বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পাহাড়ের কোলে ধীরে বাঁচার ঠিকানা পুদুং খাসমহল

শেষ আপডেট:

শানু শুভঙ্কর চক্রবর্তী

শহরের জীবনটা আজ এক অদ্ভুত দৌড়ের নাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলা, ট্রাফিকের হর্ন, অফিসের ডেডলাইন, মোবাইলের নোটিফিকেশন—সব মিলিয়ে দিন শেষে মনে হয়, নিজের সঙ্গে নিজের দেখা করার সময়টুকুও আর অবশিষ্ট নেই। জানলার বাইরে আকাশ থাকলেও, চোখে পড়ে শুধু কংক্রিটের দেওয়াল। ঠিক এমন সময়েই পাহাড় ডাকে। তবে সেই ডাকা মানে জনপ্রিয় ভিউপয়েন্টের ভিড় নয়; বরং এমন এক জায়গার খোঁজ, যেখানে সময় একটু ধীরে হাঁটে, রাত নামলে অন্ধকার সত্যিই অন্ধকার হয়, আর মানুষ এখনও গল্প বলে আগুন জ্বেলে বসে। সেই খোঁজেই একদিন পৌঁছালাম কালিম্পং পাহাড়ের কোলে থাকা ছোট্ট গ্রাম-পুদুং খাসমহল।

যাত্রাটা শুরু জলপাইগুড়ি থেকে। ভোরের বাসে শিলিগুড়ি, সেখান থেকে কালিম্পং। সকালের পাহাড়ি রাস্তা তখনও শান্ত। কালিম্পং বাসস্ট্যান্ডে নেমেই গরম গরম মোমো- পাহাড় সফরের অঘোষিত নিয়ম। তারপর পুদুংগামী শেয়ার গাড়ির খোঁজ। পাহাড়ে গাড়ি ভরার আগে ছাড়ে না, তাই অপেক্ষাটাও সফরের অংশ হয়ে ওঠে। অবশেষে গাড়ি ছাড়ল। কালিম্পং থেকে পুদুং ফাটক, সেখান থেকে খানিকটা হাঁটা পথ। একটু এগোতেই হঠাৎ চোখের সামনে খুলে গেল এক সাজানো-গোছানো পাহাড়ি গ্রাম- মাটির বাড়ি, কাঠের ব্যালকনি, উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধান, আর বাতাসে ভেসে আসা কাঠপোড়ার গন্ধ। মনে হল, সময় এখানে অন্য নিয়মে চলে।

আমার থাকার জায়গা একটি প্রায় শতবর্ষী রাই জাতির মাটির বাড়ি। দরজা পেরিয়েই মনে হল, যেন কোনও পুরোনো গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। কাঠের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সামনে সবুজ পাহাড়ের ঢেউ, দূরে আলগারা আর কাফেরগাঁওয়ের মৃদু আলো। সন্ধে নামতেই পাহাড়ে অন্ধকার ঝুপ করে নেমে আসে। শহরের মতো হাজার আলো নয়-এখানে অন্ধকারেরও নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। হাতে তোংবা-বাজরাকে গেঁজিয়ে বানানো উষ্ণ স্থানীয় পানীয়। চুমুক দিতে দিতে জমে উঠল স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প- চাষাবাদ, পাহাড়ি উৎসব, শীতের কুয়াশা, বর্ষার পাহাড় ধসের স্মৃতি। গল্প জমলে সময় যে কত দ্রুত গড়িয়ে যায়, বোঝাই যায় না। পাহাড়ে রাতের খাওয়াও তাড়াতাড়ি। মেনুতে স্থানীয় চিকেন সুপ আর ভাত। ভরপেট খেয়ে ক্লান্ত শরীর এমন গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল, যা শহরে বহুদিন অনুভব করিনি।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির কোলাহলে। জানলা খুলতেই দেখি মেঘ পাহাড়ের গায়ে গায়ে হেঁটে চলেছে। সকালের খাবার সেরে স্থানীয় এক গাইডকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম দেখতে। পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়—এখানে প্রকৃতি এখনও মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। সদ্য কাটা ধানের জমিতে নেমেছে ময়ূরের দল। আর একটু এগোতেই দেখি কালিজ ফেজেন্টের পরিবার- পাহাড়ি বুনো মুরগি, ছড়িয়ে থাকা ধান খাচ্ছে। আমাকে দেখেই সজাগ হয়ে মুহূর্তে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। এই গ্রামে প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থান এখনও অক্ষুণ্ণ।

