- বিধান ঘোষ
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলি থানার অন্তর্গত ধলপাড়া-৩ পঞ্চায়েতের ত্রিমোহিনী প্রতাপচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০২৫ সালে ৭৫ বছরে পদার্পণ করে। ২০২৫ সালের ১৫ অগাস্ট, স্বাধীনতা দিবসে স্কুলের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উদযাপন শুরু হয়। বর্ণাঢ্য প্রভাতফেরি ও ট্যাবলো শোয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ বিদ্যালয়ের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষ্যে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হয়। ৪ জানুয়ারি ২০২৬ প্ল্যাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
হিলির বরেণ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের নামাঙ্কিত এই বিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ এক গৌরাবান্বিত ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫০ সালে ২৪ ডিসেম্বর ত্রিমোহিনী চকদাপট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পথ চলা শুরু হয়। তারপর স্থানীয়রা এই বিদ্যালয়কে জমি ও পঠনপাঠন সামগ্রী দান করলে ১৯৫১ সালের ২ জানুয়ারি এই স্কুলে ইংরেজিমাধ্যমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পঠনপাঠন শুরু হয়। নাম হয় ত্রিমোহিনী জুনিয়ার হাইস্কুল। এর কয়েকবছর পর স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মজুমদারকে সম্মান দিয়ে এই স্কুলের নাম হয় ত্রিমোহিনী প্রতাপচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। মাটির ঘর থেকে শুরু হওয়া এই স্কুলের এখন তিনতলা বিল্ডিং হয়েছে। ৭৫ বছরের যাত্রায় এই স্কুলের সুখ্যাতি জেলা ছাড়িয়ে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং বরেণ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদানের মাধ্যমে ২ জানুয়ারির দুপুরে প্ল্যাটিনাম জুবিলির মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তারপর বিদ্যালয়ের প্ল্যাটিনাম জুবিলির সংকলন ‘বন্দনা’ বইটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের দ্বারা বিভিন্ন বিষয়ের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এরপর বিভিন্ন বিশিষ্টজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
প্রদর্শিত হয় তাইকোন্ডো। রাতে পুরুলিয়া থেকে আগত শিল্পীরা ছৌ নৃত্য পরিবেশন করেন। ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় স্কুলের প্রাক্তনীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। প্রাক্তনীরা মানব বোমা নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। ওইদিন বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের ব্যান্ডের সুরের ঝংকারে দর্শকরা মেতে ওঠেন। অনুষ্ঠানের শেষ দিন অর্থাৎ ৪ জানুয়ারি কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। তারপরে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়ারা ইংরেজি নাটক সেলফিশ জায়েন্ট মঞ্চস্থ করেন। অনুষ্ঠান শেষ হয় বিখ্যাত শিশুশিল্পী অঙ্কনা দে-র গানে।
স্কুলের প্রাক্তনী পায়েল মণ্ডল এই অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবার স্কুলের মঞ্চে নাচলাম, মনে হল হারিয়ে যাওয়া শৈশবটা যেন এক লহমায় ফিরে এল। স্কুলের দৌলতে অনেক দিন পরে নেচে বুঝলাম কিছু ভালোবাসা কখনও পুরোনো হয় না, শুধু সঠিক সময়ে নতুন রূপে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে।’
বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রেশম আফরুজা, সেলফিশ জায়েন্ট নাটকের মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে। তার কথায়, ‘স্কুলের প্ল্যাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠানের মঞ্চে নাটক করতে পেরে আমরা সবাই খুব খুশি। নাটকের মহড়া, স্টেজে ওঠার আগে ভয় ভয় ভাব সারাজীবন মনে থেকে যাবে। মনে থাকবে শিক্ষকদের সঙ্গে কাটানো এই সময়।’ একটু হেসে রেশম যোগ করে, ‘বকুনিগুলোও মনে থাকবে।’
প্ল্যাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক গোপাল প্রামাণিক বলেন, ‘স্কুলের বর্তমান এবং প্রাক্তন পড়ুয়াদের উপস্থিতিতে নির্বিঘ্নে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যালয়ের গৌরবান্বিত ৭৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরে আমরা আপ্লুত।’
এত ভালোর মধ্যে খানিক খারাপও অবশ্যম্ভাবীভাবেই আসে। অভিভাবক পরিমল মাহাতো বলেন, ‘বছর কয়েক আগেও স্কুলের পঠনপাঠনের মান খারাপ ছিল না। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের অনুশাসনের অভাবে পঠনপাঠনের মান তলানিতে এসে ঠেকেছে।’
অভিযোগ আছে, অভিযোগ থাকবেও। পাশাপাশি আশা থাকে, ফিরে আসাও থাকে। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী বৈশাখী শীল বলেন, ‘প্ল্যাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠানের সুবাদে দীর্ঘদিন পরে স্কুলে এসেছি। শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে ক্লাসরুমগুলি পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। পালটে যাওয়া এই সময়ে, আমার স্কুলের নতুন রূপ আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষিত করেছে।’
বর্তমানের কলরব, প্রাক্তনীদের ফিরে আসা, আর নিজের গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রেখে আরও এগোক ত্রিমোহিনী প্রতাপচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়।

