোথাও তাঁদের হুমকিতে ধামাচাপা পড়েছিল মাত্র। কিন্তু দলের মধ্যে গোপনে, লুকিয়ে পরস্পরের ক্ষতিসাধন তাতে থমকে যায়নি। তাতে সার্বিকভাবে দলের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও তৃণমূলের একাংশ মারাত্মকভাবে সেই কাজে তৎপর ছিল। অপছন্দের প্রার্থীকে হারানোর জন্য নিজে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা বা অনুগামীদের নিষ্ক্রিয় রাখার কৌশল নিয়েছেন অনেকে।

উত্তরবঙ্গে নজর দিলে দেখা যাবে, কোচবিহারে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ গোটা ভোটপর্বে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে ছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ কংগ্রেস শিবিরে ভিড়েছিলেন। কেউ চুপ থাকলেও ভোট দিয়েছেন পদ্ম চিহ্নে। অনেকে গোপনে বিজেপি প্রার্থীকে জেতানোর প্রচারও করেছেন। একই কথা খাটে রাজগঞ্জে সদ্য প্রাক্তন সভাপতি খগেশ্বর রায় কিংবা হরিশ্চন্দ্রপুরে প্রাক্তন মন্ত্রী তজমুল হোসেনের ক্ষেত্রে।

খগেশ্বর নিজে তৃণমূল প্রার্থী এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনের প্রচারে আঁঠার মতো সেঁটেছিলেন বৈকি। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠরা প্রথম থেকে বেঁকে বসেছিলেন স্বপ্নাকে প্রার্থী মনোনয়নের বিরোধিতা করে। হরিশ্চন্দ্রপুরে তজমুল ও তাঁর বাহিনী কার্যত প্রকাশ্যে তৃণমূলের বিরোধিতা করেছেন। জলপাইগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে পুরসভা ও তৃণমূলের অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার প্রার্থী পছন্দ হয়নি। প্রথম দিকে তাঁরা অসন্তোষ দেখিয়েছিলেন বটে। পরে প্রকাশ্যে দলীয় প্রচারে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে পিছন থেকে ছুরি মেরেছেন তৃণমূলকে।

আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া এলাকায় ভোটগণনার পর কয়েকজন মাঝারি স্তরের নেতা প্রকাশ্যে গেরুয়া আবির গায়ে মেখে উল্লাসে শামিল হয়েছিলেন। যাতে স্পষ্ট যে, তাঁরা গোপনে প্রচারপর্বে সরাসরি অন্তর্ঘাত করেছেন তৃণমূলে। বিজেপির এই বিপুল জয়ের পর তাঁদের অনেকে প্রকাশ্যে সেকথা স্বীকারও করছেন। এরকম উদাহরণ গোটা বাংলাজুড়ে। এতে প্রমাণ হয়, তৃণমূলের শত্রু তৃণমূলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। কেউ অতি সংগোপনে, কেউ কেউ কিছুটা প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতা চালিয়ে গিয়েছেন।

গোটা বাংলাজুড়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরে এই অন্তর্ঘাতের অভিঘাতের ধাক্কা বিরাট ছিল। যা প্রতিপক্ষের পক্ষে জনমতের সুনামির পাশাপাশি বিপুল ক্ষতি করেছে তৃণমূলের। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব তা একেবারে বুঝতে পারেনি, তা নয়। কিন্তু শাসকসুলভ দম্ভ ও ঔদ্ধত্যে সেই সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। ঘরের আগুনে যে এভাবে দল পুড়বে, তা বিশ্বাস করতে চায়নি। কাক যেমন চোখ বন্ধ রেখে মনে করে তাকে কেউ দেখছে না, তৃণমূল নেতৃত্বের অবস্থা তেমন হয়েছিল।

শীর্ষ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ চেহারাতেও নানা সমস্যা ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যেমন দলে নিজস্ব বৃত্ত আছে, তেমনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে। বৃত্তগুলির অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে তালমেল ছিল না। মমতার খুব কাছের নেতা ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাসরা অভিষেকের বৃত্তে আমল পেতেন না। একইভাবে অভিষেকের বলয়ের অনেকে ছিলেন মমতা শিবিরে ব্রাত্য।

সেসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব দলের জেলা স্তরে, নীচু স্তরে পড়েছে। জেলা স্তরে অনেকে সরাসরি অভিষেকের সদর দপ্তরের ঠিকানা ক্যামাক স্ট্রিটের অনুগামী বলে চিহ্নিত হতেন। কেউ কেউ সেই পরিচয়ে দলে ছড়ি ঘোরাতেন ও অভিষেকের লোক বলতে গর্ববোধ করতেন। ফিরহাদ, অরূপ প্রমুখের সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের সম্পর্ক বরাবরই অম্ল-মধুর ছিল। দলের সর্বোচ্চ স্তরে যদি এই অবস্থা থাকে, তবে নীচুতলায় তার ব্যত্যয় হবে কীভাবে! এসবেরই খেসারত তৃণমূলকে দিতে হল ভোটে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

কংগ্রেসে সমস্যা

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও কংগ্রেস কার্যত সমার্থক। স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে...

সঙ্গী চাই!

ভাগ্যের পরিহাস। ইতিহাসের পরিহাসও বটে। নতুন সঙ্গী খুঁজতে হচ্ছে...

প্রত্যাশা বহু

পঁচিশে বৈশাখ আপামর বাঙালির কাছে চিরন্তন আবেগের দিন। রবীন্দ্রনাথের...

বন্দনায় মরিয়া

হারের পর্যালোচনা নয়। দলের ভবিষ্যৎ রোড ম্যাপ নির্ধারণ নয়।...