প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। আজ নজরে তুফানগঞ্জ
শিবশংকর সূত্রধর ও সায়নদীপ ভট্টাচার্য, তুফানগঞ্জ: বড্ড ঠান্ডা। রায়ডাক নদীর উপর ধোঁয়ার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে কুয়াশা। বেলা কিছুটা গড়িয়ে যাওয়ার পর কুয়াশা ভেদ করে মোটরবাইকে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালেন দুই বন্ধু। ততক্ষণে ঘাটে দাঁড়িয়ে আরও জনাকুড়ি মানুষ। সবাই নৌকার অপেক্ষায়। নৌকা ছাড়া পারাপারের উপায় নেই যে।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে এক বন্ধু সময় দেখে নিলেন। দেরি হয়ে যাচ্ছে যে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে টুক করে যখন চাকরি চলে যেতে পারে, তখন কি না নদী পার হওয়ার জন্য নৌকার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। মেজাজ খিঁচড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ব্যাজার মুখে বাইকচালক পিছনের সিটে বসা বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কী রে তোর দিদি নাকি উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। কোথায় গেল জালধোয়া সেতু (Jaldhowa Bridge)?’
পেছনের তরুণ মুহূর্তে রেগে কাঁই। তাঁর তড়িঘড়ি জবাব, ‘দিদির কথা পরে বলিস। আগে বল তোরা যে এখানে বিজেপির সাংসদ, বিধায়ককে জেতালি, তা ওঁরা সেতু বানাতে পারলেন না কেন?’ বোঝাই গেল, দুই বন্ধু দুই দলের সমর্থক। নদীর পাড়ে এই তর্কবিতর্কে অপেক্ষারত অন্য যাত্রীদের কেউ কেউ ফুট কাটলেন। একজনের কথায়, ‘বেঁচে থাকতে জালধোয়া সেতু দিয়ে আমাদের পারাপার হবে না।’
কথায় কথায় সময় গড়ায়। শেষে ঘাটে নৌকা ভিড়ল। একে একে সবাই উঠে রওনাও দিলেন। নদী পেরোলে তবে তুফানগঞ্জ (Tufanganj)-২ ব্লকের রামপুর-১, ২ ও ফলিমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা। কিন্তু এলাকার প্রাণকেন্দ্র তুফানগঞ্জ যেতে হলে এই নৌকা আর নদীই ভরসা। আরেকটি পথ আছে। তাহলে আলিপুরদুয়ার জেলার বারবিশা, কামাখ্যাগুড়ি হয়ে ৮০ কিমি ঘুরতে হয়।
তুফানগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে তাই নির্বাচন এলেই ঘুরেফিরে আসে জালধোয়া ঘাটে সেতুর দাবি। রায়ডাক নদীর পাড়ের জালধোয়া নিয়ে সংবাদপত্রে যে কত শব্দ খরচ হয়েছে বা টিভিতে কত ছবি দেখানো হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আশ্বাসেরও কমতি থাকে না কখনও। শুধু সেতুটা স্বপ্নেই থেকে যায়। তুফানগঞ্জের বিধায়ক মালতী রাভা রায় একবার বিধানসভায় দাবিটি তুলেছিলেন বটে। ব্যস, ওই পর্যন্তই।
জালধোয়া সেতু আদায়ে না আছে আন্দোলন, না আছে রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা। সাংসদ হওয়ার পর এলাকা থেকে নির্বাচিত মনোজ টিগ্গা শেষ কবে তুফানগঞ্জে এসেছিলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা মনেই করতে পারেন না। মালতী ও মনোজ- দুজনই বিজেপির। তবে গত নির্বাচন পর্যন্ত তুফানগঞ্জ ছিল তৃণমূলেরই দখলে। ফলে যে যায় লঙ্কায়- শব্দবন্ধনীটি তুফানগঞ্জের ঘরে ঘরে ঘোরে।
বিজেপি বিধায়ক মালতী রাভা রায়কে অবশ্য এলাকায় দেখা যায় না, এমন বদনাম নেই। তবে স্থানীয়দের কথায়, শুধু ঘুরেই বেড়ান। উন্নয়ন ও কর্মী-সমর্থকদের পাশে থাকার সুনাম তেমন নেই। সব জায়গার মতো তুফানগঞ্জেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ রয়েছে। বিজেপি কর্মীদের মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও আছে অনেক।
