রূপায়ণ ভট্টাচার্য
‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’ স্টাইলে গাইতে গাইতে যে ভঙ্গিতে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডানের বেশরম কর্তারা নৈহাটির তৃণমূলের প্রার্থীর প্রচারে নেমে গেলেন, তা দেখে আপনি কি অবাক?
আপনি কি অবাক, সিউড়ির মাঠে অনুব্রত মণ্ডলকে সিএবি প্রকাশ্যে সংবর্ধনা দিয়ে ফেলল জেনে? অনুব্রতর পাশে উত্তরীয় পরিহিত সহাস্য সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখে?
অবাক হবেন না প্লিজ। এই কর্তাদের অনেকদিনই লজ্জা নামক ভূষণটি খসে গিয়েছে। নবান্নের আশকারা ও আশীর্বাদ পেয়ে কর্তারা আপাতত যা খুশি তাই করে যাচ্ছেন। গোবিন্দ কারা, বুঝতেই পারছেন! ক্লাব ডুবছে, ফুটবল খেলাটা লাটে। ছুরি মারামারির খেলা চলছে এক ক্লাবে, অন্য ক্লাবে চলছে স্পনসর দুধেল গাইকে দুয়ে নিয়ে সুযোগ বুঝে ধাক্কা মেরে ফেলার খেলা। ক্রিকেটে চলছে ক্ষমতা ও অর্থের অপব্যবহার।
আপনি বলতে পারেন, তাই বলে এঁরা লজ্জা-ঘেন্নার মাথা খুইয়ে রাজনৈতিক দলের প্রচারে তাথৈ তাথৈ ভূতের নৃত্যের স্পর্ধা দেখাতে পারেন? তিনটে বড় ক্লাবেই সব রাজনৈতিক পার্টির সমর্থক রয়েছেন। তাঁদের কথা ভাবা হবে না?
স্তম্ভিত হয়ে যাই, সিএবির আন্তঃজেলা টি টোয়েন্টির মঞ্চে সিএবি প্রেসিডেন্টের পাশে সদ্য তিহার জেলফেরত অনুব্রতকে দেখে। তিনি অতিথি। তাঁর হাতে বই প্রকাশও হয় মঞ্চে। সৌরভ-স্নেহাশিস-অভিষেকদের ণত্বষত্ব লোপ পেল কী করে?
চুপ, চুপ। ভুলেও এসব বলবেন না। এটাই একটা আর্ট। শিল্প। যখন যে দল ক্ষমতায়, তার পাশে হাত কচলে ঝান্ডা ধরা। হলুদ-লালের পরিচিত কর্তা আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অন্দরে, রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সচিবের ঘরে ঘুরে বেড়াতেন অতীতে। এখন তিনি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে কার্যত অবজার্ভার হয়ে যান।
আর বলে হবে কী মহাশয়, এই ক্লাবগুলো বকলমে তৃণমূলেরই দীর্ঘদিন। গোয়েঙ্কা জমানায় গুরুত্ব হারানো মোহনবাগান মসনদে তৃণমূলের একঝাঁক নেতা। মহমেডান ক্লাব চালান তো তৃণমূলেরই কাউন্সিলার আমিনুদ্দিন ববি।
প্রশ্ন বরং একটা ব্যাপারে উঠতে পারে। কোন মোহন-ইস্ট আসলে ঘাসফুল প্রার্থীর প্রচারে হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল? পুরোনো মোহনবাগান, না আজকের মোহনবাগান সুপারজায়েন্ট? পুরোনো ইস্টবেঙ্গল, না এখনকার ইস্টবেঙ্গল এসসি? ক্লাবকর্তাদের এহেন সিদ্ধান্তে আসল মালিক সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বা মুরারিলাল লোহিয়ার মত আছে তো?
