সমীর দাস, কালচিনি: মায়েরা বুঝি এমনই হয়। ছেলে চলে গিয়েছেন বহুদিন হল। তবু একটি ঘরের আলমারিতে ছেলের উর্দি, ব্যবহৃত পোশাক পাটপাট করে সাজানো। এমনকী ছেলের জুতোগুলিও পরিষ্কার করে রাখা। রবিবার মাতৃ দিবস। তাঁর আগে শনিবার কালচিনির (Kalchini) মেচপাড়া চা বাগানে ভারতীয় সেনার শহিদ জওয়ান রাজীব থাপার বাড়িতে গিয়ে এমনই দৃশ্য দেখা গেল। ছয় বছর আগে তিনি শহিদ হন। মা রিনা থাপা ছেলের ঘরেই তাঁর ছবি টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন। প্রায় একই দৃশ্য ভাটপাড়া চা বাগানের লামালাইনের একটি বাড়িতেও। প্রায় ১৮ বছর আগে ওই বাগানের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক সুখমায়া লামার ছেলে ভারতীয় সেনা জওয়ান অজয় লামা শহিদ হয়েছিলেন। এখনও বৃদ্ধা প্রতিদিন ছেলের ছবির সামনে চোখের জল ফেলেন। কালচিনির গর্ব ওই দুই শহিদই চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান। দুজনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের নায়েক পদে থেকে দেশের সেবা করেছেন। দুজনেই কাশ্মীরে কর্মরত ছিলেন। শনিবার সন্ধ্যায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছে। তবে একসময় পাকিস্তানের সেনার গুলিতে অকালে দু’টি প্রাণ ঝড়ে পড়েছিল। তাই যুদ্ধের আবহে দুই মা বারবার টিভিতে খবর শুনছেন আর মনে করছেন ছেলেদের কথা।
ছেলে রাজীব শহিদ হওয়ার সময় রিনা বলেছিলেন ‘আমার ছেলে আমার একার নয়, সে এখন দেশের সব মায়ের সন্তান।’ এতদিন পরেও তাঁর মত বদলায়নি। আরেক শহিদ অজয়ের মা সুখমায়ার কথায়, ‘এখন যাঁরা সীমান্তকে রক্ষা করছেন তাঁরা প্রত্যেকেই আমার সন্তান।’ রাজীব ২০১৯ সালের ২৩ অগাস্ট ভোরে কাশ্মীরের নৌসেরা সেক্টরে কর্তব্যরত অবস্থায় পাকিস্তানি সেনার গুলিতে শহিদ হন। তাঁর পরিবার কালচিনি ব্লকের মেচপাড়া চা বাগানের পারিলাইনের বাসিন্দা। অজয় কাশ্মীরের কার্গিল সেক্টরে কর্মরত ছিলেন। ২০০৭ সালের ২৫ নভেম্বর তিনি শহিদ হন। ভাটপাড়া চা বাগানের লামালাইনের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। অন্যদিকে, রাজীবের বাবা কুমার লামা মেচপাড়া চা বাগানের সাবস্টাফ ও মা রিনা বাগানের শ্রমিক ছিলেন। দুজনেই বেশ কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছেন। তাঁরা এখন রাজীবের স্ত্রী খুশবু থাপা মঙ্গর ও ছয় বছরের মেয়ে কাব্যার দেখা শোনা করেন।


রিনা আরও বলেন, ‘ঘটনার প্রায় ছয় মাস আগে ছেলে বাড়িতে ছুটি নিয়ে এসেছিল। পরেরবার আসে কফিনবন্দি হয়ে।’ শহিদ হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় শেষবারের মতো রাজীব বাবা -মা ও স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথাও বলেছিলেন। সেসব মনে পড়তেই এখনও রিনার চোখে জল। তাঁর কথায়, ‘নাতনি কাব্যাকে বড় করে তোলাই এখন আমাদের কর্তব্য। তবে এভাবে যেন আর কোনও মায়ের কোল খালি না হয়।’ যদিও পাকিস্তানের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অন্যদিকে অজয়ের মা সুখমায়া বলেন, ‘দেশসেবায় আমার গোটা পরিবার যদি সেনাবাহিনীতে যায় তাহলেও আমার কোনও আপসোস নেই। ইতিমধ্যেই অজয়ের মেয়ে অস্মীতা সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দিয়েছেন। তাঁর আরেক ছেলে সঞ্জয়ের ছেলে সরগমও সেনায় রয়েছেন। দুজনেই এখন কাশ্মীরে কর্তব্যরত। সুখমায়া জানালেন, তাঁদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন আগে ফোনে কথা হয়েছে। এখন কড়া নিয়ম চলছে। তবে সব মায়ের সন্তান যেন সুস্থ থাকে এই আশা তাঁর।