বিজেপিতেই চর্চা হয়, বিধায়ক হওয়ার পর প্রথম এক-দেড় বছর এধরনের পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে মোকাবিলা করলেও এখন মালতীর সেই তৎপরতায় ভাটা পড়েছে। অথচ তুফানগঞ্জে ধর্মীয় সমীকরণে ভোটে সুবিধা হয় বিজেপির। হিন্দু ভোট এই কেন্দ্রে বেশি। কর্মী-সমর্থকের অভাব নেই। সমস্যা হল সাংগঠনিক দুর্বলতা। কর্মীদের পরিচালনা ও সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দক্ষ লোক নেই।
উপরি কাঁটা গোষ্ঠীকোন্দল। তৃণমূলের রোগ সংক্রামিত পদ্ম শিবিরেও। জেলা পরিষদে দলের সদস্য সুশান্ত রাভা ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছেন, তুফানগঞ্জজুড়ে দলীয় কাজে তাঁকে দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু একসময়ের প্রভাবশালী উৎপল দাসের প্রভাব কমেছে। তৃণমূল এবার তুফানগঞ্জের জমি পুনরুদ্ধারে কার্যত আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। এজন্য শুধু সাংগঠনিক নয়, সরকারে দলের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রশাসনিক রদবদলও করিয়ে ফেলেছে।
তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের ছাট ফলিমারি, পূর্ব ফলিমারি, ছিট বড়লাউকুঠির মতো সংকোশ ও রায়ডাক নদী দিয়ে ঘেরা দুর্গম এলাকাগুলি মূলত অসমের উপর নির্ভরশীল। বছরখানেক আগে এখানে সরকার থেকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা হওয়ায় বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বাড়তি সুবিধা হয়েছে। এসআইআর নিয়েও অ্যাডভান্টেজ শাসকদলই। কেউ সমস্যায় পড়লেও তৃণমূল কর্মীরা তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। যেখানে পিছিয়ে যাচ্ছে বিজেপি।
তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত তৃণমূলও। এই বিধানসভা এলাকায় দলের দুটি গোষ্ঠী। একটির নেতা তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের সভাপতি নিরঞ্জন সরকার। যিনি দলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিকের ঘনিষ্ঠ। আরেক গোষ্ঠীর নেতা জেলা পরিষদের সদস্য চৈতি বর্মন বড়ুয়া। তিনি তৃণমূলের আদি নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষের ঘনিষ্ঠ। তুফানগঞ্জ পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান তনু সেনকে সরিয়ে দেওয়াতেও কিছু ক্ষোভ রয়েছে।
তুফানগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত, তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের পুরোটা ও তুফানগঞ্জ শহর রয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তুফানগঞ্জ বিধানসভার পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিয়েছিল বিজেপি। পরে দুটির দখল ঘাসফুলের কাছে গিয়েছে। শালবাড়ি-১, ২ ও বারোকোদালি-১ কিন্তু এখনও বিজেপির দখলে।
এই বিধানসভা কেন্দ্রের পর্যটনকেন্দ্র রসিকবিল পাখিরালয় ও মিনি জু কার্যত গোটা রাজ্যের আকর্ষণ। জু’র এনক্লোজারে এখন শীতে নাজেহাল চিতাবাঘও। তুফানগঞ্জের বাসিন্দারা যেন অনুন্নয়নের খাঁচায় বন্দি। রসিকবিল থেকে বেরোনোর পথে কয়েকজন পর্যটকের গলায় এই কেন্দ্র নিয়ে আক্ষেপ ফুটে উঠছিল। কত কী হতে পারত, তার তালিকা শোনা যাচ্ছিল। একজন বললেন, এগুলি হবে কি না, তা ভগবান থুড়ি নেতারাই জানেন!