বাজি রেখে বলা যায়, এঁরা জানেনই না এসব। এঁরা ভারতবিখ্যাত শিল্পপতি। বিশেষ পার্টির প্রতি প্রকাশ্যে পক্ষপাত দেখিয়ে ভাবমূর্তি নষ্টের বান্দা নন। এমন ছেলেখেলায় যাবেন না কোনওদিন। তা হলে কোন ক্লাব আসলে তৃণমূলের সমর্থনে নামল? উত্তর সহজ। যে ক্লাব আসলে আইএফএ-র প্রায় উঠে যাওয়া কলকাতা লিগে খেলে। যে ক্লাবের মাঠ প্রায় সারাবছরই ফাঁকা পড়ে থাকে কান্না মেখে। দর্শক যান না। যান না বলাটা ভুল, বেচারারা যাওয়ার তেমন সুযোগই পান কোথায়? সদস্যরা চাঁদা দেন, কিন্তু বিনিময়ে কী প্রাপ্তি, তাঁরাই জানেন না।
ময়দানের মাঠগুলো আসলে মেরে ফেলেছেন কর্তারা সবাই মিলে। এককালে দেশের সেরা মাঠ মোহনবাগানে এবার একটা ম্যাচও খেলা হয়নি, ইতিহাসে প্রথম। হয়নি ছোট দুই ক্লাবের খেলাও। কর্তারা আইএফএ-র ওপর রাগে মাঠ তৈরির বাহানা দিয়েছিলেন। মনে রাখবেন, এই মাঠেই মোহনবাগান ১৯১১-র শিল্ড জিতেছিল। এখন সেই তীর্থক্ষেত্র ক্লাবকর্তাদের রাজনীতির আখড়া। হেলাফেলা সারাবেলা। বাকি দুই প্রধানের মাঠেই বা ক’টা খেলা হয়? সত্যজিৎ রায়ের কাল্ট ছবি জনঅরণ্যতে দেখা গড়ের মাঠে উপচে পড়া ভিড়, গগনভেদী চিৎকার আজ শুধু স্মৃতির পাতায়। মাথাব্যথা নেই কারও।
কী বলছেন পাঠক? সরাসরি ভোটের প্রচারে নামায় রাজ্য ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা আইএফএ ক্লাবগুলোকে ভর্ৎসনা করবে কি না।
পাগল! ভুলে যাবেন না, ‘আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান’-এর খেলায় আইএফএ-ও কাড়াকাড়ি করে। তারাও তিন ক্লাবের সঙ্গী হয়ে তৃণমূলের পক্ষে সরব। সংস্থার প্রেসিডেন্ট মুখ্যমন্ত্রীর দাদা অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আমলে ময়দান ঘাসফুলের নেতা-মন্ত্রীদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজিত বসু, অরূপ বিশ্বাস, মদন মিত্র- অনেকের ক্লাবই আজ খেলে ময়দানে। শুধু খেলে। বাঙালি ফুটবলার ওঠে কই? চরম লজ্জার, সিনিয়ার জাতীয় দলের ২৬ জনে বাঙালি একজনও নেই। অনূর্ধ্ব সতেরোয় সবেধন নীলমণি নন্দন রায়, অনূর্ধ্ব কুড়িতে স্রেফ মণিরুল মোল্লা।
বছর কয়েক আগে গোয়েঙ্কা-বাঙ্গুরদের হাতে ক্লাব মালিকানা গেলে দুই প্রধানের ফেসবুক বিপ্লবীদের ‘পোস্টাপোস্টি’র যুদ্ধে দুটো শব্দ ঘুরত খুব। বিক্রিত এবং বিকৃত। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল বিক্রি হল কি না, প্রশ্ন উঠত। এবং কর্তাদের অনুগত একদল সগালাগাল আপ্রাণ বোঝাতেন, আমাদের দল বিক্রি হয়নি। এটা বিকৃত তথ্য। এখন সেই প্রশ্ন তোলার মুখও নেই। কে প্রশ্ন তুলবে, তিন ক্লাব আসলে বিক্রি হল কার কাছে? শিল্পপতির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পার্টির কাছেও?
এই যে ‘বিচার চাই বিচার চাই’ বলে তিন ক্লাবের কিছু সমর্থক সেজেগুজে ফুটেজ নিয়ে চলে গেলেন, তাঁরা আজ গেলেন কোথায়? এসব নিয়ে বিচার চাই না আপনাদের? একসঙ্গে প্রতিবাদ হবে না, প্রতিবাদ?