গ্রামের ভিউপয়েন্ট থেকে দেখা যায় রেলি, আলগারা, কাফেরগাঁওয়ের পাহাড়ি রেখা। পথে চোখে পড়ে একাধিক নার্সারি- ক্যাকটাস আর নানা পাহাড়ি গাছের সমাহার। এখান থেকেই কালিম্পং শহরের বহু দোকানে গাছ সরবরাহ হয়। একটু হাঁটতেই অবাক করা দৃশ্য-এই নিরিবিলি গ্রামে একটি ফ্যান্সি রেস্টুরেন্ট! লেমন সোডায় চুমুক দিতে দিতে জানা গেল, পাশে রয়েছে একটি পাখির পার্ক। কৌতূহল নিয়ে ঢুকে দেখি গিনি ফাউল, এমু, ব্রহ্মা চিকেন, নানা রংয়ের ফেজেন্ট। পাহাড়ি গ্রামের ভিতরে এমন বিচিত্র পাখির সংগ্রহ সত্যিই চমক জাগায়।

পাশেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত অ্যাডভেঞ্চার পার্ক- জিপ লাইন, দড়ির সেতু, ক্লাইম্বিং সেটআপ-সবই এখন নীরব স্মৃতি। ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসি গ্রামের পথে। রাই শাক, বোকচই, মটরশুঁটি, কুমড়ো-নানান স্থানীয় সবজির চাষ। ধান আর বাজরা চাষ এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা। এখানকার জীবন প্রকৃতির ছন্দেই চলে। সূর্য উঠলে কাজ, সন্ধে নামলে বিশ্রাম।

দুপুরের খাবারে গিরোউলা, কুমড়োর তরকারি আর গুন্দ্রুক। পাহাড়ি স্বাদের সঙ্গে মিশে থাকে শ্রমজীবী জীবনের সরল আন্তরিকতা। ব্যালকনিতে বসে দূরের মেঘ নামা-ওঠা দেখতে দেখতে মনে হল জীবনের আসল বিলাসিতা বোধহয় অল্পে তৃপ্ত থাকা। এখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা না গেলেও পুদুং খাসমহলে অনায়াসেই দু’-তিনদিন কেটে যায়। কারণ এখানে আকর্ষণ শুধু ভিউ নয়- আসল আকর্ষণ ধীরে বাঁচার অভ্যাস।

সকালে মিনিভেট পাখির ডাকে আবার ঘুম ভাঙে। কিছু জায়গা থাকে, যেখানে গেলে মনে হয়-এখানেই থেকে যাই। ওয়ার্ক ফ্রম হোমের যুগে পুদুং খাসমহল যেন এক আদর্শ আশ্রয়-এখানে বসে গল্প লেখা যায়, গান বাঁধা যায়, ছবি আঁকা যায়, কিংবা নিঃশব্দে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।

ব্রেকফাস্টে ওয়াচিপা- রাই জাতির বিশেষ খাবার। তারপর ফেরার প্রস্তুতি। গাড়ি ছাড়ে ধীরে, পাহাড় পিছিয়ে যায়। কিন্তু মনে থেকে যায় এক শান্ত শিক্ষা-

ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, কখনো-কখনো নিজের ভেতর ফিরে আসার নামও বটে। আর পুদুং খাসমহল-সেই ফিরে আসার এক নিঃশব্দ ঠিকানা।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

তুলাইপাঞ্জি

সাগরিকা রায় মাথাভাঙ্গা থেকে মাদারিহাট পর্যন্ত আসতে নেহাত কম সময়...

অণুগল্প

এবং সময় শুভাশিস দাশ  মিছিলের প্রথম সারিতে আলপনাকে দেখে একটু অবাকই...

হার না মানা হার

অজিত ঘোষ পদুবাবুর লাঠির ভয়ে জেনেছিলাম, ‘হার’ শব্দটির অর্থ পরাজয়৷...

হিমাদ্রির নির্জনযাত্রা

সুদীপ্তা সরকার বাতাসে শীত-শীত ভাবটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। সন্ধের...