মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

দিগন্তে নব্য স্বেচ্ছাচার

শেষ আপডেট:

ঔপনিবেশিক শাসন বোধহয় আর অতীত নয়। ভবিষ্যৎও। দিগন্তে অশনিসংকেত। ভেনেজুয়েলা পুরো কবজা হয়নি এখনও। কিন্তু আমেরিকার লোল ঝরছে ফিনল্যান্ডের জন্য। নজর আছে কলম্বিয়া, কিউবা বা মেক্সিকোর দিকে। দেশগুলির সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক সমন্বয়, সহাবস্থানের স্বীকৃত প্রথাগুলি যেন উধাও। নির্দ্বিধায় সেসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরাচার, স্বেচ্ছাচারের প্রবণতা অনেকদিন থেকে বিশ্বের নতুন ট্রেন্ড। নতুন প্রবণতা যেন নব্য উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা।

ভেনেজুয়েলা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকবে- কথাটা বলার স্পর্ধা এখন দেখানো যাচ্ছে বিশ্বে। দেখিয়ে পারও পেয়ে যাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের ক্ষমতা শেষপর্যন্ত উদ্বেগ বা নিন্দা প্রকাশের বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ২০০ বছরের বেশি ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে চরম দুঃসহ অবস্থায় কাটিয়েছে ভারত। কিন্তু এই নব্য উপনিবেশবাদী ছকের সামান্য নিন্দা করার সাহস হল না দেশটার। শুধু পরিস্থিতি নজরে আছে বলে দায় সারল।

অন্য দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অপছন্দের শাসককে সরাতে গোয়েন্দা তৎপরতা আজকাল বিশ্বে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ভারতে অস্থিরতা তৈরির জন্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সক্রিয়তা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় যা ঘটল, তা বিশ্বজুড়ে সমস্ত নিয়মনীতি জলাঞ্জলি দেওয়ার নামান্তর। ক্ষমতা আছে বলেই অন্য দেশের খোদ রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া নব্য উপনিবেশবাদের স্পষ্ট ইঙ্গিত। সেই রাষ্ট্রপ্রধানের দেশটির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে পদদলিত করার নগ্ন প্রয়াস।

নিকোলাস মাদুরোকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো জঘন্য কাণ্ডের পরেও অন্য দেশকে এমন পরিণতির জন্য তৈরি থাকতে বুক ফুলিয়ে বলছে আমেরিকা। যদিও মার্কিন জনগণের সব অংশ তাঁদের দেশের প্রেসিডেন্টের এই অবিমৃশ্যকারিতার সঙ্গে একমত নয়। বরং আমেরিকাজুড়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। পুরোনো ঔপনিবেশিক আমলে যে প্রবণতা ছিল না। নব্য উপনিবেশবাদীরা তাই নিজের দেশের মানুষের মতামতকেও গ্রাহ্য করছে না। জনগণের ভোটে জিতে, তাদেরই উপেক্ষা করার এটা আরেক ধরন।

কতটা দুঃসাহস থাকলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলতে পারেন যে, আমেরিকার ভূ-প্রাকৃতিক নিরাপত্তার কারণে ফিনল্যান্ডকে দরকার। একটা স্বাধীন দেশের প্রতি এই হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি বিশ্ব মানবতার প্রতি চরম আঘাত। ট্রাম্প যে দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন, তা অন্য দেশকে শায়েস্তা করার কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল। এখনকার ভূ-রাজনীতিতে যার প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় উপমহাদেশেও।

বিশ্বে উদারনৈতিকতা ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে সুখ্যাতি ছিল আমেরিকার। সেই দেশটাও দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। সেই ইতিহাস ভুলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঔপনিবেশিক শাসক হয়ে উঠতে চাইছেন। মনে করার কারণ নেই যে, ব্যক্তি ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিফলন এসব। বাস্তবে বিশ্বে একটি শক্তি এখন এভাবেই যথেচ্ছাচারের পথে এগোচ্ছে। প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের হামলা, এমনকি ত্রাণ পর্যন্ত পৌঁছে না দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে তো সেই শক্তির জন্যই।

রাশিয়ার লাগাতার হামলায় বিপর্যস্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদোমির জেলেনস্কি পর্যন্ত মাদুরোর কায়দায় ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে নজর দেওয়ার জন্য আমেরিকার শাসককে উসকাচ্ছেন। রাষ্ট্রপ্রধান অপহৃত হলেও ভেনেজুয়েলা এখনও আমেরিকার কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেনি। স্বাধীনভাবে দেশ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেছে। কিন্তু আমেরিকাকে অবিলম্বে নিরস্ত করা না গেলে এককভাবে ভেনেজুয়েলা কতক্ষণ অনড় থাকতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

হতেই পারে যে, কোনও দেশের শাসক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, কিন্তু তাঁকে অপসারণের এক্তিয়ার শুধু সেদেশের জনগণের। অন্য দেশের হস্তক্ষেপ ঘটতে থাকলে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। এটা স্পষ্ট, আমেরিকা বা ইজরায়েল কিংবা রাশিয়া যা-ই করুক না কেন, তাদের নিরস্ত করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা রাষ্ট্রসংঘের নেই। নব্য উপনিবেশবাদী এই ভাবনাকে আটকাতে এখন জরুরি ভূখণ্ড নির্বিশেষে বিশ্বজনমত গঠন। বিশ্ব মানবতা জেগে উঠলেই শুধু রবীন্দ্রনাথের ভাবনার আন্তর্জাতিকবাদের প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

 

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

খেলাতেও বিদ্বেষ বিষ

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে আর মাসখানেক বাকি। অথচ...

বেনজির দ্বৈরথ

ভোটের মরশুম পড়তেই বাংলায় সক্রিয়তা বাড়ল ইডি’র। তৃণমূলের বিরুদ্ধে...

ট্রাম্পের দাদাগিরি

একসময় বামপন্থীদের গতে বাঁধা স্লোগান ছিল- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো...

টিকে থাকার লড়াই

কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে এখনও বেঁচে রয়েছে। মৌসম বেনজির নুরের তৃণমূল...