নবান্নে মাথা ঠেকালেই আজ মুক্তি ময়দানে। এই তো সৌরভ-অভিষেকদের দিব্যি সিএবির পদে বসানো হয় নবান্ন থেকে। নবান্নের আশীর্বাদে বসানো হয় স্নেহাশিসকে। কেউ প্রশ্ন তোলেনি, স্বশাসিত সংস্থায় চূড়ান্ত বেআইনি কাজ হয় কীভাবে।
হয়, হয়। করলেই হয়। ময়দানী কর্তাদের মধ্যেও প্রতিবাদী চরিত্র খসে পড়েছে একে একে। যিনি কোনও পার্টির সঙ্গে সরাসরি নাম জড়াবেন না নিজের।
আসলে ময়দানের যাবতীয় ব্যতিক্রমী সত্তা ধ্বংসের শুরু প্রশাসনে মুখ্যমন্ত্রীর দাদা-ভাইয়ের আবির্ভাবে। একজন ইস্টবেঙ্গলে ছিলেন, অন্যজন মোহনবাগানে। একজন রাজ্য ফুটবল সংস্থার মাথা, একজন রাজ্য অলিম্পিক সংস্থার মাথা। অনেকেই এঁদের পাম্প দিয়ে ফুলিয়েছেন নিজের স্বার্থে। এখন হাত কামড়াচ্ছেন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন দেখে। বড় ক্লাবের কর্তা হয়ে দাদার আইএফএ প্রেসিডেন্ট হওয়া অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। এই প্রতিবাদও কেউ করেনি। ভাই বিওএতে থেকে একসঙ্গে অনেক রাজ্য সংস্থার মাথায়। চরম অন্যায়। কেউ কিছু বলেননি। মুখ্যমন্ত্রীও না। তিনি বরং নীরবে তোল্লাই দিয়ে গিয়েছেন।
আমরা দেখেছি, মাসকয়েক আগে ভাই স্বপনকে প্রকাশ্যে ত্যাজ্যভাই ঘোষণা করেছিলেন মমতা। বিজেপি নেতাদের সঙ্গে মাখামাখির অপরাধে। এখন সব চুপ। ক’দিন আগে সেই ভাইকে ফোঁটা দিয়েছেন। ভালো করেছেন। ক্ষমা পরমধর্ম। এই করে দলবদলিয়াদের অনেককে আশ্রয় দিয়েছেন ক্ষমাশীল দিদি। তবে স্বপন কোনও স্বপ্ন দেখাতে পারেননি বাংলার খেলাকে। অজিতের জমানায় বাংলা ফুটবলে জয়ের আলো আসেনি।
মমতার যখন কিছুই ছিল না, পাশে কেউ ছিল না, তখন ময়দানের নামী কর্তা তাঁকে খুব সাহায্য করেছিলেন। পাড়ার মেয়ে। কালীঘাটের অপূর্ব মিত্র লেনের প্রদ্যোত দত্ত সব সময় পাশে থাকতেন বোনের। অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ, প্রতিবাদী এবং আপাদমস্তক সৎ প্রদ্যোত আইএফএ-র ইতিহাসে অন্যতম সেরা কর্তা। বর্তমান আইএফএ সচিব অনির্বাণের বাবা।
প্রদ্যোত আজও বেঁচে থাকলে কি এভাবে তৃণমূলের হয়ে খুল্লম খুল্লা নামতে পারতেন ফুটবল কর্তারা? উত্তর, না। নেতাদের পায়ে জবা হয়ে ফোটার জন্য এভাবে ছুটতে পারতেন? উত্তর, না। মুখ্যমন্ত্রীর দাদা-ভাই-ভাইপো এভাবে মৃত ময়দানে রাজনীতির রথ চালাতে পারতেন? উত্তর, না।
মোহনবাগানের দেবাশিস দত্ত, ইস্টবেঙ্গলের দেবব্রত সরকার যাঁদের হাত ধরে ময়দান চিনেছিলেন, অঞ্জন মিত্র-পল্টু দাস কি এত অনাচার, রাজনীতিকরণ মেনে নিতেন? উত্তর, না। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের এককালের গডফাদার জগমোহন ডালমিয়া এসব নেতাদের মানতেন? অনুব্রতদের সংবর্ধনা দিতেন? উত্তর, না। ইতিহাস বড় জ্বালাময় আজ, কেউ কাউকে মনে রাখে না আর। ময়দান তো আরও নির্মম! অঞ্জন-পল্টু-প্রদ্যোত-জগমোহনরা বিস্মৃত। সেই ময়দানও আর নেই, তার শবদেহ পড়ে রয়েছে। খেলা হয় না আর। ময়দানের শবদেহের উপরে চলছে রাজনীতির খেলা।



